14/07/2026
বরিশালের এক ছোট শহরে থাকত নীলা। বয়স মাত্র ২৪। বিয়ের দুই বছর হয়েছে। স্বামী রাশেদ ঢাকায় একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করত। কাজের চাপে মাসে একবারের বেশি বাড়ি আসতে পারত না।
নীলার দিন কাটত প্রায় একাই। শ্বশুর-শাশুড়ি গ্রামের বাড়িতে থাকতেন। শহরের ভাড়া বাসায় সে একাই থাকত।
এক বর্ষার রাতে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল।
বাইরে ঝড়, বৃষ্টি আর বজ্রপাত।
ঘড়িতে রাত ২টা ৭ মিনিট।
হঠাৎ নীলার ফোন বেজে উঠল।
অচেনা নাম্বার।
এত রাতে কে ফোন করবে?
নীলা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কল রিসিভ করল।
— “হ্যালো?”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড কোনো শব্দ নেই।
তারপর খুব আস্তে একটা মেয়ের কণ্ঠ শোনা গেল।
— “আপনি কি নীলা?”
নীলার বুক ধক করে উঠল।
— “জি... কে বলছেন?”
মেয়েটা কাঁপা গলায় বলল,
— “আপনি আমাকে চিনবেন না। কিন্তু আপনার স্বামী রাশেদকে চিনি।”
নীলা কিছুক্ষণ চুপ।
— “কেন? কী হয়েছে?”
ওপাশে আবার নীরবতা।
তারপর মেয়েটা বলল,
— “আপনার স্বামী যে অফিসে কাজ করে, আমি সেখানেই কাজ করতাম।”
“করতাম” শব্দটা শুনে নীলার কেমন যেন লাগল।
— “করতাম মানে?”
— “আমি এখন আর বেঁচে নেই...”
কথাটা শুনে নীলা হেসে ফেলল।
— “এগুলো কী ধরনের মজা?”
কিন্তু মেয়েটা কোনো হাসি দিল না।
বরং বলল,
— “আগামী শুক্রবার আপনার স্বামী বাড়ি আসবে না। সে বলবে অফিস ট্যুরে যাচ্ছে। কিন্তু সেটা মিথ্যা হবে।”
নীলার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
— “আপনি এসব জানলেন কীভাবে?”
মেয়েটা বলল,
— “কারণ আমি মারা যাওয়ার আগে সব জেনেছিলাম।”
এরপর কল কেটে গেল।
নীলা কয়েকবার কল ব্যাক করল।
ফোন বন্ধ।
সারারাত তার আর ঘুম হলো না।
সকালে উঠে সে নিজেকে বোঝাল, কেউ হয়তো বাজে মজা করেছে।
কিন্তু শুক্রবার আসতেই ঘটনা অদ্ভুত হয়ে গেল।
রাশেদ ফোন করে বলল,
— “একটা অফিস ট্যুর পড়েছে। এই সপ্তাহে আসতে পারব না।”
নীলার হাত থেকে ফোন প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
একদম সেই কথাই তো মেয়েটা বলেছিল!
নীলা কিছু না বলে ফোন রেখে দিল।
সেদিন রাতেই আবার সেই নাম্বার থেকে কল এল।
— “এখনও কি বিশ্বাস হয়নি?”
নীলার গলা শুকিয়ে গেল।
— “তুমি কে?”
— “আমার নাম ছিল মেহরিন।”
— “ছিল মানে?”
— “আমি ছয় মাস আগে মারা গেছি।”
নীলা ভয় পেয়ে কল কেটে দিল।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর একটা ছবি আসল হোয়াটসঅ্যাপে।
ছবিতে দেখা গেল রাশেদ একটা রেস্টুরেন্টে বসে আছে।
তার সামনে একজন নারী।
ছবির কোণে তারিখ লেখা—আজকের।
নীলার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।
সে সঙ্গে সঙ্গে রাশেদকে ভিডিও কল দিল।
রাশেদ ধরল না।
আবার দিল।
আবার না।
এক ঘণ্টা পর রাশেদ কল ব্যাক করল।
পেছনে হোটেল রুমের মতো কিছু দেখা যাচ্ছিল।
— “মিটিংয়ে ছিলাম।”
নীলা ছবির কথা বলল না।
শুধু চুপচাপ শুনল।
সেদিন রাত ৩টার দিকে আবার কল।
মেহরিন।
— “ওই মহিলাকে দেখেছ?”
— “হ্যাঁ।”
— “সে রাশেদের প্রেমিকা না।”
— “তাহলে?”
ওপাশ থেকে আস্তে উত্তর এল।
— “সে-ও এখন মৃত।”
নীলার বুকের ভেতর যেন বরফ জমে গেল।
— “কী বলছ তুমি?”
— “তোমার স্বামী যে সত্যটা লুকিয়ে রেখেছে, সেটা জানলে তুমি আর কখনও একা ঘুমাতে পারবে না।”
নীলা কাঁপতে কাঁপতে বলল,
— “কোন সত্য?”
মেহরিন কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
— “ছয় মাস আগে ঢাকার একটি হোটেলে একজন মেয়ের মৃত্যু হয়েছিল। পুলিশ সেটাকে আত্মহত্যা বলেছিল।”
— “তারপর?”
— “আমি সেই মেয়ে।”
নীলা কথা হারিয়ে ফেলল।
মেহরিন আবার বলল,
— “আর তোমার স্বামী সেই রাতের শেষ মানুষ, যে আমাকে জীবিত দেখেছিল...”
বজ্রপাতের শব্দে পুরো ঘর কেঁপে উঠল।
ঠিক তখনই নীলার বাসার দরজায় টক... টক... টক...
কেউ কড়া নাড়ছে।
রাত ৩টা ১২ মিনিটে।
নীলা ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগোল।
দরজার ছিদ্র দিয়ে বাইরে তাকাল।
কিন্তু বাইরে কেউ নেই।
একদম কেউ না।
তবু কড়া নাড়ার শব্দ থামছে না।
টক...
টক...
টক...
আর তখনই তার ফোনে একটা নতুন মেসেজ এল।
মেহরিন লিখেছে—
“দরজা খুলো না। কারণ বাইরে যে দাঁড়িয়ে আছে... সে মানুষ নয়।”
(চলবে — পার্ট ২)