02/06/2026
বসরার এক বাজারে একজন লেখক বাস করত — নাম তার যায়িদ। সে চিঠি লিখত মানুষের হয়ে। যারা লিখতে পারত না, তারা তার কাছে আসত — বলত, সে লিখত, পাঠানো হতো। ব্যবসায়ীদের চিঠি, প্রবাসীদের ঘরের চিঠি, প্রেমিকের চিঠি, মায়ের চিঠি — সব ধরনের চিঠি সে লিখেছে জীবনে। মানুষের কথা সে কলমে তুলে দিত — এটাই ছিল তার কাজ, তার পরিচয়।
কিন্তু যায়িদের নিজের জীবনে একটা বড় ক্ষত ছিল। তার ছোট ভাই — নাম উমর — অনেক বছর আগে রাগ করে চলে গিয়েছিল। কোনো একটা সম্পত্তির বিরোধে কথা কাটাকাটি হয়েছিল। যায়িদ রাগের মাথায় বলেছিল — “তুমি আমার ভাই নও।” উমর সেই দিনই বাড়ি ছেড়েছিল। তারপর বারো বছর। কোনো খোঁজ নেই, কোনো চিঠি নেই।
যায়িদ অনেকবার ভেবেছে — ভাইকে চিঠি লিখবে। কিন্তু প্রতিবার কলম তুলে রেখে দিয়েছে। কারণ একটাই — সে জানত না কী লিখবে। “ভাই, ফিরে এসো” — এটুকু কি যথেষ্ট? নাকি আরো কিছু বলতে হবে? কিন্তু কী বলবে? সে তো ভুল করেছিল। “আমি ভুল করেছিলাম” — এই কথাটা লেখা এত কঠিন ছিল যে বারো বছরেও লেখা হয়নি।
একদিন দোকানে এক বৃদ্ধ এলেন। চিঠি লেখাতে নয় — একটু বসতে। নাম শায়খ সালিম। চুল সাদা, চলতে একটু কষ্ট হয়, কিন্তু চোখ দুটো তীক্ষ্ণ। যায়িদের দোকানে বসলেন। চারদিক দেখলেন। বললেন — “তুমি চিঠি লেখো?” যায়িদ বলল — “হ্যাঁ।” শায়খ বললেন — “কতজনের চিঠি লিখেছ জীবনে?” যায়িদ বলল — “হাজারের বেশি হবে।” শায়খ বললেন — “নিজের চিঠি?” যায়িদ থামল। বলল — “মানে?” শায়খ বললেন — “নিজের মনের কথা কাউকে লিখেছ কোনোদিন?”
যায়িদ চুপ হয়ে গেল। শায়খ কিছু বুঝলেন যেন। আবার বললেন — “কেউ আছে — যাকে চিঠি লেখা দরকার, কিন্তু লেখা হয়নি?” যায়িদ মাথা নামাল। বলল — “আছে।” শায়খ বললেন — “কেন লেখোনি?” যায়িদ বলল — “জানি না কী লিখব।” শায়খ বললেন — “যা মনে আছে তাই লেখো।” যায়িদ বলল — “মনে আছে — আমি ভুল করেছিলাম।” শায়খ বললেন — “তাহলে সেটাই লেখো।”
যায়িদ বলল — “এত সহজ?” শায়খ বললেন — “ক্ষমা চাওয়া সহজ নয়। কিন্তু কঠিনও নয় — যদি হৃদয়ে সত্যিকারের অনুশোচনা থাকে। তুমি কি সত্যিই অনুতাপ করো?” যায়িদ বলল — “বারো বছর ধরে করছি।” শায়খ বললেন — “তাহলে বারো বছর ধরে যে কষ্ট বহন করেছ — সেটা কি সেই একটা চিঠির চেয়ে বেশি কঠিন ছিল না?”
এই কথাটা যায়িদের বুকে একটা আঘাত করল। সত্যিই তো — বারো বছর সে বহন করেছে। বারো বছর ঘুমের মধ্যে ভাইয়ের কথা মনে পড়েছে। বারো বছর কোনো উৎসবে মনে হয়েছে — ভাই থাকলে কেমন হতো। বারো বছরের এই ভার কি একটা চিঠির চেয়ে ভারী ছিল না?
সেই রাতে যায়িদ বসল। কলম নিল। কাগজ রাখল। অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর লিখতে শুরু করল। “বিসমিল্লাহ। হে আমার ভাই উমর — আমি জানি না তুমি এই চিঠি পাবে কিনা। জানি না তুমি পড়বে কিনা। কিন্তু আমি লিখছি — কারণ বারো বছর ধরে যা বলা হয়নি তা আর বুকে রাখতে পারছি না। আমি ভুল করেছিলাম। সেদিন যা বলেছিলাম — মিথ্যা ছিল। তুমি আমার ভাই। ছিলে, আছ, থাকবে। সম্পত্তি গেছে — ভালোই হয়েছে। কিন্তু তুমি গেছ — এটা ভালো হয়নি। আমি ক্ষমা চাই। তুমি ফিরে এসো।”
চিঠি লিখে যায়িদ অনেকক্ষণ বসে রইল। বুকটা হালকা লাগছে — যেন বারো বছরের পাথর সরে গেছে। কিন্তু সমস্যা একটাই — উমর কোথায় আছে সে জানে না। চিঠি পাঠাবে কোথায়? সে পরদিন শায়খের কাছে গেল। বলল — “চিঠি লিখেছি। কিন্তু পাঠাব কোথায়? ভাইয়ের ঠিকানা জানি না।” শায়খ বললেন — “তুমি একটা কাজ করো — চিঠিটা রেখে দাও। আর আল্লাহর কাছে দুআ করো। বলো — হে আল্লাহ, আমি ভাইকে ক্ষমা চেয়েছি। তুমি আমাদের মিলিয়ে দাও।”
যায়িদ বলল — “দুআ কি কাজ হবে?” শায়খ বললেন — “তুমি বারো বছর নিজের চেষ্টায় কিছু করতে পারোনি। এখন আল্লাহর হাতে ছেড়ে দাও। তিনি কি দুই ভাইকে মেলাতে পারেন না?” যায়িদ বলল — “পারেন। কিন্তু কীভাবে হবে?” শায়খ বললেন — “সেটা তোমার জানার দরকার নেই। তোমার কাজ শুধু ক্ষমা চাওয়া এবং দুআ করা। বাকিটা তাঁর।”
যায়িদ সেই রাত থেকে দুআ করতে শুরু করল। প্রতিদিন। ফজরের পর। “হে আল্লাহ, আমার ভাইকে ফিরিয়ে দাও।” শুধু এটুকু। কিন্তু এই একটা দুআ সে মনে রাখত সবসময়। একমাস গেল। দুমাস গেল। কিছু হলো না। যায়িদ হতাশ হলো না। শায়খ বলেছিলেন — দুআ কবুল হওয়ার সময় আল্লাহই ঠিক করেন।
তিন মাস পর — এক সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করছিল যায়িদ। হঠাৎ দেখল — একজন মানুষ রাস্তার ওপাশ থেকে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মুখটা চেনা চেনা। কিন্তু চিনতে পারছে না। লোকটা এগিয়ে এলো। আরেকটু কাছে এলো। যায়িদের বুক থেমে গেল। উমর। বারো বছর বড় হয়ে গেছে। চুলে পাক ধরেছে। কিন্তু সেই চোখ — সেই একই চোখ।
দুজন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। কোনো কথা নেই। তারপর যায়িদ বলল — “ভাই।” এই একটা শব্দ। উমরের চোখ ভিজে এলো। সে বলল — “ভাই।” তারপর দুজন এগিয়ে এলো। জড়িয়ে ধরল। রাস্তার মাঝখানে। মানুষ দেখছে — কিন্তু কেউ কিছু মনে করল না। কারণ এই দৃশ্য দেখে মানুষ সরে যায় না — থামে।
অনেকক্ষণ পর যায়িদ জিজ্ঞেস করল — “তুমি এখানে কেন এলে? কীভাবে জানলে?” উমর বলল — “জানি না। হঠাৎ মন চাইল। মনে হলো — একবার দেখে আসি। তুমি কি এখনো এখানে আছ কিনা।” যায়িদ বুঝল — এটা তার দুআর জবাব। আল্লাহ উমরের হৃদয়ে সেই টান দিয়েছেন। সে কোনো চিঠি পাঠাতে পারেনি — কিন্তু আল্লাহ তার দুআ পাঠিয়ে দিয়েছেন সরাসরি ভাইয়ের হৃদয়ে।
সেই রাতে দুই ভাই বসল। অনেক কথা হলো। অনেক বছরের কথা। শেষে যায়িদ বলল — “ভাই, আমি একটা চিঠি লিখেছিলাম। পাঠাতে পারিনি। পড়বে?” উমর বলল — “হ্যাঁ।” যায়িদ চিঠিটা দিল। উমর পড়ল। শেষে বলল — “এটা কখন লিখেছিলে?” যায়িদ বলল — “তিন মাস আগে।” উমর চুপ করে রইল। তারপর বলল — “আমি ঠিক তিন মাস আগে থেকে মনে মনে ভাবছিলাম — একবার যাই।” যায়িদ আস্তে বলল — “তাহলে চিঠি পৌঁছেছিল। শুধু অন্য পথে।”
পরদিন যায়িদ শায়খের কাছে গেল। শায়খ শুনলেন। তারপর বললেন — “দেখলে? তুমি চিঠি লিখতে পারোনি — কিন্তু দুআ লিখেছিলে। আর দুআর চিঠি কখনো পথ হারায় না। সেটা সরাসরি আল্লাহর কাছে যায়। আর আল্লাহ যখন সেই চিঠি পান — তিনি নিজেই ডেলিভারি দেন।” যায়িদ হাসল। এমন হাসি যা বারো বছর হাসেনি।
“মানুষের কাছে পাঠানো চিঠি পথ হারাতে পারে। কিন্তু আল্লাহর কাছে পাঠানো দুআ কখনো পথ হারায় না। কারণ আল্লাহ সর্বত্র কি বা কে আছে সব জানেন — এবং তিনি প্রতিটি দুআ শোনেন।”
— ইমাম ইবনুল জাওযি রহ., আল-লাতাইফ
“তোমাদের রব বলেছেন — আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেব।”
— সূরা গাফির, ৪০:৬০
“আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।”
— সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৮৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫৬
“সিলাতুর রহিম আয়ু বাড়ায় এবং রিযিক প্রশস্ত করে।”
— মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১২২৩৮ — সনদ হাসান
📖 সূত্র: আল-লাতাইফ ফিল ওয়াআজ, ইমাম আবুল ফারাজ ইবনুল জাওযি রহিমাহুল্লাহ (৫০৮–৫৯৭ হি.)