28/10/2024
জামেয়ার দাওয়াত ও তাবলীগ;
একটি কারগুযারী
মাওলানা আল আমীন
দাওয়াত ও তাবলীগ আল্লাহ তাআলার এক মহান নির্দেশ। ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ এক বিধান, সমস্ত আম্বিয়া আ. এর জীবনব্যাপী সুন্নত, এবং আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রেখে যাওয়া মীরাসের অন্যতম।
পবিত্র কুরআন মাজিদে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন-
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ
তোমরাই সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত। মানবজাতীর কল্যাণের জন্য তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎ কাজের আদেশ করবে, অসৎ কাজ হতে নিষেধ করবে। এবং আল্লাহ পাকের উপর ঈমান আনয়ণ করবে। - সূরা আলে ইমরান: ১১০।
উক্ত আয়াতে আল্লাহ পাক দাওয়াতের কাজকে মুমিন নর-নারীর স্বতন্ত্র গুণ এবং উম্মাতে মুহাম্মাদীর দায়িত্ব ও বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এভাবে আল কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে এবং রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদীসে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজের প্রতি ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে।
দ্বীন সম্পর্কে গাফেল মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করার এবং ইসলামের আহকামসমূহ অন্যের নিকট পৌঁছানোই হলো দাওয়াত ও তাবলীগ।
"দাওয়াত তাবলীগের কর্মপন্থা ও পদ্ধতি"
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাবের পর থেকে আজ অবধি দেশে দেশে, পৃথিবীব্যাপী দাওয়াত ও তাবলীগের এই মেহনত বিভিন্নভাবে বিভিন্ন পন্থায় চালু রয়েছে।
সেই ধারাবাহিকতায় হযরতজি শাহ ইলিয়াস কান্ধলবী রহ. এর মাধ্যমে দাওয়াতের একটি নতুন ধারা শুরু হয় হিন্দুস্তানের মেওয়াত থেকে। আল্লাহ তাআলার এই খাস বান্দা মেওয়াতের অনাবাদি জমীনে নবীওয়ালা ফিকির আর দরদ নিয়ে মানুষকে আল্লাহ তাআলার দিকে দাওয়াত দিতে লাগলেন, "মাখলুক থেকে কিছুই হয় না, যা কিছু হয় একমাত্র আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই হয় । দুনিয়ার কোন মত আর পথে কামিয়াবি নেই একমাত্র হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লামের তরিকাতেই শাস্তি আর কামিয়াবি।
হযরতের দরদ ও ইশকে ভরা আপাত-সরল এই বাক্য-ক'খানা অসংখ্য-অগুনিত, পথভ্রান্ত, দিশেহারা মানুষকে হেদায়াতের পথে এনেছেন। তারা খুঁজে পেয়েছে হারানো পথের সন্ধান, ফিরে পেয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি সম্পদ- ঈমান। এবং সেই সাথে তাদের অন্তরে তৈরী হয়েছে উম্মতের প্রতি দরদ ও মাওলা পাকের ইশকের প্রজ্জলন। সেই আগুন বুকে নিয়ে মাথায় গাট্টি আর হাতে তাসবীহ নিয়ে এই সকল দাঈগণ দেশ-দেশান্তরে ঘুরে চলছেন অবিরাম, মানুষের সামনে আল্লাহর পরিচয় ও তাওহীদের বাণী তুলে ধরছেন- "আল্লাহ আমাদের খালেক, আল্লাহ আমাদের মালিক, আল্লাহ আমাদের রাযযাক; তিনি ছাড়া আর কোন সৃষ্টিকর্তা নেই, আর কোন মালিক নেই, আর কোন রিযিকদাতা নেই।
"দাওয়াত-তাবলীগের মেহনতের প্রতি উলামায়ে কেরামের সুনজর ও তদারকি"
আলহামদুলিল্লাহ! দাওয়াত ও তাবলীগের এই মুবারক কাজের সাথে পৃথিবীব্যাপী ব্যক্তি পর্যায় থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত একেকজন একেকভাবে জড়িয়ে রয়েছে, এবং জড়িয়ে থাকাকে নিজের জন্য সাআদাতমন্দি বা সৌভাগ্য মনে করছে।
বিশেষ করে কাজের প্রারম্ভ থেকেই উলামায়ে দেওবন্দ এই মেহনতকে দিল থেকে গ্রহণ করেছেন, এবং পরোক্ষ- প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থেকেছেন, সাধারণ মানুষদের জড়িত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন, এবং আপাদমস্তক নিরীক্ষণ ও তদারকি করেছেন। উলামায়ে কেরামের সার্বিক এ তদারকি ও মেহনতের বরকতে বদৌলতে স আল্লাহ পাক এই কাজকে উম্মতের জন্য ফলপ্রসু বানিয়েছেন। আলহামদুলিল্লাহ।
জামেয়ার দাওয়াত-তাবলীগ
বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি মাদরাসাতেই দাওয়াত ও তাবলীগের কার্যক্রম প্রত্যক্ষভাবে চলমান। আল্লাহ তাআলার অশেষ মেহেরবানিতে আমাদের প্রাণপ্রিয় প্রতিষ্ঠান জামেয়া রশীদিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক হযরত ওয়ালা মুফতী শহীদুল্লাহ সাহেব দামাত বারাকাতুহুম অত্র প্রতিষ্ঠানে তালীম-তারবিয়াতের পাশাপাশি 'দাওয়াত-তাবলীগের এই মেহনতকে বিশেষ নযরে রেখেছেন। এবং এই মেহনতকে ফলপ্রসু করবার জন্যে যাবতীয় সব ব্যবস্থাপনাও করেছেন।
ছাত্ররা পুরো বছর তালীম-তারবিয়াত নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও বন্ধকালীন ছাত্রদের সবাইকে দাওয়াতের কাজের সাথে যুক্ত থাকার ব্যাপারে তারগীব দেয়া হয়। যাতে ছাত্ররা দ্বীনের এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটিও শিখে নিতে পারে এবং ছাত্রদের মাঝে দাওয়াতের মেযাজ তৈরী হয়, অন্তরে যেন উম্মতের দরদ ও ব্যাথা তৈরী হয়। এছাড়াও পুরো বছরজুড়ে মাদ্রাসার অভ্যন্তরে সল্প পরিসরে ছাত্রদের মাঝে দাওয়াতী কাজের মেহনত চালু থাকে,এ-জন্য মাদ্রাসার পক্ষ হতে নির্ধারিত কয়েকজন আসাতিযায়ে কেরাম রয়েছেন যারা নিয়মিত ছাত্রভাইদের পড়ালেখার পাশাপাশি অবসর সময়গুলোতে দাওয়াতের মেহনতের তদারকি করে থাকেন।
"কারগুযারী"
আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ তাআলার মেহেরবানিতে বিগত বছরসমূহের ন্যায় ২০২৩ সনের রমজানুল মুবারকেও জামেয়া রশীদিয়ার ছাত্রভাইরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আল্লাহর রাস্তায় যাওয়ার জন্য নাম লিখিয়েছে এবং কর্তৃপক্ষের অনুমতিসাপেক্ষে প্রায় এক হাজার ছাত্র দাওয়াতের খুরুজে বেরিয়েছে। সর্বমোট ৩২ টি চিল্লার জামাত, দুইটি বিশ দিনের জামাত ও একটি সাত দিনের জামাতে তাদের তারতীব দেওয়া হয়েছে। বেশকিছু জামাতে মাদরাসার উস্তাদবৃন্দও ছিলেন। এ সকল জামাতকে দেশের ২৮টি জেলায় রোখ দেওয়া হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ, ( ছাত্রভাই ও আসাতিযাদের মেহনতের বদৌলতে সর্বমোট ৯২৯ টি জামাতের শেকেলে প্রায় ১১০৬৬ এগার হাজার ছেষট্টি) জন বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার দ্বীনিভাই নগদ আল্লাহর রাস্তায় বের হয়েছেন। ছাত্রদের মেহনতের ফলাফল দেখে জেলা ও কেন্দ্রীয় উলামায়ে কেরাম ও তাবলীগী মুরুব্বিগণ অত্যন্ত খুশি হয়েছেন এবং ছাত্র ভাইদের জন্য দোয়া করেছেন।
■ আল্লাহ তাআলা সকলের মেহনতকে কবুল করুন, সকলের জন্য নাজাতের উসীলা বানান। এবং আমাদের সবাইকে আমৃত্যু দাওয়াত-তাবলীগের মেহনতের সাথে লেগে থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন।
দ্বি-মাসিক আর রশীদ (যিলহজ-মুহাররম ১৪৪৫-৪৬ হি.জুন-জুলাই ২০২৪ ঈ.)