27/04/2026
আজ ২৭ এপ্রিল। বাংলার রাজনীতির আকাশছোঁয়া এক মহীরুহের মহাপ্রয়াণ দিবস। আবুল কাশেম ফজলুল হক, যাকে আমরা 'শেরে বাংলা' হিসেবে জানি। বর্তমান প্রজন্মের কাছে তাকে কেবল একজন সরলমনা নেতা হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও, শেরে বাংলার প্রকৃত পরিচয় ছিল, তিনি ছিলেন বাংলার বঞ্চিত মুসলমানদের প্রথম এবং প্রধান পলিটিক্যাল লিডার। তিনি ছিলেন সেই অনন্য ব্যক্তিত্ব, যিনি কলকাতার বাবু-সংস্কৃতি আর জমিদারদের শাসনের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিলেন।
১৮৭৩ সালে বরিশালের পলিমাটিতে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি মেধায় ছিলেন সমসাময়িক যে কারো চেয়ে অগ্রগামী। কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে ট্রিপল অনার্স এবং একই সাথে কলকাতার রিপন কলেজ থেকে বি.এল. পাশ করে স্যার আশুতোষ মুখার্জির শিক্ষানবিশ হিসেবে কলকাতা হাইকোর্টে নিজের নাম তালিকাভুক্ত করেন এ. কে. ফজলুল হক। দুবছর শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করার পর ১৯০০ সালে তিনি সরাসরি আইন ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু তিনি আয়েশি জীবনের বদলে বেছে নিয়েছিলেন কণ্টকাকীর্ণ পথ। ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে ১৯১৩ সালে বঙ্গীয় আইনসভায় তাঁর প্রবেশ ছিল মূলত বাংলার মুসলমানদের জন্য এক নতুন ভোরের সূচনা।
তৎকালীন শিক্ষা ব্যবস্থায় বাংলার মুসলিম ছাত্ররা এক চরম বৈষম্যের শিকার হতো। একটি প্রচলিত অভিযোগ ছিল যে, কলকাতার বর্ণহিন্দু শিক্ষকরা উত্তরপত্রে মুসলিম নাম দেখলেই নম্বর কমিয়ে দিতেন বা উদ্দেশ্যমূলকভাবে ফেল করিয়ে দিতেন। মেধাবী ছাত্ররা যেন স্রেফ নামের কারণে পিছিয়ে না পড়ে, সেজন্য ফজলুল হক এক বৈপ্লবিক প্রস্তাব নিয়ে আসেন। তিনি দাবি তোলেন,
"পরীক্ষার খাতায় ছাত্রের নাম লেখা থাকবে না, তার বদলে থাকবে কেবল রোল নম্বর।"
এই প্রস্তাবের পেছনে তাঁর যুক্তি ছিল অকাট্য, যাতে পরীক্ষক কোনোভাবেই বুঝতে না পারেন পরীক্ষার্থী হিন্দু না মুসলিম। কলকাতার এলিট সমাজ তখন এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছিল, কারণ এর ফলে মেধার নামে চলা তাদের একচেটিয়া আধিপত্য নষ্ট হওয়ার ভয় ছিল। কিন্তু শেরে বাংলা জানতেন, সিস্টেম পরিবর্তন না করলে পিছিয়ে পড়া সমাজ কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। শেষ পর্যন্ত তাঁর অনড় অবস্থানের কারণেই এই সংস্কারটি কার্যকর হয়, যা বাংলার মুসলিম ছাত্রদের উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করে দেয়।
বাংলার মুসলমানদের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা রক্ষায়ও শেরে বাংলা ছিলেন অগ্রগণ্য। ১৯৩৭ সালে যখন সমগ্র ভারতের রাষ্ট্রভাষা কী হবে তা নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে, তখন একটি ঐতিহাসিক বিরোধ তৈরি হয়। সেই সময়ে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে হিন্দি ভাষাকে ভারতের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার জোর প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছিল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো ব্যক্তিও তখন হিন্দির পক্ষে মত দিয়েছিলেন। কিন্তু দূরদর্শী ফজলুল হক জানতেন, বাংলার মানুষের মুখের ভাষা আর অস্তিত্ব অবিচ্ছেদ্য। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বাংলার পক্ষে অবস্থান নেন এবং ভোট প্রদান করেন। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, চাপিয়ে দেওয়া কোনো ভাষা নয়, বরং কোটি মানুষের প্রাণের ভাষা বাংলাই তার আপন মর্যাদা পাবে।
শেরে বাংলার রাজনীতির দর্শন বুঝতে গেলে তাঁর একটি ঐতিহাসিক উক্তিই যথেষ্ট। তিনি বুক ফুলিয়ে বলতেন,
"আমি যখনই দেখি আমার কোনো কাজে কলকাতার দাদাবাবুরা অখুশি হচ্ছেন, তখনই আমি নিশ্চিত হই যে আমি দেশের জন্য এবং আমার স্বজাতির জন্য সঠিক কাজটি করছি।"
এই একটি বাক্যই বলে দেয় তিনি কতটা স্পষ্টবাদী ছিলেন। ১৯৩৭ সালে বাংলার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি যখন ঋণ সালিশি বোর্ড গঠন করে মহাজনদের সুদের কারবার বন্ধ করলেন, তখন কলকাতার মহাজন মহলে হাহাকার পড়ে গিয়েছিল। তিনি কেবল আইন পাশ করেননি, তিনি মূলত কলকাতার সেই অর্থনৈতিক আধিপত্যবাদকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছিলেন, যা বছরের পর বছর মুসলমানদের শোষণ করে আসছিল। আজ আমরা যে শিক্ষিত মুসলিম সমাজ দেখি, তার কারিগর ফজলুল হক। ইডেন কলেজ, ইসলামিয়া কলেজ, লেডি ব্রাবোর্ন কলেজসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান গড়ার পাশাপাশি চাকরিতে মুসলমানদের জন্য কোটা প্রবর্তন ছিল তাঁর এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।
১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের মঞ্চে যখন তিনি গর্জে উঠেছিলেন, তখন তিনি মূলত এই ভূখণ্ডের মানুষের নিজস্ব রাষ্ট্র ও স্বাধিকারের বীজ বপন করেছিলেন। যদিও পরবর্তীতে রাজনীতির মানচিত্র বদলেছে, কিন্তু আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের যে স্বপ্ন, তার প্রথম আনুষ্ঠানিক রূপরেখা কিন্তু লাহোরের সেই মঞ্চে শেরে বাংলার কণ্ঠেই ঘোষিত হয়েছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির পর ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে তাঁর বিজয় প্রমাণ করেছিল যে, ক্ষমতার দম্ভের চেয়ে মানুষের ভালোবাসা অনেক বড়। শেরে বাংলা আমাদের শিখিয়ে গেছেন যে, সত্যিকার লিডারশিপ মানে প্রভাবশালী মহলের প্রশংসা পাওয়া নয়, বরং সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে প্রভাবশালীদের বিরাগভাজন হওয়ার সাহস রাখা। তিনি শিখিয়ে গেছেন নিজের কৃষ্টি ও শেকড়কে ধারণ করে কিভাবে প্রতিকূল শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়। বাংলার এই মহানায়কের প্রয়াণ দিবসে আমাদের তরুণদের শপথ হোক, শেরে বাংলার রেখে যাওয়া আপসহীন এবং শেকড়সন্ধানী রাজনীতিকে ধারণ করা। বিনম্র শ্রদ্ধা বাংলার মুসলিম রেনেসাঁর এই স্থপতির প্রতি।
আল্লাহর সৈনিক