26/06/2025
"চুপচাপ দিনের গল্প"
আজকের দিনটা অন্যসব দিনের চেয়ে একটু আলাদা। সকাল থেকেই পুটির চাচ্চু অনেকটা চুপচাপ, মন খারাপ করে বসে আছেন বাড়ির পেছনের বড় আমগাছটার নিচে। গ্রামের চারপাশে পাখির কিচিরমিচির শব্দ, বাতাসে আমপাতার নরম দোল, কিন্তু চাচ্চুর মুখে কোনো হাসি নেই আজ।
পুটি আজও বুঝতে পারছিল না কেন চাচ্চু এমন। সে তো সবসময় পুটির সাথে হাসে, খেলা করে, গল্প বলে। কিন্তু আজ? আজ চাচ্চু একদমই অন্যরকম।
মায়ের কাছে জানতে চেয়েছিল পুটি, "চাচ্চু মন খারাপ করে কেনো আজ?"
মা নিচু গলায় বলেছিলেন, "আজকের দিনেই ১৪ বছর আগে তোমার দাদি মারা গেছিলেন পুটি। তখন তুমিও ছিলে না, ছোট্ট বাবু। চাচ্চু তখন খুব ছোট ছিল। সেই দাদির কথা মনে পড়লেই চাচ্চুর মন খারাপ হয়ে যায়।"
পুটি ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় চাচ্চুর দিকে। গাছের নিচে বসে থাকা চাচ্চুর কাঁধে মাথা রেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে সে। কিছু না বলেও সবকিছু যেনো বুঝে নেয় পুটি।
চাচ্চুর চোখে তখন কিছু পুরোনো স্মৃতির ছবি। সেই দাদি, যিনি নিজে না খেয়ে অন্যকে খেতে দিতেন। এমন একটি মানুষের কাছে শোনা যায় না মানুষটি খারাপ ছিলো। তিনি ছিলেন আতীথিয়েতায় সেরা। যিনি তার ছেলেদের বলতেন,
"নিজে কষ্ট করবি, তবু কারো ক্ষতি করবি না।"আত্নীয়দের সাথে সব সময় যোগাযোগ রাখবি,কউকে কষ্ট দিবি না, বিপদে পারলে কেউকে সাহায্যে করবি। অন্যের বিপদে সব সময় এগিয়ে যাবি।
পুটি দাদির মুখ কখনো দেখেনি। কিন্তু যত গল্প শুনেছে, তাতে মনে হয় — দাদি ছিলেন একদম তার চাচ্চুর মতোই। সোজাসাপ্টা, নরম মনের মানুষ। মানুষের দুঃখে কষ্টে কাছে থাকতেন। আর চাচ্চুও ঠিক সেরকম — হয়তো একটু চুপচাপ, কিন্তু ভেতরটা একদম দাদির মতোই মায়াময়। দাদি মারা যাওয়ার পরে চাচ্চু চুপচাপ হয়ে গেছে। মানুষের সাথে মিশতে তার সময় লাগে।
১৪ বছর চাচ্চু মা বলে ডাকতে পারে না, তার মনের ভিতর অনেক কষ্ট। তাই চাচ্চু পুটিকে, পুটিমা বলে ডাকে।
পুটির বাবা আজ বাড়িতে নেই, তিনিও আজকের দিনে খুব মন খারাপ করে থাকেন। পুটির মনে হলো, হয়তো সবাই চুপচাপ থাকে কারণ দাদির শূন্যতাটা এখনো পূর্ণ হয়নি।
পুটির চাচ্চুর এক বান্ধবী প্রতিবছর এই দিনে একখানা কোরআন খতম করে দেন দাদির জন্য। সেই মেয়েটিও দাদির মতো মানুষকে শ্রদ্ধা করতেন খুব, কারণ তিনি নিজেও দাদির মমতার গল্প জানতেন।
আজ পুটি নামাজে বসে তার ছোট্ট হাতে দুয়া করে—
"আল্লাহ, আমার দাদিকে জান্নাত দিও। আমার দাদিকে তুমি কোনো কষ্ট দিও না আল্লাহ। আর আমাকেও দাদির মতো একজন ভালো মানুষ বানাও।"
চাচ্চু তখন পুটিকে কোলে তুলে নেয়। পুটি দেখতে পায়, চাচ্চুর চোখে পানি চিকচিক করছে, কিন্তু ঠোঁটে একটুকরো হাসি। যেনো দাদির ছায়াটা পুটির মাঝেই খুঁজে পান তিনি।
চুপচাপ দিনে, গাছের নিচে বসে থাকা সেই দুই প্রাণ — পুটি আর তার চাচ্চু — যেনো দাদির ভালোবাসার নিঃশব্দ প্রতিচ্ছবি।
---