28/08/2024
আপনারা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করুন। পার্থিব জীবন ধোঁকার সামগ্রী ছাড়া কিছুই নয়...
***জান্নাত প্রত্যাশীর একটি দিন: (সারা দিনের কর্মনির্ঘণ্ট)
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
সময়গুলো ক্রমেই অতীতের গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। একসময় আমাদের জীবন সন্ধ্যা নেমে আসবে। এই ভরা যৌবনের সব রঙ, রস ও গন্ধ মুছে যাবে। কিন্তু তারপরও কি আমাদের অলসতা ও গাফলতির ঘুম ভেঙ্গেছে? আমরা কি সচেতন হয়েছি? পেরেছি কি আখিরাতে জন্য পর্যাপ্ত পাথেয় সংগ্রহ করতে?
উত্তর, অবশ্যই না। ঈমান ও আমলের দুর্বলতা আমাদেরকে গ্রাস করে নিয়েছে। দুনিয়ার রূপ-লাবণ্যে আমরা মুগ্ধ ও পাগলপারা। এভাবেই চলতে চলতে হঠাৎ একদিন সময়ের গতি থেমে যাবে। মৃত্যু দূত আমাদেরকে নির্দিষ্ট সময়ে তুলে তুলে নিয়ে যাবে আমাদের রবের কাছে। তাই এখনই আমাদের সচেতন হওয়া অপরিহার্য।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রা. বলেন: "আমি এমন দিনের উপর অনুশোচনা করি, যেই দিনের সূর্য ডুবে গেছে, আমার জীবন থেকে একটি দিন কমে গেছে অথচ তাতে আমার আমল বৃদ্ধি পায় নি।”
সত্যিই মানুষের জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত কিন্তু কাজের পরিধি অনেক বেশি। তাই আখিরাতের চূড়ান্ত সাফল্য লাভ করতে হলে এই সীমিত সময়কে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো আবশ্যক। তাহলে আল্লাহর রহমতে এ অল্প সময়ে বিশাল কল্যাণ অর্জন করা সম্ভব-যার মাধ্যমে আমরা জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করে চীর সুখের নীড় জান্নাতে প্রবেশ করত: জীবনের অভীষ্ট লক্ষে পৌঁছতে পারব বলে আশা করি।
তাই একজন জান্নাত প্রত্যাশী ঈমানদার ব্যক্তির জন্য দ্বীন ও দুনিয়ার সমন্বয়ে সারা দিনের ইবাদত-বন্দেগীর একটি প্রস্তাবিত কর্মনির্ঘণ্ট ও কর্মসূচী পেশ করা হল। কেউ এটি অনুসরণ করলে আশা করা যায়, জান্নাতের পথে চলা তার জন্য অনেক সহজ হবে ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে এটি অনুসরণ করার তাওফিক করুন। আমীন।
◼ ক. রাতে ঘুমাতে যাওয়া থেকে নিয়ে ফজর পর্যন্ত:
১) ঘুমাতে যাওয়ার পূর্বে তাহাজ্জুদের সালাত এবং নফল রোযা রাখার নিয়ত করা।
২) আগেভাগে ঘুমিয়ে পড়া।
৩) ঘুমানের পূর্বে ওযু করা, দুআ ও যিকিরগুলো পাঠ করা। অত:পর ঘুমের আদবগুলোর প্রতি খেয়াল রেখে ঘুমিয়ে যাওয়া।
৪) ফজরের প্রায় আধাঘণ্টা পূর্বে ঘুম থেকে উঠে- ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার দুআগুলো পাঠ করা। অত:পর মিসওয়াক করার পর ওযু করা বা প্রয়োজন হলে গোসল করে পবিত্রতা অর্জন করা।
৫) তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করা। (দু রাকআত দু রাকআত করে ৮ রাকআত পড়া। অত:পর বিতর সালাত আদায় করা)
৬) নফল রোযা রাখার নিয়তে সেহরি খাওয়া।
বি:দ্র: নফল রোযা রাখার শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি হল, এক দিন পর এক দিন রোযা রাখা। তা সম্ভব না হলে, সপ্তাহে প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার- দু দিন, তাও সম্ভব না হলে আরবি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ, তাও সম্ভব না হলে মাসের যে কোন দিন তিনটি রোযা রাখা। তিনটি রোযার বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা সারা মাস রোযা রাখা সওয়াব দান করবেন।
◼ খ. ফজরের পর থেকে নিয়ে সূর্যোদয় পর্যন্ত:
৭) ফজরের আযান হলে আযানের জবাব দেয়া।
৮) ঘরে ফজরের দু রাকআত সুন্নত আদায় করা।
৯) অত:পর মসজিদে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হওয়ার দুআ পাঠ করা এবং মসজিদে যাওয়ার মর্যাদা ও ফযিলত মনের মধ্যে জাগ্রত রেখে আগেভাগে মসজিদে যাওয়া।
১০) মসজিদে প্রবেশের দুআ পাঠ করত: ডান পা আগে রেখে মসজিদে প্রবেশ করা এবং যথাসম্ভব ১ম কাতারে ঈমামের ডানপাশে সালাতের জন্য অবস্থান নেয়া।
১১) ঘরে ফজরের সুন্নত না পড়ে থাকলে মসজিদে তা আদায় করা। অন্যথায় বসার পূর্বে দু রাকআত তাহিয়াতুল মসজিদ (দুখুলুল মসজিদ) আদায় করা।
১২) অত:পর কুরআন তিলাওয়াত, যিকির, ইস্তিগফার, দুআ ইত্যাদি পাঠরত অবস্থায় ফজরের ফরয সালাতের অপেক্ষা করা।
১৩) ফজরের সালাতের ইকামত হলে তাকবীরে তাহরিমা সহকারে অত্যন্ত ভয়-ভীতি, বিনয়, নম্রতা ও একাগ্রতার সাথে ফজরের সালাত শেষ করা।
১৪) সালাত শেষ করার পর যথাস্থানে বসা অবস্থায় সালাত পরবর্তী দুআ ও যিকিরগুলো পাঠ করা। অত:পর সেখানে বসেই সূর্য উদিত হওয়া পর্যন্ত সকালের আযকার সহ বিভিন্ন ধরণের দুআ, যিকির, তাসবীহ, তাহলীল, ইস্তিগফার কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদি ইবাদতে লিপ্ত থাকা।
১৫) সূর্য উদিত হওয়ার ১৫/২০ মিনিট পর দু রাকআত সালাতুল ইশরাক আদায় করা। (এভাবে করলে একটি পূর্ণ হজ্জ ও উমরার সওয়াব অর্জিত হয় আল হামদুলিল্লাহ)
১৬) অত:পর আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দেয়া জীবিকা উপার্জন এবং তার নির্দেশের আলোকে দিন কাটানোর নিয়তে মসজিদ থেকে বের হওয়া। বের হওয়ার সময় মসজিদ থেকে বের হওয়ার দুআ পাঠ করত: বাম পা আগে রেখে মসজিদ থেকে বের হওয়া।
◼ গ. সূর্য উদিত হওয়ার পর থেকে নিয়ে সারাদিন:
এরপর দুনিয়াবি কাজ-কারবার করার পাশাপাশি সাধ্যানুযায়ী আল্লাহ ইবাদত-বন্দেগী করা।
এ ক্ষেত্রে কয়েকটি নির্দেশনা নিম্নরূপ:
১৭) পাঁচ ওয়াক্ত সালাত যথাসময়ে জামায়াতের সাথে আদায় করা। মহিলারা তাদের ঘরে যথাসময়ে আওয়াল ওয়াক্তে (সালাতের ১ম সময়ে) সালাত আদায় করবে। আর পুরুষরা মসজিদে গিয়ে তাকবীরে তাহরিমা সহকারে ১ম কাতারে সালাত আদায় করবে।
১৮) ফরয সালাতের আগে-পরের সুন্নতগুলো গুরুত্ব সহকারে আদায় করা।
১৯) যোহর সালাতের প্রায় এক বা দেড় ঘণ্টা পূর্বে সালাতুয যোহা (চাশত/আওয়াবীন) এর সালাত আদায় করা।
এর পরিমাণ হল, সর্ব নিম্ন ২ রাকআত। তবে দু রাকআত দু রাকআত করে ৮ রাকআত পড়া অধিক উত্তম।
২০) সারা দিনে কমপক্ষে এক পারা কুরআন তিলাওয়াতের চেষ্টা করা (এতে এক মাসে এক খতম হবে ইনশাআল্লাহ)।
সেই সাথে কুরআনের কিছু অংশের তরজমা ও তাফসীর পড়া।
২১) আমলের নিয়তে কমপক্ষে ২/৩ টা হাদিস পাঠ করা। এ ক্ষেত্রে ঈমান, আমল, তাকওয়া, ইখলাস ইত্যাদি বৃদ্ধির জন্য রিয়াযুস সালেহীন এবং সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব গ্রন্থদ্বয় অধিক উপযোগী। তবে ইচ্ছা ও আগ্রহের ভিত্তিতে অন্যান্য হাদিসগুলোও (যেমন সহীহুল বুখারী, মুসলিম ইত্যাদি) পাঠ করা যেতে পারে।
২২) কিছু আর্থিক দান করা বা কোন গরিব মানুষকে খাবার খাওয়ানো। (পরিমাণে অল্প হলেও নিয়মিত অব্যাহত রাখা আল্লাহর নিকট খুবই পছন্দনীয় আমল)
২৩) কোনও রোগী দেখতে যাওয়া।
২৪) কোথাও মৃত ব্যক্তির জানাযা হলে তাতে অংশ গ্রহণ করা এবং দাফন প্রক্রিয়ায় শরিক হওয়া।
২৫) নিকটাত্মীয় বা দীনী ভাই ও বন্ধুদের সাথে দেখা করা এবং তাদের খোঁজ-খবর নেয়া। (সহীহ হাদিসে বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তি একদিনে উপরোক্ত চারটি কাজ করলে মহান আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন)
২৬) একাকী বা কাউকে সঙ্গে নিয়ে কবর যিয়ারত করতে যাওয়া। (একই কবরস্থান প্রতিদিন নিয়ম করে যিয়ারত করা ঠিক নয় বরং মাঝে-মধ্যে করা যেতে পারে)
২৭) লোকজনের মাঝে দাওয়াতি কাজ করা। এলাকার বেনামাযী ও গাফেল লোকদেরকে দ্বীনের পথে আহ্বান করা, অমুসলিমদের মাঝে দাওয়াতি কাজ করা, কাউকে পাপকর্ম বা শরিয়ত বিরোধী কাজ করতে দেখলে শক্তি ও প্রভাব-প্রতিপত্তি থাকলে তাতে বাধা দেয়া, তা সম্ভব না হলে মুখে নিষেধ করা। তাও সম্ভব না হলে উক্ত অন্যায় ও পাপকর্মকে অন্তরে ঘৃণা করা। এটি ন্যূনতম ঈমানের চিহ্ন।
২৮) মানুষের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে উত্তম চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো। যেমন: হাসিমুখে লোকদের সাথে দেখা করা, সালাম বিনিময় করা, সুন্দর ও মিষ্টি ভাষায় কথা বলা, বিনয় ও ভদ্রতা সুলভ আচরণ করা, মানুষের উপকারে অগ্রগামী থাকা, দ্বীনের কাজে সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করা ইত্যাদি।
২৯) অলসতা পরিত্যাগ করে জীবিকা উপার্জনে কষ্ট পরিশ্রম করা, পিতামাতার সেবা করা, স্ত্রী ও সন্তানদের সাথে সুন্দর ও অভিভাবক সুলভ আচরণ করা এবং তাদেরকে দীনী তরবিয়ত (দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞান দান করে তার উপর চলার জন্য প্রশিক্ষণ) দেয়া।
◼ ঘ. সন্ধ্যা থেকে নিয়ে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত:
৩০) আসর সালাতের পর থেকে নিয়ে সূর্যাস্তের মধ্যে সন্ধ্যার দুআ ও যিকিরগুলো পাঠ করা।
৩১) কোনও মসজিদে আলেমদের দরস/আলোচনা থাকলে বা কোথাও ভালো কোন আলেমের ওয়ায/বক্তৃতা থাকলে তা শুনতে যাওয়া অথবা কোন হক্কানি সুন্নতের অনুসারী আলেমের নিকট ইলম শিক্ষা ও দীনী বিষয়ে জানার জন্য গমন করা। অন্যথায় মোবাইল মেমরী বা ইন্টারনেট থেকে নির্ভরযোগ্য বড় আলেমদের আলোচনা শোনা।
৩২) নফল রোযা থাকলে সূর্য ডুবার পর ইফতার করা। তারপর মাগরিব সালাতের জন্য মসজিদে গমন করা এবং মাগরিবের আযান ও সালাতের মধ্যবর্তী সময়ে দু রাকআত নফল পড়ার চেষ্টা করা যদি সুযোগ থাকে। (যদিও অত্যন্ত দুর্ভাগ্য যে, আমাদের সমাজের অধিকাংশ মসজিদে এ সুযোগ নাই)
৩৩) মাগরিব ও ইশার সালাতের মধ্যবর্তী সময় কিছু নফল সালাত আদায় করা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ সময়টুকুকে মানুষ অবহেলায় কাটিয়ে দেয় বলে নফল সালাত আদায়ে উৎসাহিত করেছেন।
৩৪) দীনী জ্ঞানার্জনের জন্য নির্ভরযোগ্য ও ভালো আলেমদের লিখিত বই-পুস্তক পাঠ করা।
৩৫) সারা দিনের কর্মকাণ্ড নিয়ে আত্ম সমালোচনা করা এবং ভুলত্রুটির জন্য আল্লাহর নিকট তওবা-ইস্তিগফার করা।
৩৬) অত:পর ইশার সালাতের পর একান্ত দরকার না হলে বা স্ত্রীর সাথে সময় কাটানো ছাড়া দুনিয়াবি কথা না বলে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়া।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সময়ে বরকত দান করুন এবং দিনরাতের পুরোটা সময়কে উপকারী ও সৎকর্মে অতিবাহিত করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানী
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, KSA
**ভাল মৃত্যুর উপায়।
প্রশ্ন: ভালো মৃত্যুর কোন আলামত আছে কি?
উত্তর: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য।
এক:
হুসনুল খাতিমা বা ভাল মৃত্যু...
ভাল মৃত্যু মানে- মৃত্যুর পূর্বে আল্লাহর ক্রোধ উদ্রেককারী গুনাহ হতে বিরত থাকতে পারা, পাপ হতে তওবা করতে পারা, নেকীর কাজ ও ভাল কাজ বেশি বেশি করার তাওফিক পাওয়া এবং এ অবস্থায় মৃত্যু হওয়া। এই মর্মে আনাস বিন মালিক (রাঃ) হতে সহিহ হাদিসে এসেছে তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
“আল্লাহ যদি কোন বান্দার কল্যাণ চান তখন তাকে (ভাল) কাজে লাগান।” সাহাবায়ে কেরাম বললেন: কিভাবে আল্লাহ বান্দাকে (ভাল) কাজে লাগান? তিনি বলেন: “মৃত্যুর পূর্বে তাকে ভাল কাজ করার তাওফিক দেন।” [মুসনাদে আহমাদ (১১৬২৫), তিরমিযি (২১৪২), আলবানি ‘সিলসিলা সহিহা’ গ্রন্থে হাদিসটিকে সহিহ সাব্যস্ত করেছেন (১৩৩৪)।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
“আল্লাহ তাআলা যদি কোন বান্দার কল্যাণ চান তখন সে বান্দাকে ‘আসাল’ করেন। সাহাবায়ে কেরাম বলেন: আসাল কি? তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা বান্দাকে বিশেষ একটি ভাল কাজ করার তাওফিক দেন এবং এই আমলের উপর তার মৃত্যু ঘটান।[সহিহ আহমাদ (১৭৩৩০), আলবানি সিলসিলা সহিহা গ্রন্থে হাদিসটিকে সহিহ ঘোষণা করেছেন (১১১৪)।
ভাল মৃত্যুর বেশ কিছু আলামত আছে। এর মধ্যে কোন কোন আলামত শুধু মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তি নিজে বুঝতে পারে এবং কোন কোন আলামত অন্যান্য মানুষও জানতে পারে।
দুই:
মৃত্যুকালে বান্দার নিকট তার ভাল মৃত্যুর যে আলামত প্রকাশ পায় সেটা হচ্ছে- বান্দাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অনুগ্রহ লাভের সুসংবাদ দেয়া হয়। এই মর্মে আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
“নিশ্চয় যারা বলে, আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ, অতঃপর তাতেই অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, তোমরা ভয় পেও না, চিন্তিত হইও না এবং তোমরা প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ কর।”[সূরা ফুসসিলত, আয়াত: ৩০]
মৃত্যুকালে মুমিন বান্দাদেরকে এই সুসংবাদ দেয়া হয়। দেখুন: তাফসিরে সাদী, পৃষ্ঠা- ১২৫৬।
এই মর্মে সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমে এসেছে- যা আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
“যে ব্যক্তি আল্লাহর সাক্ষাতকে ভালবাসে আল্লাহও তার সাক্ষাতকে ভালবাসেন। যে ব্যক্তির কাছে আল্লাহর সাক্ষাত প্রিয়, আল্লাহর নিকটও তার সাক্ষাত প্রিয়। আমি বললাম, হে আল্লাহর নবী! আপনি কি মৃত্যুর কথা বুঝাতে চাচ্ছেন? আমরা তো সবাই মৃত্যুকে অপছন্দ করি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: না, সেটা না। মুমিন বান্দাকে যখন আল্লাহর রহমত, তাঁর সন্তুষ্টি, তাঁর জান্নাতের সুসংবাদ দেয়া হয় তখন তিনি আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করাকে ভালবাসেন। আর কাফের বান্দাকে যখন আল্লাহর শাস্তি, তাঁর অসন্তুষ্টির সংবাদ দেয়া হয় তখন সে আল্লাহর সাক্ষাতকে অপছন্দ করে এবং আল্লাহও তার সাক্ষাতকে অপছন্দ করেন।”
ইমাম নববী (রহঃ) বলেন: “হাদিসের অর্থ হচ্ছে- যখন মানুষের মৃত্যুর গড়গড়া শুরু হয়ে যায়, যে অবস্থায় আর তওবা কবুল হয় না, সে অবস্থার পছন্দ-অপছন্দকে এখানে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। মুমূর্ষু ব্যক্তির কাছে সবকিছু স্পষ্ট হয়ে পড়ে, তার পরিণতি কী হতে যাচ্ছে সেটা তার সামনে পরিষ্কার হয়ে যায়।
• ভাল মৃত্যুর আলামত অনেক। আলেমগণ কুরআন-হাদিস খুঁজে এই আলামতগুলো বের করার চেষ্টা করেছেন। এই আলামতগুলোর মধ্যে রয়েছে-
১. মৃত্যুর সময় ‘কালেমা’ পাঠ করতে পারা।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
“যে ব্যক্তির সর্বশেষ কথা হবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ তিনি জান্নাতে প্রবেশ করবেন।” [সুনানে আবু দাউদ, ৩১১৬], সহিহ আবু দাউদ গ্রন্থে (২৬৭৩) আলবানি এই হাদিসকে সহিহ বলেছেন।
২. মৃত্যুর সময় কপালে ঘাম বের হওয়া।
বুরাইদা বিন হাছিব (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি তিনি বলেন:
“মুমিন কপালের ঘাম নিয়ে মৃত্যুবরণ করে।”[মুসনাদে আহমাদ (২২৫১৩), জামে তিরমিযি (৯৮০), সুনানে নাসায়ি (১৮২৮) এবং আলবানি সহিহ তিরমিযি গ্রন্থে হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]
৩. জুমার রাতে বা দিনে মৃত্যুবরণ করা।
দলিল হচ্ছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী:
“যে ব্যক্তি জুমার দিনে বা রাতে মৃত্যুবরণ করেন আল্লাহ তাকে কবরের আযাব থেকে নাজাত দেন।”[মুসনাদে আহমাদ (৬৫৪৬), জামে তিরমিযি (১০৭৪), আলবানি বলেছেন: সনদের সবগুলো ধারা মিলালে হাদিসটি সহিহ]
৪. আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা।
দলিল হচ্ছে আল্লাহ তাআলার বাণী:
“আর যারা আল্লাহর রাহে নিহত হয়,তাদেরকে তুমি কখনো মৃত মনে করো না। বরং তারা নিজেদের পালনকর্তার নিকট জীবিত ও জীবিকাপ্রাপ্ত। আল্লাহ নিজের অনুগ্রহ থেকে যা দান করেছেন তার প্রেক্ষিতে তারা আনন্দ উদযাপন করছে। আর যারা এখনও তাদের কাছে এসে পৌঁছেনি তাদের পেছনে তাদের জন্যে আনন্দ প্রকাশ করে। কারণ, তাদের কোন ভয় ভীতিও নেই এবং কোন চিন্তা ভাবনাও নেই। আল্লাহর নেয়ামত ও অনুগ্রহের জন্যে তারা আনন্দ প্রকাশ করে এবং তা এভাবে যে, আল্লাহ, ঈমানদারদের শ্রমফল বিনষ্ট করেন না।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৬৯-১৭১]
এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী:
“যে ব্যক্তি আল্লাহর রাহে নিহত হয় সে শহিদ এবং যে ব্যক্তি আল্লাহর রাহে মারা যায় সেও শহিদ।”[সহিহ মুসলিম, ১৯১৫]
৫. প্লেগ রোগে মারা যাওয়া।
দলীল হচ্ছে নবী আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী:
“প্লেগ রোগে মৃত্যু প্রত্যেক ঈমানদারের জন্য শাহাদাত।”[সহিহ বুখারী (২৮৩০) ও সহিহ মুসলিম (১৯১৬)]
এবং
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রী আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্লেগ রোগ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি তখন তিনি আমাকে জানান যে, “এটি হচ্ছে- আল্লাহর পক্ষ থেকে আযাব। আল্লাহ যাদেরকে শাস্তি দিতে চান তাদের উপর এই রোগ নাযিল করেন। আর আল্লাহ এই রোগ মুমিনদের জন্য রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছেন। যে মুমিন প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়ে নিজ এলাকাতে অবস্থান করবে, ধৈর্যধারণ করবে, সওয়াবের প্রত্যাশা করবে এবং এই একীন রাখবে যে, আল্লাহ তার জন্য যা লিখে রেখেছেন সেটাই ঘটবে সে ব্যক্তি শহিদের সমান সওয়াব পাবে।” [সহিহ বুখারি (৩৪৭৪)]
৬. যে কোন পেটের পীড়াতে মৃত্যুবরণ করা।
দলিল হচ্ছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী:
“যে ব্যক্তি পেটের পীড়াতে মৃত্যুবরণ করবে সে শহিদ।” [সহিহ মুসলিম (১৯১৫)]
৭. কোন কিছু ধ্বসে পড়ে অথবা পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করা।
দলিল হচ্ছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী:
“পাঁচ ধরনের মৃত্যু শাহাদাত হিসেবে গণ্য। প্লেগ রোগে মৃত্যু, পেটের পীড়ায় মৃত্যু, পানি ডুবে মৃত্যু, কোন কিছু ধ্বসে পড়ে মৃত্যু এবং আল্লাহর রাস্তায় শহিদ হওয়া।” [সহিহ বুখারি (২৮২৯) ও সহিহ মুসলিম (১৯১৫)]
৮. প্রসবউত্তর প্রসূতির মৃত্যু অথবা গর্ভবতী অবস্থায় নারীর মৃত্যু।
এর দলিল হচ্ছে আবু দাউদ (৩১১১) কর্তৃক বর্ণিত হাদিস; নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
“যে নারী জুমা (বাচ্চা) নিয়ে মারা যায় তিনি শহিদ।”।
ইমাম খাত্তাবি বলেন: এ হাদিসের অর্থ হচ্ছে- যে নারী পেটে বাচ্চা নিয়ে মারা যায়।[আওনুল মাবুদ]
ইমাম আহমাদ উবাদা বিন সামেত (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শহিদের শ্রেণীগুলো উল্লেখ করতে গিয়ে বলেছেন:
“যে নারী তার গর্ভস্থিত সন্তানের কারণে মারা যায় তিনি শহিদ। সে নারীকে তার সন্তান সুরার (নাভিরজ্জু) ধরে টেনে জান্নাতে নিয়ে যাবে।”[আলবানি ‘জানায়িয’ গ্রন্থে (৩৯) হাদিসটিকে সহিহ আখ্যায়িত করেছেন]
সুররা (নাভি): নবজাতকের জন্মের পর ধাত্রী নাড়ী কাটেন এবং সামান্য কিছু অংশ রেখে দেন। যে অংশটুকু রেখে দেন সেটাকে সুররা বা নাভি বলে। আর যে অংশটুকু কেটে ফেলেন সেটাকে সুরার (নাভিরজ্জু) বলা হয়।
৯. আগুনে পুড়ে, প্লুরিসি (ফুসফুসের আবরক ঝিল্লির প্রদাহজনিত রোগবিশেষ) এবং যক্ষ্মা রোগে মৃত্যু।
দলিল হচ্ছে- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
“আল্লাহর রাহে নিহত হওয়া শাহাদাত, প্লেগ রোগে মারা যাওয়া শাহাদাত, পানি ডুবে মারা যাওয়া শাহাদাত, পেটের পীড়ায় মারা যাওয়া শাহাদাত, সন্তান প্রবসের পর মারা গেলে নবজাতক তার মাকে নাভিরজ্জু ধরে টেনে জান্নাতে নিয়ে যাবে। (সংকলক বলেন, এই হাদিসের জনৈক বর্ণনাকারী বায়তুল মোকাদ্দাসের খাদেম আবুল আওয়াম হাদিসটির অংশ হিসেবে “আগুনে পুড়ে মৃত্যু ও যক্ষ্মা রোগ” এর কথাও বর্ণনা করেছেন।) আলবানি বলেছেন: হাদিসটি হাসান-সহিহ।[সহিহুত তারগিব ওয়াত তারহিব (১৩৯৬)]
১০. নিজের ধর্ম, সম্পদ ও জীবন রক্ষা করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করা।
দলিল হচ্ছে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী:
“যে ব্যক্তি তার সম্পদ রক্ষা গিয়ে মারা যায় সে শহিদ। যে ব্যক্তি তার ধর্ম (ইসলাম) রক্ষা করতে গিয়ে মারা যায় সে শহিদ। যে ব্যক্তি তার জীবন রক্ষা করতে গিয়ে মারা যায় সে শহিদ।”[জামে তিরমিযি (১৪২১)]
সহিহ বুখারি (২৪৮০) ও সহিহ মুসলিমে (১৪১) আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে তিনি বলেন: আমি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি-
“যে ব্যক্তি তার সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে মারা যায় সে শহিদ।”
১১. আল্লাহর রাস্তায় প্রহরীর দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যে ব্যক্তি মারা যায় সেও শহিদ।
দলিল হচ্ছে সহিহ মুসলিমের হাদিস (১৯১৩): সালমান আলফারেসি (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
“একদিন, একরাত পাহারা দেয়া একমাস দিনে রোজা রাখা ও রাতে নামায পড়ার চেয়ে উত্তম। আর যদি পাহারারত অবস্থায় সে ব্যক্তি মারা যায় তাহলে তার জীবদ্দশায় সে যে আমলগুলো করত সেগুলোর সওয়াব তার জন্য চলমান থাকবে, তার রিযিকও চলমান থাকবে এবং কবরের ফিতনা থেকে সে মুক্ত থাকবে।”
১২. ভাল মৃত্যুর আরো একটি আলামত হলো- নেক আমলরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
“যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলল এবং এ অবস্থায় তার মৃত্যু হলো সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। যে ব্যক্তি কোন একটি সদকা করল এবং এ অবস্থায় তার মৃত্যু হলো সেও জান্নাতে প্রবেশ করবে।” [মুসনাদে আহমাদ (২২৮১৩), আলবানি জানায়িয গ্রন্থে পৃষ্ঠা-৪৩ এ হাদিসটিকে সহিহ আখ্যায়িত করেছেন। দেখুন কিতাবুল জানায়িয, পৃষ্ঠা- ৩৪।
এই আলামতগুলো ব্যক্তির ভাল মৃত্যুর সুসংবাদ দেয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা নির্দিষ্টভাবে কোন ব্যক্তির ব্যাপারে এ নিশ্চয়তা দিব না যে, তিনি জান্নাতি। শুধু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাদের ব্যাপারে নিশ্চয়তা প্রদান করেছেন তারা ছাড়া। যেমন চার খলিফার ব্যাপারে তিনি নিশ্চয়তা প্রদান করেছেন।
আল্লাহ আমাদের সকলকে ভাল মৃত্যু দান করুন।
সূত্র: ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব
**মধ্যবর্তী কিয়ামত
প্রশ্ন:আমি এক ওয়েবসাইটে কিয়ামতের আলামতের ব্যাপারে পড়ছিলাম। আমি এ হাদিসটি পড়েছি:
(নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কিয়ামতের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো। তখন তিনি তাদের মাঝে সবচেয়ে কম বয়সী বালকের দিকে নজর দিয়ে বললেন: এ যদি বেঁচে থাকে তবে সে দীর্ঘদিন বাঁচার পুর্বেই সর্বশেষ সময় (কিয়ামত) তোমাদের কাছে আসবে।" এর দ্বারা তিনি তাদের মৃত্যু হওয়া এবং কিয়ামতকে বুঝিয়েছেন। কেননা সকল মানুষ অচিরেই মৃত্যুবরণ করবে এবং কিয়ামতের দিন হাযির হবে। কেউ কেউ বলছেন মানুষ মারা যাবার পরপর তার হিসাব গ্রহণ শুরু হয়ে যায়। এ হাদিসটি এই অর্থে সঠিক।)
এই হাদিসের অর্থ কি এই যে, ঐ বালকটি বৃদ্ধ হবার আগেই কিয়ামত শুরু হয়ে যাবে? দয়া করে হাদিসটির সঠিক অর্থ বিষদ ব্যাখ্যা করুন।
উত্তর:আলহামদু লিল্লাহ।
এই হাদিসটি সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমের বিভিন্ন রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে। যেমন, সহিহ বুখারী (৬১৪৬) ও সহিহ মুসলিম (২৯৫২)-এ এসেছে:
عن عائشة رضي الله عنها قالت : كان رجال من الأعراب جفاة يأتون النبي صلى الله عليه وسلم فيسألونه متى الساعة فكان ينظر إلى أصغرهم فيقول : إن يعش هذا لا يدركه الهرم حتى تقوم عليكم ساعتكم قال هشام [أحد رواة الحديث]: يعني موتهم.
(আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: কিছু অভদ্র বেদুঈন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে তাঁকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে বললো যে, কিয়ামত কবে হবে? তখন তিনি তাদের মাঝে সবচেয়ে কম বয়সীর দিকে নজর দিয়ে বললেন: এ যদি বেঁচে থাকে তবে সে বৃদ্ধ হওয়ার পুর্বেই তোমাদের উপর তোমাদের কিয়ামত সংগঠিত হবে।” হিশাম -হাদিসটির একজন বর্ণনাকারী- বলেন: এর অর্থ হলো তাদের মৃত্যু।
হাদিসটির অর্থ পরিষ্কার। হাদিসের উদ্দেশ্য হল: এই লোকগুলোর কিয়ামত। অর্থাৎ তাদের মৃত্যু খুব নিকটবর্তী। এই বালকটি বৃদ্ধ হওয়ার আগেই তা সংঘটিত হবে। এ হাদিসে الساعة الكبرى (বড় কিয়ামত)-কে উদ্দেশ্য করা হয়নি; যেটা হচ্ছে পুনরুত্থান দিবস।
কাজী ইয়ায (রহঃ) বলেন: এখানে “তোমাদের কিয়ামত” দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে— তাদের মৃত্যু। অর্থাৎ তাদের প্রজন্মের মৃত্যু কিংবা সম্বোধিত ব্যক্তিদের মৃত্যু।[ইমাম নববী রচিত "শারহে মুসলিম" থেকে উদ্ধৃত]
আল-কারমানী (রহঃ) বলেন: এ উত্তরটি হিকমতপূর্ণ শৈলীর অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ তোমরা বড় কিয়ামতের সময় সম্পর্কে প্রশ্ন করা বাদ দাও। কেননা সেটা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। বরং তোমরা তোমাদের প্রজন্মের সমাপ্তিকাল সম্পর্কে জিজ্ঞেস কর। কারণ সেটি জানা তোমাদের জন্য বেশী উপযোগী। যেহেতু সেটা জানাটা তোমাদেরকে নেক আমলের প্রতি উদ্বুদ্ধ করবে, নেক আমলের সময় ফুরিয়ে যাবার আগে। কেননা তোমাদের কেউ জানে না যে, কার আগে কে মারা যাবে।
রাগিব ইসফাহানী (রহঃ) বলেছেন: ساعة শব্দের অর্থ— সময়ের একটি অংশ। দ্রুত হিসাব গ্রহণের উপমাস্বরূপ এ শব্দ দিয়ে কিয়ামতকে বুঝানো হয়। আল্লাহ্ তাআলা বলেন: وَهُوَ أَسرَعُ الحاسِبينَ (এবং তিনি দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।)[সূরা আন’আম ৬:৬২] কিংবা নিম্নোক্ত আয়াতে আল্লাহ্ যা উল্লেখ করেছেন সে বিবেচনা থেকে কিয়ামত বুঝাতে এ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। كَأَنَّهُم يَومَ يَرَونَ ما يوعَدونَ لَم يَلبَثوا إِلّا ساعَةً مِن نَهارٍ (তারা যেদিন তাদের প্রতিশ্রুত শাস্তি দেখতে পাবে সেদিন তাদের মনে হবে, যেন তারা দিনের এক মুহূর্তের বেশী (পৃথিবীতে) অবস্থান করেনি।)[সূরা আহকাফ; ৪৬:৩৫]
الساعة (আস-সা’আতু) শব্দটি তিনটি জিনিস বুঝাতে ব্যবহৃত হয়:
■ الساعة الكبرى (বড় কিয়ামত): তা হলো যেদিন মানুষকে হিসাব গ্রহণের জন্য পুনরুত্থিত করা হবে।
■ الساعة الوسطى (মধ্যবর্তী কিয়ামত): তা হলো কোনো প্রজন্মের সকলের মৃত্যু।
■ الساعة الصغرى (ছোট কিয়ামত): তা হলো কোনো ব্যক্তির মৃত্যু।
কাজেই প্রত্যেক ব্যক্তির কিয়ামত হলো তার মৃত্যু।[ফাতহুল বারী থেকে সংকলিত]
আল্লাহ্ই সর্বজ্ঞ।
সূত্র: ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব