04/01/2026
।। অনেকেই প্রচার করছেন যে বৈদিক শাস্ত্রে নাকি সধবা নারীর একাদশী ব্রত পালনে নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়েছে।
চলুন জেনে আসি, শাস্ত্রীয় প্রমাণসহ 🙏🙏🙏
এটা শুধুই আজকালকার ঘটনা নয়। বাঙালিদের মাঝে এই কুসংস্কার দীর্ঘ সময় ধরে লালিত হয়ে আসছে, যা পুরনো সময়ের (কিছু কিছু ক্ষেত্রে বর্তমানেও) চলচ্চিত্র ও টিভি সিরিয়ালগুলোতেও আমরা প্রতিফলিত হতে দেখেছি। দীনবন্ধু মিত্রের 'সধবার একাদশী' প্রহসনের শিরোনামও এইদিকেই নির্দেশ করে যে আমাদের সমাজে তখনকার সময়ে এবং বর্তমান যুগেও অনেকেই এটা বিশ্বাস করে যে একাদশী ব্রত বিধবা নারীদের জীবনচর্চার একটি অংশ, যা সধবা নারীরা পালন করে না। কিন্তু এটি কোন শাস্ত্রসিদ্ধান্ত নয়।
🌷বরং শাস্ত্রে বহুস্থানে সধবা নারীকে তার পতিসহ একাদশী ব্রত পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
♦️ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়বিশাং শূদ্রণাঞ্চৈব যোষিতাম্।
মোক্ষদং কূর্ব্বতাং ভক্ত্যা বিষ্ণো:প্রিয়তরং দ্বিজাঃ।।
~ [ বৃহন্নারদীয় পুরাণ, ২১।২ ]
🥀 বঙ্গানুবাদ: ব্রাহ্মণ,ক্ষত্রিয়, বৈশ্য,শুদ্র এবং বিবাহিত স্ত্রীলোক – ইহাদিগের মধ্যে যে কোন ব্যক্তি হউক, ভক্তি পূর্ব্বক একাদশী ব্রত পালন করে মুক্তি লাভ করতে পারে।
♦️পতিসহিতা যা যোষিৎ করোতি হরিবাসরম্ ।
সুপুত্ৰা স্বামিসুভগা যাতি প্রেত্য হরের্গৃহম॥ ৭৬
যো যচ্ছতি হরেরগ্রে প্রদীপং ভক্তিভাবতঃ।
হরের্দিনে দ্বিজশ্রেষ্ঠ পুণ্যসঙ্গ্যা ন বিদ্যতে ॥৭৭
যাঙ্গনা ভর্ত্তৃসহিতা কুরুতে জাগরং হরেঃ।
হরের্নিকেতনে তিষ্ঠেচ্চিরং পত্যা সহ দ্বিজ ॥৭৮
~ [ পদ্মপুরাণ, স্বর্গখন্ড, ৪৪।৭৬-৭৮ ]
🥀 বঙ্গানুবাদ: যে স্ত্রী পতি সহ একাদশীব্রত করে, সে সুপুত্রা স্বামি-সুভাগা হয়, মরণান্তে হরিগৃহ বৈকুন্ঠে যায়। দ্বিজ শ্রেষ্ঠ! একাদশীতে ভক্তিভাবে যে জন হরির অগ্রে প্রদীপ দান করে, তাহার পুণ্যের সংখ্যা নাই অর্থাৎ অগণিত পুণ্য লাভ করে । আর যে স্ত্রী স্বামীর সহিত একাদশীতে রাত্রি জাগরণ করে, সে চিত্রকাল পতি সহ হরির নিকেতনে বাস করে।
♦️ যা নারী স্বামীসহিতা কুর্য্যাচ্চ হরিবাসরম।
সুপুত্রা ভর্ত্তসুভগা ভবেৎ সা প্রতিজন্মানি।।
~ [ পদ্মপুরাণ, ব্রহ্মখন্ড, ৫।১৯ ]
🥀 বঙ্গানুবাদ: যে নারী স্বামীর সাথে একাদশীব্রত করে, সে জন্মে জন্মে সপুত্রা ও স্বামীসুভগা হয়।
♦️যা নারী ভর্ত্তৃসহিতা করোত্যেকাদশীব্রতম্।
সুপ্ৰজা স্বামিসুভগা সা ভবেৎ প্রতিজন্মনি।
স্বামিনা সহ যা নারী কুরুতে জাগরং হরেঃ।
সা তিষ্ঠেদ্বিষ্ণুভবনে চিরং ভর্ত্রা সহ দ্বিজ ।।
~ [ পদ্মপুরাণ, ক্রিয়াযোগসারঃ ২২।১০৫ ]
🥀বঙ্গানুবাদ: যে নারী স্বামীর সাথে একাদশীব্রত করে, সে জন্মে জন্মে সুপুত্রা ও স্বামীসুভগা হয়। আর যে নারী স্বামীর সঙ্গে জাগরানুষ্ঠান করে, সে স্বামীর সাথে সুচিরকাল বৈকুন্ঠধামে অবস্থান করে।
♦️দুর্ভাগা যা করোত্যেনাং সা স্ত্রী সৌভাগ্যমাপ্নুয়াৎ।
লোকানাঞ্চৈব সর্ব্বোষাং ভুক্তিমুক্তিপ্রদায়িনী।।
~ [ পদ্মপুরাণ, উত্তরখন্ড, ৪৮।৪ ]
🥀বঙ্গানুবাদ: কোন দুর্ভাগা স্ত্রী যদি একাদশী ব্রত আচরণ করেন, তিনি সৌভাগ্য লাভ করেন। এই একাদশী ব্রত সর্বলোকের ভুক্তিমুক্তিপ্রদায়িনী, সর্ব্বপাপহারিণী ও গর্ভবাসনিবারিণী।
♦️ সপুত্রশ্চ সভাৰ্য্যশ্চ স্বজনৈৰ্ভক্তিসংযুতঃ।
একাদশ্যামুপবসেৎ পক্ষয়োরভয়োরপি ॥
~ [ বিষ্ণুধর্মোত্তর, হরিভক্তিবিলাস, ১২।৪৭ ]
🥀বঙ্গানুবাদ: পুত্র, ভার্যা (পত্নী) ও স্বজনবর্গের সহিত ভক্তিযুক্ত হয়ে উভয়পক্ষের একাদশীতে উপবাস কর্তব্য।
♦️ আরিরাধয়িষুঃ কৃষ্ণং মহিষ্যা তুল্যশীলয়া ।
যুক্তঃ সংবৎসরং বীরো দধার দ্বাদশীব্রতম্ ॥
~ [ শ্রীমদ্ভাগবতম্ ৯।৪।২৯ ]
🥀বঙ্গানুবাদ: ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আরাধনা করার জন্য অম্বরীষ মহারাজ তারই মতো গুণবতী স্ত্রী সহ এক বৎসর কাল যাবৎ একাদশী এবং দ্বাদশীব্রত পালন করেছিলেন।
#দেবশর্ম্মার শিষ্য চন্দ্রের পত্নী গুণবতী আজীবন অর্থাৎ বিবাহের পূর্বে ও পরে সর্বদাই একাদশীব্রত ও কার্তিকমাস ব্রত করেছিলেন। যার পুণ্যপ্রভাবে তিনি মৃত্যুর পর বিষ্ণুলোকে গমন করেন এবং পরজন্মে সত্যভামা হয়ে কৃষ্ণপত্নী হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেন।
♦️ ব্রতদ্বয়ং তয়া সম্যগাজন্মমরণানৎ কৃতম।
একাদশীব্রতং সম্যক সেবনং কার্ত্তিককস্য চ।।
~ [ স্কন্দপুরাণ, বিষ্ণুখন্ড, কার্ত্তিকমাসমাহাত্ম্যম্, ১৩।১২ ]
🥀 বঙ্গানুবাদ: শ্রীকৃষ্ণ সত্যভামাকে বললেন, ‘চন্দ্রের পত্নী গুণবতী জন্ম হইতে মরণ পর্য্যন্ত একাদশী ব্রত ও কার্ত্তিক মাস ব্রত – এ দুই ব্রত সম্যকরূপে আচরণ করেছিলেন।
♦️শ্রীনারদ উবাচ।
ইতি রাধামুখাচ্ছুত্বা যজ্ঞসীতাশ্চ গোপিকাঃ।
একাদশীব্রত চক্রবিধিবৎ কৃষ্ণলালসাঃ।।২৩
একাদশীদিনেনাপি প্রসন্নঃ শ্রীহরিঃ স্বয়ম।
মার্গশীর্ষে পূর্ণিমায়াং রাসং তাতিশ্চকার হ।।২৪
~ [ গর্গসংহিতা, মাধুর্য্যখন্ড, ৯।২৩-২৪, নারদ উক্তি ]
🥀বঙ্গানুবাদ: নারদ বলিলেন,”যজ্ঞসীতা গোপীগণ রাধার মুখে একাদশী মাহাত্ম্য শুণে কৃষ্ণপ্রাপ্তির জন্য যথাবিধি একাদশী ব্রত করেন ; তাঁদের একাদশী ব্রত ফলে স্বয়ং গোপবালক হরি প্রসন্ন হয়ে অগ্রহায়ণ মাসের পূর্ণিমায় তাঁহাদের সহিত রাসনৃত্য করেছিলেন।”
#শ্রীকৃষ্ণ উবাচ।🙏🙏
শৃণু রাজন যথা বৃত্তং দৃষ্টং তৎকথয়ামি তে ।
মর্ত্যলােকে পুরা হাসীদব্ৰাহ্মণ্যেকা চ ভারত
ব্রতচৰ্য্যারুতা নিত্যং দেবপূজারতা সদা। ২৩
মাসোপবাসনিরতা মম ভক্তা চ সৰ্ব্বদা।
কৃষ্ণোপবাসসংযুক্তা মম পূজাপরায়ণ।। ২৪
~ [ পদ্মপুরাণ, উত্তরখন্ড, ৪২।২২-২৪ ]
🥀 বঙ্গানুবাদ: শ্রীকৃষ্ণ কহিলেন,–রাজন! শ্রবণ করুন, বৃত্তান্ত বলিতেছি- হে পার্থিব যুধিষ্ঠির! পুরাকালে মর্ত্যলোকে ব্রতচর্য্যানিরতা, নিত্য
দেবপূজা পরায়ণ এক ব্রাহ্মণী ছিলেন। তিনি আমার নিত্যভক্তা, মাসােপবাসে নিয়তা, কৃষ্ণপ্রীত্যৰ্থ উপবাস পরায়ণা এবং মদীয় পূজায় একান্ত অনুরক্তা।
♦️দেবীনামুপদেশেন ষটতিলায়া ব্রতং কৃতম্ ।
মানুষ্যা সত্যব্রতয়া ভুক্তিমুক্তিফলপ্রদম।
রূপকান্তিসমাযুক্তা ক্ষণেন সমবাপ সা॥ ৪৬
ধনং ধান্যঞ্চ বস্ত্রাদি সুবর্ণং রৌপ্যমেব চ।
ভবনং সর্বসম্পন্ং ষটতিলায়াঃ প্রভাবতঃ ॥৪৭
~ [ পদ্মপুরাণ, উত্তরখন্ড, ৪২।৪৫-৪৭ ]
🥀 বঙ্গানুবাদ: দেবপত্নীগণের উপদেশে তাপসী মানুষী ভুক্তিমুক্তিফলপ্ৰদ ষটতিলা একাদশী ব্ৰত সম্পাদন করিলেন। তাহাতে সেই তাপসী ক্ষণমধ্যে রূপলাবণ্যবতী হইয়া ধন, ধান্য, বস্ত্র, সুবর্ণ ও রৌপ্য প্রাপ্ত হইলেন। ষটতিলা একাদশী ব্রতের প্রভাবে তাপসীর ভবন সর্বসম্পন্ন হইল।
♦️ সাপ্যৈবং মঞ্জুঘোষা চ কৃত্বৈতদব্রতমুত্তমম্।
পিশাচত্বাদ্বিনির্ম্মুক্তা পাপমোচনিকাব্রতাৎ।
দিব্যরূপধরা সা বৈ গতা নাকে বরাপ্সরাঃ।।
~ [ পদ্মপুরাণ, উত্তরখন্ড, ৪৬।৪৬ ]
🥀বঙ্গানুবাদ: অপ্সরা মঞ্জুঘোষাও উক্ত উত্তম একাদশী ব্রত অনুষ্ঠান পালনে পিশাচত্ব হইতে মুক্ত হইল। পাপমোচনী একাদশী ব্রতের প্রভাবে সে দিব্যরূপ ধারনপূর্ব্বক স্বর্গে গমন করিলো।
♦️ব্রাহ্মণ্যৈ দেবপত্নীভিদত্তমেকাদশীব্রতম্।
তেন লেভে স্বৰ্গসৌখ্যং ধনধান্তঞ্চ মানুষী।।
~ [ গর্গসংহিতা, মাধুর্য্যখন্ড, ৯।৭, রাধা উক্তি ]
🥀বঙ্গানুবাদ: শ্রীমতি রাধিকা গোপীকাদের বললেন, “একদা দেবপত্নীগণ কোন এক ব্রাহ্মণীকে এই একাদশীব্রতের উপদেশ করেন, ঐ ব্রাহ্মণী মানুষী হয়েও এ একাদশী ব্রত পালন দ্বারা ধনধান্য ও স্বর্গসুখ লাভ করে ছিলেন।”
♦️একাদশ্যাং ভোজনাচ্চ নান্যৎ পাপতরং পরম্ । যানি কানি চ পাপানি ব্রহ্মহত্যাদিকানি চ । অন্নমাশ্রিত্য তান্যেষ তিষ্ঠন্তি হরিবাসরে | সর্ব্বে বর্ণাশ্রমা যাশ্চ স্ত্রিয়শ্চ একাদশীপরাঃ। প্রাপ্নবস্তি গতিং দিব্যামন্যথা পাপমাপুয়ুঃ ॥ সধবানান্তু নারীণাং রাত্রৌ পেয়ং জলং মতম্ ॥ একাদশ্যাং ন ভুঞ্জীত পক্ষয়োরুভয়োরপি | যনস্থ তিধর্ম্মোহয়ং শুদ্ধমেব সদা গৃহী ॥
~ [বৃহদ্ধর্মপুরাণ, উত্তরখণ্ড, ১০।৩৭]
🥀 বঙ্গানুবাদ: একাদশীতে ভোজন অপেক্ষা পাপকার্য আর নাই কারণ, ব্রহ্মহত্যা প্রভৃতি সমস্ত পাপ একাদশী দিনে অন্নাদি রবিশস্য আশ্রয় করিয়া থাকে। ব্রাহ্মণাদি চারি বর্ণ, ব্রহ্মচারী প্রভৃতি চারি আশ্রমী ও সকল স্ত্রীলোক একাদশী ব্রত পরায়ণ হইলে দিব্যগতি লাভ করে, একাদশী ব্রত না করিলে পাপভাগী হয়। সধবা নারীরা একাদশী উপবাস করিয়া রাত্রিকালে জলমাত্র পান করিবে। গৃহস্থ ব্যক্তি একাদশীতে উপবাস করিয়া দেবকীনন্দন কৃষ্ণকে ধূপ-দীপাদি দ্বারা পূজা করিবে।
সব ব্রতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ একাদশী ব্রত পালন করা সকলেরই অবশ্য কর্তব্য 🙏🙏
হরে কৃষ্ণ 🙏🙏🙏
@