25/04/2026
সাহাবায়ে কেরামের হুজ্জিয়ত ও প্রামাণিকতা
-- মাওলানা আবু সাবের আব্দুল্লাহ
সালাফের কিতাবে প্রচলিত পরিভাষা ‘হুজ্জিয়তে সাহাবা’। এর দুই স্তর--
حجية الصحابة من حيث الافراد
ব্যক্তি সাহাবীর কওল ফেয়েল (দ্বীনী কথা-কাজ) এর প্রামাণ্যতা।
حجية الصحابة من حيث الجماعة
সাহাবী সমষ্টির কওল ফেয়েলের প্রামাণ্যতা।
অর্থাৎ যেমনিভাবে من حيث الافراد ব্যক্তি সাহাবীর কওল-ফেয়েল সুন্নাহর অংশ হিসাবে শরীয়তের দলিল এবং হুজ্জত, তেমনি من حيث الجماعة সাহাবায়ে কেরামের ‘সামষ্টিক আমল, দ্বীনী সমঝ-বুঝ ও রুচি-প্রকৃতি’ হকের অকাট্ট মিয়ার ও প্রমাণ। তাই মিয়ারে হক বলতে সাহাবায়ে কেরামের ইজমার অকাট্টতা উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। পূর্ববর্তী উলামায়ের মাঝে এই অর্থে সাহাবায়ে কেরাম হুজ্জত ও মিয়ারে হক হওয়ার বিষয়ে কোনো দ্বিমত ছিলো না। আর ব্যক্তি সাহাবীর কওল-ফেয়েল এর প্রামাণ্যতার ব্যাপারেও জমহুরের মত হলো তারা শরিয়তের দলিল।
মোটকথা কোরআন-হাদীস পৌঁছানোর ক্ষেত্রে, কোরআন-সুন্নাহর সমঝ-বুঝের ক্ষেত্রে, ঈমান-আকিদার শুদ্ধতা বিচারে এবং সুন্নত-বিদআত নির্ণয়ে জামাতে সাহাবা হলেন পরবর্তীদের জন্য হুজ্জত, হকের মাপকাঠি। আমাদের জন্যে অন্যতম আদর্শ এবং ঈমান ও আমলের মিয়ার।
আমার ঈমান সহীহ নাকি গলত, কোরআন-হাদীস মোতাবেক হলো কি হলো না-- এটার মাপকাঠি সাহাবায়ে কেরাম। আমার আমল নেক আমল নাকি বিদআত-- এর এক নিরুপক সাহাবায়ে কেরাম।
এটাই চৌদ্দশত বছরের উম্মতের সিদ্ধান্ত, সর্বসম্মত অভিমত। শাখাগত ফিকহি মাসায়েলেও তাদের একাধিক মতের মাঝে যে কোনো এক মতকে প্রাধান্য দেওয়া নিয়ম। এর বাইরে যাওয়া বিপজ্জনক।
কোনো সাহাবীর ব্যক্তিগত পদস্খলনের সাথে হুজ্জিয়ত ও মিয়ারে হকের সম্পর্ক নেই। কারণ সাহাবী নিজেই এটাকে গুনাহ মনে করেন। সুতরাং এটা আমাদের জন্য অনুসরণীয় নয়। তিনি এ থেকে তওবা করেছেন এবং আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। তাছাড়া কোরআন-সুন্নাহর আলোকে তারা আদেল (সততা ও তাকওয়ার অধিকারী) ও জান্নাতী।
সাহাবায়ে কেরামের এই হুজ্জিয়ত ও মিয়ার সম্পর্কে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মা আনা আলাইহি ওয়া আসহাবী’-- ফেরকায়ে নাজিয়া তথা মুক্তিপ্রাপ্ত জামাআত হবে সেটি, যে জামাআত ‘আমি ও আমার সাহাবীরা যে আকীদা-আমলের ওপর আছি’ তার ওপর থাকবে। আর এই মতের অনুসারীদের বলা হয় ‘আহলুস সুন্নাহ’।
‘আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআ’ নামটি এসেছে উপরোক্ত হাদীস থেকে। সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকেও এই নাম বর্ণিত আছে। তাফসীরে ইবনে কাসীরে এসেছে,
وقوله تعالى: {يَوْمَ تَبْيَضُّ وُجُوهٌ وَتَسْوَدُّ وُجُوهٌ} يعني: يوم القيامة، حين تبيض وجوه أهل السنة والجماعة، وتسوّد وجوه أهل البدعة والفرقة.
কেয়ামতের দিন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর চেহারা হবে শুভ্র-সমুজ্জ্বল আর আহলুল বেদআত ওয়াল ফুরকার চেহারা হবে কালো ও মলিন। (তাফসীরে ইবনে কাসীর, ২/৩৯৪)
হুজ্জিয়তে সাহাবা ও মিয়ারে হকের এই মর্ম বুঝে না বুঝে অস্বীকার করার কারণে অতীতে শিয়া ফেরকার জন্ম হয়েছে, আধুনিককালেও কেউ কেউ গোমরা এবং বিপথগামী হয়েছে। উপমহাদেশে যার অন্যতম নজির সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী ও তার প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামী। এ ব্যাপারে আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে।
(মওদুদী মতবাদ: দার্শনিকভিত্তি ও বৈশিষ্ট্য শীর্ষক পান্ডুলিপি থেকে উৎকলিত)