14/08/2026
অভ্যুত্থান-পরবর্তী খেলাফত মজলিসের উত্থান: ঠেকাতে চলছে নানা অপচেষ্টা”
বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির ময়দানে খেলাফত মজলিস একটি ব্যতিক্রমধর্মী ও অনন্য সংগঠন। ত্রিধারার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এমন দ্বিতীয় কোনো সংগঠন নেই বললেই চলে। বর্তমানে আরও কয়েকটি সংগঠন এ ধারায় আসছে—আর সবাই এগিয়ে যাক, এটাই আমাদের একান্ত কামনা।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে খেলাফত মজলিসের সাংগঠনিক কার্যক্রম, আদর্শিক অবস্থান ও জনসম্পৃক্ততা নতুন করে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। বাংলাদেশের বাস্তবতা ও সময়ের চাহিদার সঙ্গে ইসলামী আদর্শের সমন্বয় ঘটিয়ে একটি যুগোপযোগী রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে মজলিসের প্রতি মানুষের আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে—এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা ও পর্যবেক্ষণ।
সাংগঠনিক গুণগত মান ও ক্যাডারভিত্তিক বিবেচনায় জাশির পরেই মজলিসের অবস্থান—এমন একটি মূল্যায়ন অনেকের কাছেই রয়েছে। ফলে মজলিসের ক্রমবর্ধমান গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক পরিসরে অস্বস্তি তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। মজলিসকে কোণঠাসা করার বিভিন্ন প্রচেষ্টা ও হীন পাঁয়তারা নিয়ে তাই প্রশ্ন উঠছে।
বিষয়টি বোঝাতে সেই বিখ্যাত ছাগলকে ‘কুকুর’ বানিয়ে ছিনতাই করার গল্পটি মনে পড়ে।
প্রথমজন জিজ্ঞেস করল, “ভাই, কুকুরের দাম কত?” লোকটি উত্তর দিল, “এটি ছাগল, কুকুর নয়।” কিছুদূর যাওয়ার পর দ্বিতীয়জন বলল, “ভাই, কুকুর নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন?” তখন লোকটির মনে কিছুটা খটকা জাগল। তৃতীয়জনও যখন একই কথা বলল, তখন বারবার শুনতে শুনতে লোকটি বিশ্বাসই করে বসল যে এটি আসলে কুকুর। শেষ পর্যন্ত সে ছাগলটি ফেলে চলে গেল এবং তিন বন্ধু মিলে তা নিয়ে গেল।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও কখনো কখনো একই ধরনের কৌশল দেখা যায়—একটি সংগঠন সম্পর্কে বারবার এমন ধারণা প্রচার করা, যাতে একসময় কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেই সংশয় তৈরি হয়। মজলিসের কর্মীদেরও কখনো প্রশ্ন করা হয়, “তোমাদের দলে সারা দেশে কি পাঁচশো বা এক হাজার লোক হবে?” কিংবা বলা হয়, “তোমাদের নেতাদের তো কেউ চেনে না। যেহেতু রাজনীতিই করছ, বড় কোনো দলে যাও, তাহলে তোমার ও ইসলামের উপকার হবে!”
কী দারুণ হিতাকাঙ্ক্ষী তারা! 🙄
এমন আরও কত অবান্তর ও হাস্যকর প্রশ্ন করা হয়! এসব শুনলে মনে হয়, বিস্বাদে ভরা মনকে একটু শান্ত করার জন্য মন খুলে হাসাই ভালো।
গত নির্বাচনের সময়ের একটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়। এক যুবককে দেওয়াল ঘড়ির লিফলেট দিলে সে প্রশ্ন করল, “এটা আবার কোন দল? কবে প্রতিষ্ঠা হলো? নেজামে ইসলাম নাকি?”
আমি যখন সংগঠনের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিলাম, তখন সে মন্তব্য করল, “আহমদ আব্দুল কাদের সাহেব তো আগে শিবির করতেন!”
অবাক হলাম—মাত্র কিছুক্ষণ আগেই বলল, দলের নাম আগে শুনেনি; অথচ দলের মহাসচিবের অতীত রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মন্তব্য করছে! এমনকি নেজামে ইসলামকে চেনে, কিন্তু মজলিসকে চেনে না। অভিনয় করতে হলেও তো একটু শিখে করা উচিত!
তবে এই বাস্তবতাই আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করিয়ে দেয়—মানুষ কোনো সংগঠনকে না জানলে তার সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার ওপর নির্ভর করতে পারে। আর মানুষ যখন কোনো সংগঠনকে কাছ থেকে জানতে শুরু করে, তখন সেই ধারণা বদলাতেও পারে।
খেলাফত মজলিসের ইতিহাস, আদর্শ, সাংগঠনিক কাঠামো ও ত্রিধারার সমন্বিত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে যত বেশি মানুষ জানবে, ততই ইসলামী রাজনীতির প্রচলিত সমীকরণ নতুনভাবে মূল্যায়িত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
জাশির ইতিহাস ও আদর্শিক অবস্থান নিয়েও বিভিন্ন মহলে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক ও আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ এবং দেওবন্দী ধারার সঙ্গে তাদের আদর্শিক সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন ও মতপার্থক্য সামনে এসেছে। অন্যদিকে, খেলাফত মজলিসের নিজস্ব আদর্শিক অবস্থান ও ঐতিহ্য রয়েছে।
আমাদের বিশ্বাস, সচেতন মানুষ যখন বিভিন্ন ইসলামী সংগঠনের ইতিহাস, আদর্শ, রাজনৈতিক দর্শন ও বাস্তব কর্মকাণ্ড তুলনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করবে, তখন তারা নিজেদের পছন্দের জায়গা নির্ধারণ করবে।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে খেলাফত মজলিসের কার্যক্রম ও জনসম্পৃক্ততা যদি আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে ইসলামী রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক। মজলিসকে যত বেশি মানুষ জানবে, ততই তার রাজনৈতিক সম্ভাবনা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আলোচনা বাড়বে।
এই কারণেই হয়তো কেউ কেউ মজলিসের পরিবর্তে ছোট ছোট সংগঠনকে সামনে এনে একটি ভিন্ন রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করতে চাইছে—এমন অভিযোগও শোনা যায়। নির্বাচনের সময় মজলিসের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগও আমরা দেখেছি ও শুনেছি।
তবুও মজলিসের নেতৃবৃন্দের যে অসাধারণ ধৈর্য, তা সত্যিই বিস্ময়াভিভূত করার মতো। এত কিছু নীরবে সহ্য করে সংগঠনের আদর্শ ও সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সহজ বিষয় নয়।
শেষ পর্যন্ত কে কাকে ছাড়িয়ে যাবে, কে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে—তার ফয়সালা সময়ই করবে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—ইসলামী রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা থাকুক, মতপার্থক্য থাকুক; কিন্তু তা যেন আদর্শ, যুক্তি ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে হয়।
মানুষকে জানার সুযোগ দিন, সংগঠনকে বোঝার সুযোগ দিন। কারণ—
মজলিসকে যত জানবে মানুষ, ততই বদলাবে ইসলামী রাজনীতির সমীকরণ।
হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকীল।
আমার রবই উত্তম ফয়সালাকারী।
✍️জুবায়ের মাহমুদ নোয়াখালী