09/08/2026
চট্টগ্রামের ঘরেঘরে সেদিন কান্নার রোল পড়েছিলো,যেদিন খবর এলো মহিউদ্দিন চৌধুরী আর নেই! চট্টগ্রামের ইতিহাসে এযাবৎকালের তুমুল জনপ্রিয় মেয়র, একইসাথে স্বচ্ছ রাজনীতিবিদ এবিএম মহিউদ্দীন চৌধুরী। পুরো নাম আবুল বাশার মোহাম্মদ মহিউদ্দিন চৌধুরী। তিনি এমন একজন যাকে নির্দিষ্ট কোনো দলের ট্যাগ দিয়ে আপনি তার গ্রহণযোগ্যতা দমাতে পারবেন না!
ছোট্টো একটা ঘটনা বললে আরও ভালোভাবে বোঝা যাবে সাধারণের জন্য তাঁর দরদ কতোখানি গভীর ছিলো! ১৯৯৪ সালে তিনি প্রথমবারের মতো নির্বাচিত মেয়র হন। তিনি যখন চট্টগ্রাম শহরের মেয়র তখন ভূমিকম্পে শহরের একটি দালানের নিচে ৬-৭ জন চ্যাপ্টা হয়ে মারা যায়। তখন ডোমরা পর্যন্ত দুর্গন্ধের কারণে এগুলোর কাছে যেতে চাইছিল না। মহিউদ্দিন চৌধুরী অবলীলায় সেই লা/শগুলো তুলে আনেন ও তাদের দা/ফনের ব্যবস্থা করেন। আ/ন্দো/লন সংগ্রামেও মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি লড়াই করেছেন। এজন্য মানুষের আস্থা অর্জন করেছিলেন!
শুধুমাত্র মুখের বুলি নয়, একজন জনসেবকের পরিচয় হয় কাজে। মহিউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন এমনি একজন। তিনি আওয়ামীলীগের ত্যাগী নেতা ছিলেন ঠিকই, তবে রাজত্ব করেছেন চট্টগ্রামসহ পুরোদেশের মানুষের মনে। সাধারণ মানুষের জন্য করা কোনো কাজ যদি তার দলেরও বিপক্ষে যায়, তবুও তিনি পরোয়া করেননি। আপোস করেন নি নিজের আদর্শের সাথে!
এ বি এম মহিউদ্দীন চৌধুরীর জন্ম ১৯৪৪ সালের ১ ডিসেম্বর। চট্টগ্রামের রাউজানে। সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে। তাঁর বাবা হুসাইন আহমদ চৌধুরী খান ছিলেন একজন রেল কর্মকর্তা। মায়ের নাম ছিলো বেদুরা বেগম। মহিউদ্দিন চৌধুরী তাঁর আট ভাইবোনের মধ্যে মেঝো ছিলেন!
এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী ১৯৬২ সালে এসএসসি, ১৯৬৫ সালে চট্টগ্রাম সিটি কলেজ হতে এইচএসসি এবং ১৯৬৭ সালে ডিগ্রি পাস করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোওর ডিগ্রি লাভ করেন এবং পরে আইন কলেজে ভর্তি হলেও ছাত্র আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ায় লেখাপড়া শেষ করতে পারেননি। ১৯৬৯ সালে চট্টগ্রাম নগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭১-এ গঠন করেন ‘জয় বাংলা’ বাহিনী। সেই সময় গ্রেফতার হন পাকিস্তানি সে/নাদের হাতে। পরে পাগলের অভিনয় করে কা/রাগার থেকে ছাড়া পেয়ে পালিয়ে যান ভারতে। সেখানে উত্তর প্রদেশের তান্ডুয়া সামরিক ক্যাম্পে প্রশিক্ষণরত মুক্তিযো/দ্ধাদের একটি স্কোয়াডের কমান্ডার নিযুক্ত হন মহিউদ্দিন। এরপর শ্রমিক রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি। তারপর চট্টগ্রাম নগর যুবলীগের কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নি/হত হলে প্রতিশোধ নিতে মৌলভী সৈয়দের নেতৃত্বে ‘মুজিব বাহিনী’ গঠন করেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। ওই সময় ‘চট্টগ্রাম ষড়যন্ত্র মামলা’র আসামি করা হলে তিনি পালিয়ে কলকাতায় চলে যান। ১৯৭৮ সালে দেশে ফেরেন বলে আত্মজীবনীমূলক বইয়ে উল্লেখ রয়েছে!
এ বি এম মহিউদ্দীন চৌধুরীর প্রথম স্ত্রী ছিলেন শাহেদা আক্তার। যাকে তিনি ১৯৮২ সালে বিয়ে করেন। কিন্তু ১৯ অক্টোবর ১৯৮৬ সালে বো**মা দু/র্ঘটনায় নিজ বাড়িতে শাহেদা মা/রা যান। মহিউদ্দীন - শাহেদা দম্পতীর একমাত্র ছেলে মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। তারপর ১৯৮৭ সালে মহিউদ্দিন চৌধুরীর সাথে বিয়ে হয় হাসিনা মহিউদ্দিনের। মহিউদ্দীন - হাসিনা দম্পতীর একমাত্র ছেলে বোরহানুল হাসান চৌধুরী।
১৯৯৪ সালে প্রথমবারের মতো এ বি এম মহিউদ্দীন চৌধুরী চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। এরপর ২০০৫ সালের মেয়র নির্বাচনে তিনি ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের একজন মন্ত্রীকে পরাজিত করে তৃতীয়বারের মতো চট্টগ্রামের মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হন। এককথায় বলতে গেলে ১৯৯৪ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত একটানা ১৬ বছর চট্টগ্রামের মেয়র ছিলেন তিনি!
এ বি এম মহিউদ্দীন চৌধুরী ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭ সালে মা/রা যান। কিন্তু কথায় আছে, -কীর্তিমানের মৃ/ত্যু নেই! চট্টগ্রামের আপামর জনতার নয়নমনি হয়ে উঠা এই কিংবদন্তি নেতার নাম আজও চট্টগ্রাম শহরের মানুষের মুখেমুখে ফেরে! সত্যি বলতে তার মতো সাধারণ মানুষের কথা ভাবা মেয়র দ্বিতীয় আর কেউ হতে পারে নি!