02/11/2024
★জাহিলিয়্যাত★
ওয়াজের মাঠে মাঠভরা জনসমাগম দেখে গুণীজন উদ্বেলিত হয়ে ওঠে, এই বুঝি ইসলাম কায়েম হয়ে গেলো, এই বুঝি মদিনার সোনালী যুগ ফিরে এলো।
কিন্তু আপনি লক্ষ্য করে দেখবেন যে, স্টেডিয়ামেও কিন্তু মানুষ কম হয় না। হাজার হাজার মানুষের সমাগম সেখানেও পরিলক্ষিত হয়।
আপনার ওয়াজের মাঠে বিনা টিকিট আর অর্থ ব্যয় ছাড়া ওয়াজ শুনলেও তারা অর্থ ব্যয় করে গিয়ে খেলা দেখে। যদি মাঠের ধারণক্ষমতা লক্ষাধিক হতো এবং টিকিটবিহীন খেলা দেখার সুযোগ মিলতো, তাহলে আমার ধারণা আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলোতে একটা চেয়ারও ফাঁকা থাকতো না।
আপনার ওয়াজে ভাল করে বসতে না পারলে শ্রোতারা মাহফিল কমিটির লোকদের দফারফা করে। অথচ টিএসসির মোড়ে খেলা দেখার জন্য তারা আসনবিহীন কদমদ্বয়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকতেও রাজি।
আজ বাসায় আসার পথে অটো রিক্সা চালক ফোন দিয়ে তার কোন এক বন্ধুকে বলছিলো, টিএসসিতে যাবি? সেখানে বড় পর্দায় খেলা দেখানো হবে। যাইলে জানাইস। আমি যাচ্ছি।
অটোর পেছনে বসা দুই মুরব্বী সৌদি আর্জেন্টিনা ম্যাচের চুল-ছেঁড়া বিশ্লেষণ করছে। খুব আবেগ এবং উচ্ছ্বাস নিয়ে এই বলে অভিব্যক্তি ব্যক্ত করছে "যা কিছু হোক একটি মুসলিম রাষ্ট্র বিজয় অর্জন করেছে সেটাই অনেক।"
সৌদি মুসলিম রাষ্ট্র হয়ে জেতার কারণে তার কাছে অনেকটা এমন মনে হয়েছে, এ যেনো ইসলামেরই জয়। কাতার বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ক্ষতি বোধহয় এটাই যে, এবারের আসরকে ইসলামাইজেশন করা হয়েছে। মানুষ খেলাধুলাকে ইসলামের সাথে মিশিয়ে হালাল এন্টারটেইনমেন্ট করে ফেলেছে।
বার্ধক্য তাদের অঙ্গে মিশে গেলেও খেলাধুলার বিনোদন তাদেরকে বৃদ্ধ বানাতে পারেনি।
বাইতুল মুকাররম মার্কেটে গিয়েছিলাম ছোট একটা কাজে। হঠাৎ গুলিস্তানের রাস্তায় বড়সড় জটলা। ভাবলাম কোন অঘটন ঘটেছে। কৌতূহল নিয়ে দেখতে গেলাম। গিয়ে দেখি সেখানে কম মূল্যে নির্দিষ্ট দুটি দলের জার্সি বিক্রি হচ্ছে, তাই মানুষের উপচে পড়া ভীড় জমেছে। ফুটপাতের প্রতিটি দোকান জার্সিতে ছেয়ে গিয়েছে।
পথে ছোট্ট শিশু। নির্দিষ্ট একটা দলের জার্সি গায়ে দৌড়াচ্ছে। দেখে বুঝতে পারলাম, পিতা তার সন্তানকে স্বীয় আদর্শে বড় করছে তুলছে। বড় হয়ে ছেলেও যেনো বাবার পছন্দের টিমের একজন একনিষ্ঠ ভক্ত হয়। সে যেনো দিকভ্রান্ত হয়ে পিতার প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে যায়। শুধু হৃদয়ের গহীন থেকে চাপা কন্ঠে বেরিয়ে এলো আহহা!
আমরা ঢাকার যে প্রান্তে (পুরান ঢাকা) থাকি সেখানে শব্দদূষণ, লাউডস্পিকার, অনর্থক হৈ-হুল্লোড়, খেলাধুলায় মত্ত থাকা; তুলনামূলক অন্যসব এলাকা থেকে একটু বেশি। এখানে কোন বিষয়ে কেউ কারো অমঙ্গল বা অসুবিধার বিষয়টি বিবেচনা করে না। কোন সময় সাকরাইনের(ঘুড়ি দিবস) রাতে পুরান ঢাকায় রাত কাটালে সেটা অনুধাবন করতে পারবেন। তো রাতে হঠাৎ চিল্লাপাল্লার আওয়াজে উঠে বসে থাকতে হয়েছে। খেলাকে কেন্দ্র করে তাদের এমন গগনবিদারক চিল্লাপাল্লা অনেকের ঘুমকেই হয়তো কেঁড়ে নিয়েছে। রাত তখন প্রায় দুইটা, অর্থাৎ মানুষের ঘুমের একেবারে স্পেশাল মুহূর্ত, ঠিক সে সময়ে আশপাশ থেকে যেভাবে উচ্ছ্বাস আর জাগরণ ভেসে আসছিলো, তাতে বোঝার উপায় ছিলো না "এই শহরে সন্ধ্যা নেমেছে।"
রাত জেগে এই অনর্থক এবং গুনাহের কাজে সময় খরচ করতে পারলেও ফজরের নামাজে তাদের কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না। ঘন্টার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসিন হল সংলগ্ন খেলার মাঠে দাঁড়িয়ে খেলা দেখার কসরত বহন করতে পারলেও দশ মিনিট সময় খরচ করে "হাইয়া আলাস সালাহ" এর ডাকে সাড়া দিতে পারে না। বড় পর্দার খেলা দেখার জন্য লাখো মানুষের ভীড় দৃষ্টিগোচর হলেও মাঠের পাশের মসজিদটিই দুই কাতার মুসল্লী পাচ্ছে না। রিক্সা চালক টিএসসিতে খেলা দেখতে যাওয়ার দাওয়াত দিতে পারলেও ফজরের নামাজে "আসসালাতু খইরুম মিনান নাউম" বলে কাউকে ডাকতে দেখা যায় না। টিভির সামনে অসংখ্য দর্শকের উপস্থিতি দেখা গেলেও ফজরের ইমাম "ইকতাদাইতু বিহাজাল ইমাম" বলার মতো বিশজন মুসল্লী খুঁজে পাচ্ছে না।
আফসোস! এমন রাষ্ট্রে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা অতো সহজ হবে না। মানুষের এই জাহিলিয়্যাতই আপনাকে টেনে ধরবে। ইসলামের বিধিবিধান তাদের কাছে অপ্রাকৃতিক মনে হবে।
তবু স্বপ্ন দেখি, ইন শা আল্লাহ তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে এই জাহিলিয়্যাত বিলুপ্ত হবে, আঁধার কেটে ঊষা উদ্ভাসিত হবে, মেঘের কোলে রোদ উঠবে, অমাবস্যার বুকে পূর্ণিমা হাসবে, ইসলামের আলোয় সকল অপসংস্কৃতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসিন হল সংলগ্ন খেলার মাঠে হাজারো দর্শক)
বিডিনিউজ ২৪ থেকে ছবি সংগৃহীত