15/10/2026
রবীন্দ্রনাথ কোন ধর্মের ব্যক্তি ছিলেন তা নিয়ে দেখলাম একটা তর্ক বিতর্ক শুরু হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের ধর্ম চর্চা নিয়ে তর্ক বিতর্ক হতেই পারে এটা হওয়াটা অহেতুক নয়। কিন্ত সমস্যা হল রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে এই দেশের মানুষকে হিন্দু বিদ্বেষ বানাবার পায়তারা করা হচ্ছে যা ভুল। যদি হিন্দু বিদ্বেষই উদ্দেশ্য থাকে তাহলে রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি সুকান্ত, জীবনানন্দ এদের নামধামও সমালোচনা হিসেবে আলোচনাতে আসত। কিন্ত বাংলাদেশের মানুষ সুকান্ত , জীবনানন্দ সহ অন্যান্য কবিদের প্রতি বরাবরই শ্রদ্ধা এবং তাদের কবিতা চর্চা করে এসেছে ।
রবীন্দ্রনাথের প্রতি যে ঘৃণা কাজ করে এই দেশের মানুষের তার পিছনে রবীন্দ্রনাথ হিন্দু হবার চেয়েও তার জমিদার হওয়াটা বেশি কাজ করে। পূর্ববঙ্গের মুসলমানেরা বৃটিশ আমলে চরমভাবে নির্যাতিত নিপীড়িত ছিল। আর এই নির্যাতনটা জমিদারদের দ্বারাই বেশি ঘটেছে। নিজের বানানো পুকুর থেকে ক্লান্ত জমিদারকে পানি খাওয়ালে সেই পানি খাবার পরেই সেই জমিদারদের সেই পুকুরের উপর করারোপ করবার ইতিহাস আছে। আর কর আদায়ের জন্য নৃশংস অত্যাচার, জুলুম তা এই বঙ্গের মানুষ ভুলে নাই।
জমিদারদের ছেলেপেলেদের বড় একটা অংশই কলকাতা, বিদেশ থেকে উচ্চ শিক্ষা করে আসত। কিন্ত সেগুলো এই বঙ্গের মুসলমানদের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের পিছনে কোন কাজে লাগত না। যত বেশি শিক্ষিত সে তত বেশি স্মার্টলি কর আদায় করতে জানত। রবীন্দ্রনাথের প্রতি যে ঘৃণা কিংবা রবীন্দ্রনাথের বিশাল সাহিত্য কর্ম থাকবার পরেও তাকে যে তাচ্ছিল্য করার যে সংস্কৃতি এই দেশের মানুষের মধ্যে আছে তা মূলত বংশানুক্রমে পাওয়া। যাকে কালেক্টিভ মেমোরি অফ এনমিটি বলা সম্ভব। আমরা জমিদার বললেই বুঝি এই দেশের মুসলমানদের উপর দাঁড়ির জন্য কর চাপিয়ে দেওয়া। হিন্দুদের পুজা উৎসব উপলক্ষে জোর করে মুসলমানদের থেকে কর আদায় করা। গরু কোরবানি করতে নিষেধাজ্ঞা করা। এগুলো আমাদেরকে এক ঐতিহাসিক শত্রুতার ডিএনএ বপন করে দিয়ে গিয়েছে। যা আমাদের ডিএনএ-তে সংরক্ষিত।
জমিদারের পোলা নোবেল পেলেও আমার লাভ নাই কেননা এই পোলাই আমার কাছে মাস শেষ হবার আগেই কর আদায়ের জন্য পাইক পেয়াদা নিয়ে হাজির হবে। এটা আমাদের দাদা, পরদাদারা ভাল করে জানতেন। এজন্য রবীন্দ্রনাথ পশ্চিমবঙ্গে বরনীয় হলেও পূর্ববঙ্গের চাষা ভুষা মানুষ অর্থাৎ আমরা রবীন্দ্রনাথ বলতেই জমিদার বুঝি।
এখন রবীন্দ্রনাথের ধর্মচর্চা নিয়ে কথা বলা যাক। রবীন্দ্রনাথকে হিন্দু বললে অনেক সেক্যুলারই নিজেকে আতেল প্রমাণ করার জন্য এগিয়ে আসেন। যে রবীন্দ্রনাথ যে ব্রাহ্ম ছিলেন এই বিষয়টা আমরা যেন ভুলে যাচ্ছি। অথচ রবীন্দ্রনাথের নিজের স্বীকারোক্তি আছে যে সে তার ব্রাহ্ম ধর্ম মূলত হিন্দুরই ধর্ম। রবীন্দ্রনাথ হিন্দু দর্শন খুব ভালো করে বুঝতেন এবং জানতেন। ব্রাহ্ম ধর্মকে এভাবেই সাজানো হয়েছিল যেন তা তার ঐতিহাসিক উৎসস্থল কে ভুলে না যায়। হিন্দু দর্শনে নাস্তিকতা যেমন সম্ভব , মূর্তি বাদ দিয়ে প্রকৃতি পুজা যেমন সম্ভব তদ্রুপ একজনকে কেন্দ্র করে ভক্তি শ্রদ্ধা করাও সম্ভব। অর্থাৎ ব্রাহ্ম ধর্মকে রবীন্দ্রনাথেরা হিন্দু ধর্মের একটি আমব্রেলার অংশ হিসেবে নিয়েছিলেন। এটা আমার কথা না । স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই এরকম কথা বলে গিয়েছেন ।
রবীন্দ্রনাথ তার 'ভারতবর্ষীয় সমাজ' নামক প্রবন্ধে বলেন -
" সমাজকে শিক্ষাদান, স্বাস্থ্যদান, অন্নদান, ধনসম্পদ-দান, ইহা আমাদের নিজের কর্ম; ইহাতেই আমাদের মঙ্গল-- ইহাকে বাণিজ্যহিসাবে দেখা নহে, ইহার বিনিময়ে পুণ্য ও কল্যাণ ছাড়া আর কিছুই আশা না করা, ইহাই যজ্ঞ, ইহাই ব্রহ্মের সহিত কর্মযোগ, এই কথা নিয়ত স্মরণ করা, ইহাই হিন্দুত্ব। স্বার্থের আদর্শকেই মানবসমাজের কেন্দ্রস্থলে না স্থাপন করিয়া, ব্রহ্মের মধ্যে মানবসমাজকে নিরীক্ষণ করা, ইহাই হিন্দুত্ব।"
রবীন্দ্রনাথ আরেক স্থানে স্পষ্টই বলেছেন সে তার ধর্মচর্চার জন্য হিন্দুসম্প্রদায়ের বাহিরের কিছু বিষয়টা মোটেও এরকম নয়। বরং সে নিজেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্তই মনে করতেন।
রবীন্দ্রনাথ তার 'সাকার ও নিরাকার উপাসনা' প্রবন্ধে বলেন -
"সম্প্রতি কিছুকাল হইতে সাকার নিরাকার উপাসনা লইয়া তীব্রভাবে সমালোচনা চলিতেছে। যাঁহারা ইহাতে যোগ দিয়াছেন তাঁহারা এম্নি ভাব ধারণ করিয়াছেন যেন সাকার উপাসনার পক্ষ অবলম্বন করিয়া তাঁহারা প্রলয়জলমগ্ন হিন্দুধর্মের পুনরুদ্ধার করিতেছেন। নিরাকার উপাসনা যেন হিন্দুধর্মের বিরোধী। এইজন্য তাহার প্রতি কেমন বিজাতীয় আক্রোশে আক্রমণ চলিতেছে। এইরূপে প্রাচীন ব্রহ্মজ্ঞানী ঋষি ও উপনিষদের প্রতি অসম্ভ্রম প্রকাশ করিতে তাঁহাদের পরম হিন্দুত্বের অভিমান কিছুমাত্র সংকুচিত হইতেছে না। তাঁহারা মনে করিতেছেন না, ব্রাহ্ম বলিয়া আমরা বৃহৎ হিন্দুসম্প্রদায়ের বহির্ভূত নহি।
হিন্দুধর্মের শিরোভূষণ যাঁহারা, আমরা তাঁহাদের নিকট হইতে ধর্মশিক্ষা লাভ করি। অতএব ব্রাহ্ম ও হিন্দু বলিয়া দুই কাল্পনিক বিরুদ্ধপক্ষ খাড়া করিয়া যুদ্ধ বাধাইয়া দিলে গোলাগুলির বৃথা অপব্যয় করা হয় মাত্র।"
ব্রাহ্ম ধর্ম যে হিন্দুরই ধর্ম এ কথার স্পষ্ট স্বীকারোক্তি রবীন্দ্রনাথ করে গিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ তার 'আত্মপরিচয়' প্রবন্ধে বলেন -
"আমরা যে-ধর্ম্মকে গ্রহণ করিয়াছি তাহা বিশ্বজনীন তথাপি তাহা হিন্দুরই ধর্ম্ম। এই বিশ্ববর্ম্মকে আমবা হিন্দুর চিত্ত দিয়াই চিন্তা করিয়াছি, হিন্দুর চিত্ত দিয়াই গ্রহণ করিয়াছি। শুধু ব্রহ্মের নামের মধ্যে নহে, ব্রহ্মের ধারণার মধ্যে নহে, আমাদের ব্রহ্মের উপাসনার মধ্যেও একটি গভীর বিশেষত্ব আছেই—এই বিশেষত্বের মধ্যে বহুশত বৎসরের হিন্দুর দর্শন, হিন্দুর ভক্তিতত্ত্ব, হিন্দু যোগসাধনা, হিন্দুর অনুষ্ঠান প্রতিষ্ঠান, হিন্দুর ধ্যানদৃষ্টির বিশেষত্ব ওতপ্রোতভাবে মিলিত হইয়া আছে। আছে বলিয়াই তাহা বিশেষ ভাবে উপাদেয়, আছে বলিয়াই পৃথিবীতে তাহার বিশেষ মূল্য আছে; আছে বলিয়াই সত্যের এই রূপটিকে—এই রসটিকে মানুষ কেবল এখান হইতে পাইতে পারে।"
রবীন্দ্রনাথ খুব সচেতন এক ব্যক্তি ছিলেন। মানে যে চর্চাটাই করতেন তা অন্ধের মত ছিল না। তার ধর্মের ব্যাপারেও তিনি সচেতন ছিলেন। ব্রাহ্ম ধর্ম গ্রহন করে একজন সৃষ্টিকর্তার উপর আস্তাশীল হলেও তিনি জানতেন তার এই চর্চা হিন্দুদের প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম হলেও তা কোন্মতেই মুসলমান কিংবা খৃস্টানদের প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম হবে না। রবীন্দ্রনাথ তার 'রামমোহন রায়' শীর্ষক প্রবন্ধে বলেন ,
"আমি যদি উদারতা-পূর্বক বলি, খ্রীস্টধর্মে ব্রাহ্মধর্ম আছে, মুসলমান-ধর্মে ব্রাহ্মধর্ম আছে, তবে উদারতা-নামক পরম শ্রুতিমধুর শব্দটার গুণে তাহা কানে খুব ভালো শুনাইতে পারে, কিন্তু কথাটা মিথ্যা কথা হয়। সুতরাং সত্যের অনুরোধে মিথ্যা উদারতাকে ত্যাগ করিতে হয়। এইজন্য রামমোহন রায়ের ব্রাহ্মধর্ম ঋষিদেরই ব্রাহ্মধর্ম ।"
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নোবেল পাবার পর তাকে যতগুলো পত্রিকা তাকে নিয়ে রিপোর্ট করেছে প্রায় সব রিপোর্টেই তাকে হিন্দু কবি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই রিপোর্টগুলোর বিরোধিতা করে রবীন্দ্রনাথ কখনো কোন মন্তব্য দিয়েছে তা জানা যায় না। অর্থাৎ তিনি কোথাও নিউ ইয়র্ক টাইমসের অমুক রিপোর্টে তাকে কেন হিন্দু বলে সম্বোধন করা হল অথচ সে ব্রাহ্মন এরকম কোন বক্তব্য আমরা রবীন্দ্রনাথের থেকে পাইনি।
বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর রবীন্দ্রনাথ কেন্দ্রিক বাংলাদেশকে জড়িয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস তিনটে রিপোর্ট করে সেখানে বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করা হয় যেহেতু মেজোটিরিয়ান মুসলিম দেশ হয়েও নিজেদেরকে সেক্যুলার প্রমাণ করার জন্য তারা একজন হিন্দু লেখকের লেখা গানকে নিজেদের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে তুলে ধরেছে।
তাই কেউ যদি রবীন্দ্রনাথকে হিন্দু বলে তাহলে তা ভুল না। বরং এটাই সঠিক বক্তব্য। অন্যদিকে যারা রবীন্দ্রনাথকে ব্রাহ্ম বলে তার হিন্দু আইডেন্টিটিকে লুকিয়ে ফেলতে চান তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ আছে। তারা যতটুকু না রবীন্দ্রনাথকে বাচাতে চান তার থেকে বেশি এই দেশের মুসলমানদেরকে হিন্দুবিদ্বেষী সাম্প্রদায়িক হিসেবে তুলে ধরতে চান।
সংযুক্ত ছবি: রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তির পর নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি রিপোর্ট যা তার নোবেল প্রাপ্তির দশদিন পর ছাপানো হয় অর্থাৎ ২৩ শে নভেম্বর ১৯১৩ সাল।