09/08/2026
সকাল ৬টা।
অ্যালার্ম বাজার আগেই মিতুর ঘুম ভেঙে যায়।
ঘুম থেকে উঠে প্রথমে রান্নাঘর। তারপর নাস্তা, স্বামীর অফিসের টিফিন, শ্বশুরের ওষুধ, শাশুড়ির চা, সন্তানের স্কুলের প্রস্তুতি—সবকিছু একা হাতে সামলায়।
এদিকে তার স্বামী আরিফ তখনও ঘুমাচ্ছে।
মিতু কখনও অভিযোগ করে না।
কারণ সে ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছে—
"মেয়েদের সংসার করতে হলে অনেক কিছু সহ্য করতে হয়।"
সকাল ৮টায় আরিফ অফিসে যাওয়ার আগে শুধু একটা কথাই বলল,
— "শার্টটা ঠিকমতো ইস্ত্রি করো না কেন?"
মিতু কিছু বলল না।
সে জানে, সে যদি বলে যে রাত ২টা পর্যন্ত বাচ্চার জ্বর নিয়ে জেগেছিল, তাহলে উত্তর আসবে—
— "এসব তো সব মায়েরাই করে।"..
দিন কেটে যায়।
একদিন মিতুর প্রচণ্ড জ্বর।
১০২ ডিগ্রি।
তবুও সে রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ভাত রান্না করছে।
শাশুড়ি পাশ দিয়ে যেতে যেতে বললেন,
— "জ্বর হয়েছে তো কী হয়েছে? সংসার কি থেমে থাকবে?"
মিতুর চোখ ভিজে উঠল।
সেদিন রাতে আরিফ বাসায় ফিরল।
সে শুধু জিজ্ঞেস করল,
— "খাবার হয়েছে?"
একবারও জিজ্ঞেস করল না—
"তুমি কেমন আছো?"..
পরের সপ্তাহে আরিফের অফিসে একজন নতুন সহকর্মী যোগ দিল।
নাম—সারা।
সারা সবসময় হাসিখুশি।
অফিসে সবাইকে সম্মান করে।
একদিন দুপুরে সারা বলল,
— "ভাইয়া, আপনার স্ত্রী নিশ্চয়ই অনেক ভাগ্যবতী।"
আরিফ হেসে বলল,
— "কেন?"
সারা বলল,
— "আপনি তো খুব দায়িত্বশীল মানুষ মনে হয়।"
কথাটা শুনে আরিফ একটু চুপ হয়ে গেল।
সে ভাবল...
সে কি সত্যিই দায়িত্বশীল?
টাকা রোজগার করলেই কি দায়িত্ব শেষ?..
সেদিন রাতে বাসায় ফিরে সে দেখল—
মিতু সোফায় বসে ঘুমিয়ে পড়েছে।
হাতে সুঁই-সুতা।
ছেলের ছেঁড়া স্কুল ড্রেস সেলাই করতে করতেই ঘুমিয়ে গেছে।
তার হাতের আঙুলে ছোট্ট একটা কাটা দাগ।
আরিফ অনেকদিন পর প্রথমবার স্ত্রীর দিকে মন দিয়ে তাকাল।
তার চোখের নিচে কালো দাগ।
মুখ শুকিয়ে গেছে।
চুলগুলো এলোমেলো।
সে মনে করার চেষ্টা করল...
শেষ কবে সে মিতুকে বলেছিল—
"তুমি অনেক কষ্ট করো।"
মনে করতে পারল না।..
পরদিন সকালে অফিসে যাওয়ার সময় আরিফ দেখল, তার মানিব্যাগে একটা ছোট্ট কাগজ।
সম্ভবত ভুল করে মিতু রেখে দিয়েছে।
তাতে লেখা—
"এই মাসে নিজের জন্য একটা শাড়ি কিনব ভেবেছিলাম। কিন্তু ছেলের স্কুলের বেতন আর শ্বশুরের ওষুধ কিনতে গিয়ে আর হলো না। সমস্যা নেই। হয়তো আগামী মাসে কিনব।"
কাগজটা পড়ে আরিফের বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।
সে বুঝতে শুরু করল—
একটা সংসার শুধু টাকা দিয়ে চলে না।
কেউ একজন নীরবে নিজের ইচ্ছেগুলো প্রতিদিন একটু একটু করে মেরে ফেলে বলেই সংসারটা টিকে থাকে।
আর সেই মানুষটার খবর অনেক সময় কেউই রাখে না...
(চলবে — পার্ট ২)