17/08/2026
https://www.facebook.com/share/p/1HHgZJ1AB5/
বখতিয়ার মেম্বারের ৫১ লাখ টাকা লুট করে ওসি প্রদীপ ও মর্জিনা
অভিযানের সময় ৫ টাকার পয়সাও নিয়ে গেছেন উখিয়ার থানার অফিসার ইনচার্জ ওসি মর্জিনা আকতার। পাশাপাশি ওসি প্রদীপের সঙ্গে মিলে মা, বোন ও আমাকে নির্যাতন করেছেন অমানুষিকভাবে। তারা ১৮ লাখ টাকার নেয়ার কথা বলে নিয়ে গেছে ৫১ লাখ টাকার বেশি। ওই দুই ওসি এই ন্যাক্কারজনক অভিযানে আমার নির্দোষ শ্বশুরকে যেমন নিয়ে গেছে, একই সঙ্গে নিয়ে গেছে আমাদের সহায় সম্বলও।
উপরের কথাগুলো বলেছেন কক্সবাজারের উখিয়া কুতুপালং এলাকার ইউপি সদস্য কথিত বন্দুকযুদ্ধে সম্প্রতি সময়ে নিহত বখতিয়ার মেম্বারের পুত্রবধূ রোমানা শারমিন।
তিনি জানান, পাশাপাশি পরিবারের সব পুরুষ সদস্যদের মামলা দিয়ে করেছে এলাকা ছাড়াও। যে কারণে প্রতিনিয়ত চরম নিরাপত্তাহীনতায় চলছে তাদের পরিবার পরিজনের জীবনযাত্রা।
স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা নিহতের মাত্র সাত দিন আগে (২৩ জুলাই) আরেকটি ভয়াবহ কথিত বন্দুযুদ্ধের ঘটনা ঘটায় তৎকালীন টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও উখিয়া থানার ওসি মর্জিনা আকতার। ওই দুই থানার ওসির যৌথ নেতৃত্বে ওই দিন ভোর রাতে উখিয়ার রাজাপালংয়ের ইউপি মেম্বার বখতিয়ারকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ।
বখতিয়ার মেম্বারের স্ত্রী শাহিন আকতার বলেন, “পুলিশের দাবি ছিল গাড়িতে একজন আসামি আছে তাকে শনাক্ত করতে হবে। তাই বাড়ির বাইরে আসতে হবে। কিন্তু দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই রাক্ষসী বাঘের মত থাবা দিয়ে নিয়ে যায় মেম্বারকে। পরে অনেক খোঁজাখুজির করে খবর পাওয়া যায়নি। একই দিন সন্ধ্যায় পুনরায় ওসি প্রদীপ ও ওসি মর্জিনা নেতৃত্বে ৪০/৫০ জনের পুলিশের একটি দল অভিযান চালায় আবারো বাসায়। ওসি প্রদীপ ওই সময় বলেন, ‘বখতিয়ার মেম্বার বলেছে আলমারিতে ১৮ লাখ টাকা আছে। ওই টাকা বের করে দাও’। যখন পুলিশের কথামত টাকা বের করা না হয় তখন আমাকে (শাহীন আক্তার) হ্যান্ডকাপ পড়িয়ে রেখে পরিবারের সকল মেয়েদের ওপর চলে অমানুষিক অত্যাচার। শেষমেষ ১৮ লাখ টাকা দিতে রাজি হই আমি। পরে টাকা বের করতে না করতে আলমারির সকল ড্রয়ার ও ঘরের সমস্ত্র লকারে চলে ব্যাপক ভাংচুর। একপর্যায়ে নিয়ে যায় ৫১ লাখ টাকারও বেশি। এই সময় উখিয়া থানার ওসি মর্জিনা আকতার নিজেই শপিং ব্যাগে করে নিয়ে যায় ভাংতি পয়সাও।
পর দিন মঙ্গলবার (২৪ জুলাই) রাত ১২টার দিকে খবর ছড়িয়ে পড়ে টেকনাফের হ্নিলায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ দু’জন মারা গেছে। রাত আড়াইটার দিকে টেকনাফ ভয়েস নামের একটি ফেসবুক পেজে এমন খবরও আসে। সেখানে যোগাযোগ করে জানতে পারি বখতিয়ার মেম্বার ও মোহাম্মদ তাহের নামের দুজনের মৃত্যু হয়েছে ‘বন্দুকযুদ্ধে’। ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে আসে তাদের লাশ।
এর আগে ২৩ তারিখ রাতেই একটি মাদক মামলা দায়ের করা হয় টেকনাফ থানায়। আসামি করা হয় ১৫ জনকে। তারপর অস্ত্র মামলাসহ আরও একটি মামলা হয়। যাতে আসামি করা হয় আমার তিন ছেলেকে। মামলার সিজার লিস্টে উদ্ধার দেখানো হয় ১০ লাখ টাকা।
বখতিয়ার মেম্বারের ছেলে হেলাল উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, আবার বাবার বিরুদ্ধে টেকনাফ বা উখিয়া থানায় কোন মামলা বা জিডিও ছিল না। কিন্তু সম্পূর্ণ অর্থের লোভে পড়ে উখিয়া থানার ওসি মর্জিনা আর টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ টাকা জন্য আবার পিতাকে খুন করেছে। ধরার আগের দিন আর কথিত বন্দুকযুদ্ধের পরের দিন পরপর তিনটি মামলা করেছে ওসি প্রদীপ। তিনটিতে আসামি করা হয়েছে আমরা তিন ভাইকে। নগদ ৫১ লাখের বেশি টাকাসহ জমির দলিল নিয়ে গেলেও মামলায় জব্দ দেখানো হয়েছে শুধু ১০ লাখ টাকা। ফেরত দেয়নি দলিলও। বর্তমানে আমার পরিবার অসহায়। আমরা সঠিক তদন্তপূর্বক বিচার ও টাকা এবং জমির দলিল ফেরত চাই।
বখতিয়ার মেম্বারের স্ত্রী শাহীন আক্তার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আরো বলেন, “বাসায় এসে পুলিশ বলে ‘টেনশন করবেন না। একজন আসামিকে চিহ্নিত করতে তাকে নিয়ে যাচ্ছি’। আমার স্বামীর বিরুদ্ধে মাদকের কোন মামলা ছিল না। বাসায় প্রবেশ থেকে শুরু করে বেরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত সময়টি ছিলো ৫ থেকে সাত মিনিট। যা সিসিটিভি ক্যামেরায় রেকর্ড রয়েছে। পরে সন্ধ্যায় এসে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে নগদ ৫১ লাখের বেশি টাকাসহ জমির দলিল নিয়ে যায় এবং সিসিটিভি ক্যামেরা ভাংচুর করে ডিভাইসসহ সব কিছু লুটপাট করে নিয়ে যায়।”
বখতিয়ার মেম্বারের পুত্রবধূ রোমানা বলেন, আমি ওসি প্রদীপকে বলেছিলাম মহিলা পুলিশ কই? পুরুষরা কেন আমার শাশুড়িকে অত্যাচার করতেছে। তিনি হজ করে এসেছেন। এই কথার বলার পরই ওসি প্রদীপ আমাকে (রোমানা)এমন একটা চড় মারেন জীবনে আমি এরকম মার খাইনি কারো কাছ থেকে।
রোমানা আরো বলেন, ওসি প্রদীপ দাশ যেমন টাকা নিছে তেমনি মর্জিনা ভাংতি পয়সাসহ নিয়েছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মর্জিনা আক্তারের কাছে জানতে চাইলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘আমার এলাকা বলে আমাকে পুলিশ নিয়ে থাকতে হয়েছে। ওটা টেকনাফ থানার ব্যাপার। ওরা ভাল বলতে পারবে। টাকা নিতে দেখছি। তবে আমি নেইনি। টাকার ব্যাগ দেখেছি ওখানে কত ছিল আমি জানি না।’
উখিয়া থানার ওসি মর্জিনাসহ ৪ পুলিশের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন মামলা
এবার কক্সবাজারের উখিয়া থানার ওসি মর্জিনা আকতারসহ চার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন মামলা করা হয়েছে। মঙ্গলবার কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩ এ মামলাটি দায়ের করেন মহেশখালীর রিয়াদ সোলতানা নুরী (২২) নামের এক তরুণী।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন, কনস্টেবল মো. সুমন, পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) নুরুল ইসলাম ও এএসআই মো. শামীম।
মামলার বাদী মহেশখালী উপজেলার কালারমারছরার ৬নং ওয়ার্ডের নয়াপাড়ার বাসিন্দা নুরুচ্ছবির মেয়ে। তিনি কক্সবাজারের একটি বেসরকারি কলেজের শিক্ষার্থী।
মামলাটি পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। নারী নির্যাতন আইনের ৯ (১) সহ মামলায় ৩২৩/৩২৪/৩৪২/৩৭৯/৫০৬ দণ্ডবিধি মতে অভিযোগ আনা হয়েছে।
নারী ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট একরামুল হুদা তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, কনস্টেবল মো. সুমনের (বর্তমানে রাঙ্গামাটি পুলিশ সুপার কার্যালয়ে কর্মরত) সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে প্রেমের সম্পর্ক রিয়াদ সোলতানা নুরীর। এ সুবাদে বিয়ের কাবিনের কথা বলে গত ৭ জুলাই বেলা দুইটার দিকে খুনিয়াপালং চেকপোস্ট সংলগ্ন তার কক্ষে নিয়ে যায়। কাজি আসার অপেক্ষার অজুহাতে কক্ষে বসিয়ে রাখে। পরে ধর্ষণ করে।
এরপর চেকপোস্টের পার্শ্ববর্তী একটি দোকানে বসিয়ে রেখে জরুরি কাজের বাহানা দিয়ে পালিয়ে যায়। অবশেষে রাত ১১টার দিকে বিষয়টি অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে ফোনে জানান ভিকটিম রিয়াদ সোলতানা নুরী।
আরো উল্লেখ করা হয়, উখিয়া থানায় গেলে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেন ওসি মর্জিনা আকতার। এরপর অভিযুক্ত অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় তাকে কক্ষে আটকিয়ে রেখে ব্যাপক মারধর ও নির্যাতন চালানো হয়।
এমনকি পায়ে রশি ও পরনের হিজাব দিয়ে চোখ বেঁধে একটি কক্ষে ঢুকিয়ে রাখারও অভিযোগ আনেন ভিকটিম। মামলার আরজির সঙ্গে নির্যাতনের কিছু ছবিও যোগ করেন তিনি।
নারী ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট একরামুল হুদা বলেন, বাদীর অভিযোগ আমলে নিয়ে মামলাটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কক্সবাজারের পুলিশ সুপারকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে উখিয়া থানার ওসি মর্জিনা আকতারের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ না করায় বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তবে, ৭ জুলাইয়ের ঘটনাটি প্রকাশের পর গণমাধ্যমকে তিনি বলেছিলেন, নুরীকে তার থানায় নির্যাতন করার তথ্যটি সঠিক নয়।
মামলায় অভিযুক্ত হওয়ার পর স্টেশনে থেকে দায়িত্বপালন করা যায় কি না বা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কি ধরণের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এমন প্রশ্নে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইকবাল হোসাইন বলেন, মামলার কাগজপত্র হাতে পেলে আইনের বিধি মতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, ৩১ জুলাই রাতে টেকনাফের মারিশবুনিয়া পাহাড়ে ভিডিওচিত্র ধারণ করে মেরিন ড্রাইভ দিয়ে কক্সবাজারের হিমছড়ি এলাকার নীলিমা রিসোর্টে ফেরার পথে শামলাপুর তল্লাশি চৌকিতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ
এ ঘটনায় টেকনাফ থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপসহ ৯ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা হয়। সেই মামলায় আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) তিন সদস্যকেও যুক্ত করা হয়েছে। তারা সকলে কক্সবাজার জেলা কারাগারে রয়েছেন।
এটি দেখেই বিভিন্ন থানায় পুলিশ কর্তৃক নানাভাবে ভুক্তভোগীরা পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করতে উদ্যোগী হচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় নির্যাতিতা তরুণী নুরীও পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।
আরো বিস্তারিত জানতে, কমেন্ট বক্স ফলো করুন