10/08/2026
**আইন কি শুধু করার জন্য, নাকি বাস্তবে মানার জন্য?**
আমাদের দেশে কোনো আইন বা বিধিমালা প্রণয়ন করার সময় সেই আইনটি **বাস্তবে কতটা বাস্তবসম্মত এবং সাধারণ নাগরিকের পক্ষে কতটা পালন করা সম্ভব**—এই বিষয়টি কি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়?
অনেক সময় এমন কিছু আইন ও বিধিমালা করা হয়, যা বাস্তবে পালন করতে গিয়ে একজন সাধারণ নাগরিককে **ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও আইন অমান্য করার পরিস্থিতিতে** পড়তে হয়।
এর একটি উদাহরণ হতে পারে **পৌরসভা এলাকায় ভবন নির্মাণের বিধিমালা।**
পৌরসভায় একটি ভবন নির্মাণের সময় স্বাভাবিকভাবেই চারপাশে কিছু জায়গা ছেড়ে ভবন নির্মাণ করতে হয়। কিন্তু ভবনের উচ্চতা যত বাড়বে, প্রয়োজনীয় সেটব্যাকের পরিমাণও তত বাড়তে থাকে।
**পৌরসভা নির্মাণ বিধিমালা, ১৯৯৬-এর ১২(১) ধারায় বলা হয়েছে:**
> **“ইমারতের সর্বাধিক উচ্চতা সম্মুখবর্তী রাস্তার প্রশস্ততা এবং রাস্তার মধ্যবর্তী উন্মুক্ত স্থানের যোগফলের দ্বিগুণের অধিক হবে না।”**
এখন ধরা যাক, আপনি একটি **৭ তলা ভবন** নির্মাণের অনুমতি নিতে চাচ্ছেন। আপনার সম্মুখবর্তী রাস্তার প্রস্থ ধরা হলো **২০ ফুট**—যদিও অনেক পৌরসভায় ২০ ফুট প্রস্থের রাস্তা পাওয়াই কঠিন।
আপনার ভবনের উচ্চতা যদি আনুমানিক **৭২ ফুট** হয় (প্যারাফেট ওয়াল, সিঁড়ি রুম, লিফট মেশিন রুম ইত্যাদির উচ্চতা বাদ দিয়ে), তাহলে উক্ত বিধিমালা অনুযায়ী আপনাকে সম্মুখের রাস্তার পাশ থেকে **প্রায় ১৬/১৭ ফুট জায়গা ছেড়ে দিতে হবে।**
এখন আপনার জমির রাস্তা-সংলগ্ন বাহুর দৈর্ঘ্য যদি **৫০ ফুট** হয়, তাহলে শুধু সম্মুখের অংশেই প্রায় **৮০০ বর্গফুট জায়গা** ছেড়ে দিতে হবে।
অর্থাৎ প্রায় **১.৮৪ শতাংশ জমি** শুধু সামনের অংশেই ব্যবহার না করে ছেড়ে দিতে হবে।
এখন যদি কোনো পৌরসভা এলাকায় প্রতি শতাংশ জমির মূল্য **১০ লাখ টাকা** ধরা হয়, তাহলে শুধু সামনের অংশের জমির মূল্যই দাঁড়ায় প্রায়—
**১.৮৪ × ১০ লাখ = ১৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা!**
এরপর দুই পাশ ও পেছনের প্রয়োজনীয় সেটব্যাক হিসাব করলে মোট **৩০ লাখ টাকারও বেশি মূল্যের জায়গা** ব্যবহার না করেই ছেড়ে দিতে হতে পারে।
জমির মূল্য যদি প্রতি শতাংশ ১৫ লাখ, ২০ লাখ বা তারও বেশি হয়, তাহলে এই আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেড়ে যাবে।
আর আপনার সম্মুখবর্তী রাস্তার প্রস্থ যদি ২০ ফুটের চেয়েও কম হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে এবং প্রয়োজনীয় জায়গা ছাড়ার পরিমাণও বাড়তে পারে।
**এখন প্রশ্ন হলো—এই আইন বা বিধিমালা বাস্তবে একজন সাধারণ নাগরিকের পক্ষে কতটা মানা সম্ভব?**
একজন নাগরিক তার জীবনের সঞ্চয় দিয়ে একটি ছোট জায়গা কিনলেন। সেখানে পরিবারের জন্য অথবা ব্যবসার উদ্দেশ্যে একটি ভবন নির্মাণ করতে চাইলেন। কিন্তু বিধিমালা মেনে চলতে গিয়ে যদি জমির একটি বড় অংশ কার্যত ব্যবহার করাই সম্ভব না হয়, তাহলে সেই নাগরিকের জন্য ভবন নির্মাণ কতটা বাস্তবসম্মত থাকে?
আইন অবশ্যই প্রয়োজন।
নিরাপদ ও পরিকল্পিত নগরায়নের জন্য নির্মাণ বিধিমালাও অবশ্যই প্রয়োজন।
কিন্তু **আইন এমন হওয়া উচিত, যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং নাগরিকের পক্ষে পালন করা সম্ভব।**
কারণ এমন আইন বা বিধিমালা করা উচিত নয়, যার কারণে একজন সাধারণ নাগরিক শেষ পর্যন্ত **আইন মেনে চলার পরিবর্তে আইন ভঙ্গ করতে বাধ্য হওয়ার পরিস্থিতিতে পড়ে।**
আমাদের প্রয়োজন—
✅ নিরাপদ ও পরিকল্পিত নগরায়ন
✅ নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
✅ রাস্তা ও পরিবেশের সুরক্ষা
✅ ভবনের মান ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা
✅ একই সঙ্গে জমির সর্বোচ্চ যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা
**আইন শুধু কঠোর হলেই ভালো আইন হয় না।**
একটি ভালো আইন হলো সেই আইন, যা **যুক্তিসঙ্গত, বাস্তবসম্মত, প্রয়োগযোগ্য এবং নাগরিকবান্ধব।**
আমাদের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন—
**যে আইন বাস্তবে অধিকাংশ নাগরিকের পক্ষে পালন করা কঠিন, সেই আইন প্রণয়নের আগে কি এর বাস্তব প্রয়োগ, জমির মূল্য, নাগরিকের আর্থিক সক্ষমতা এবং আমাদের দেশের বিদ্যমান বাস্তবতা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়েছে?**
আইনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নাগরিককে আইন মানতে উৎসাহিত করা—
**এমন পরিস্থিতি তৈরি করা নয়, যেখানে নাগরিক বাধ্য হয়ে আইন অমান্য করে।**
**আইন হতে হবে বাস্তবসম্মত।
আইন হতে হবে প্রয়োগযোগ্য।
আইন হতে হবে নাগরিকবান্ধব।**
#আইন #পৌরসভা #নির্মাণবিধিমালা #নগরায়ন #জনস্বার্থ #নাগরিকঅধিকার #বাস্তবসম্মতআইন #নির্মাণ