10/05/2026
পর্ব ১ - ঘুম থেকে ওঠার সুন্নাত ও আমল
ঘুম থেকে ওঠার ধারাবাহিকতা বিবেচনায় এটিই সর্বপ্রথম সময়। এই সময়ের সুন্নাতগুলোকে প্রধানত { দুই ভাগে} ভাগ করা যায়।
নিচে প্রথম ভাগের আমলগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১ - প্রথম ভাগ: ঘুম থেকে জাগার পর নবীজী (সা.)-এর আমলসমূহ
১. মিসওয়াক করা:
প্রিয় নবীজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখনই ঘুম থেকে জাগতেন, তখনই মিসওয়াক করতেন। বিশেষ করে তাহাজ্জুদের জন্য উঠলে মিসওয়াক দ্বারা মুখ পরিষ্কার করতেন।
(দলীল: বুখারী ২৪৫, মুসলিম ২৫৫)
২. ঘুমানোর দোয়া
হুযাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
"নবীজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন রাতে বিছানায় যেতেন (ঘুমানোর জন্য), তখন তিনি নিজের হাত গালের নিচে রাখতেন এবং বলতেন:
بِاسْمِكَ اللَّهُمَّ أَمُوتُ وَأَحْيَا
(বিসমিকা আল্লাহুম্মা আমূতু ওয়া আহইয়া)
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনারই নামে আমি মৃত্যুবরণ করি এবং আপনারই অনুগ্রহে জীবিত হই।
আর যখন তিনি ঘুম থেকে জাগতেন, তখন বলতেন:
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَحْيَانَا بَعْدَ مَا أَمَاتَنَا وَإِلَيْهِ النُّشُورُ
(আলহামদুলিল্লাহিল্লাযী আহ ইয়ানা বা'দা মা আমাতানা ওয়া ইলাইহিন নুশুর)"
— (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৩২৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭১১)
৩. মুখমণ্ডল থেকে ঘুমের ভাব মুছে ফেলা
ঘুম থেকে ওঠার পর বসে হাত দিয়ে নিজের মুখমণ্ডল ও চোখ ঘষে ঘুমের আবেশ দূর করা।
ব্যাখ্যা: ‘মুখ থেকে ঘুম মোছা'র অর্থ হলো—হাত দিয়ে চোখ মোছা।
দলীল: ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, “নবীজী (সা.) ঘুম থেকে উঠলেন। এরপর বসে তিনি হাত দ্বারা মুখ থেকে ঘুমের ভাব মুছতে লাগলেন।” (বুখারী ১৮৩, মুসলিম ৭৬৩)
৪. আকাশের দিকে দৃষ্টিপাত করা
রাতের শেষ ভাগে জাগ্রত হয়ে আকাশের দিকে তাকানো।
দলীল: মুসলিম শরীফের বর্ণনায় এসেছে, “রাতের শেষ ভাগে নবীজী (সা.) জাগ্রত হলেন। অতঃপর তিনি বাইরে গিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে সূরা আলে ইমরানের আয়াত ( ৫ নম্বর পয়েন্টে) তিলাওয়াত করলেন।” (মুসলিম ২৫৬)
৫. সূরা আলে ইমরানের শেষ আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা
ঘুম থেকে জেগে সূরা আলে ইমরানের ১৯০ নম্বর আয়াত থেকে সূরার শেষ পর্যন্ত তিলাওয়াত করা।
আয়াতের শুরু: {إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ...} (নিশ্চয়ই আসমান ও যমীন সৃষ্টির ভেতরে, দিন ও রাতের বিবর্তনের মাঝে জ্ঞানীদের জন্য রয়েছে অসংখ্য নিদর্শন) — (সূরা আলে ইমরান: ১৯০)।
আমলী ব্যাখ্যা: মুসলিম শরীফের হাদীস অনুযায়ী, ১৯০ নম্বর আয়াত থেকে শুরু করে সূরার শেষ (২০০ নম্বর আয়াত) পর্যন্ত তিলাওয়াত করা সুন্নাত।
দলীল: (বুখারী ১৮৩, মুসলিম ৭৬৩)
ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণিত সেই ঐতিহাসিক ঘটনা (মূল হাদীস):
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, একবার তিনি তাঁর খালা প্রিয় নবীজীর (সা.) স্ত্রী মাইমুনার ঘরে রাত যাপন করলেন। রাতে তিনি বালিশের প্রস্থের দিকটাতে শুয়েছিলেন আর নবীজী ও তাঁর খালা শুয়েছিলেন লম্বাভাবে। এরপর রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘুমিয়ে গেলেন। যখন মধ্যরাত কিংবা সামান্য কম-বেশি হলো, নবীজী (সা.) ঘুম থেকে উঠলেন। এরপর তিনি বসে হাত দ্বারা মুখ থেকে ঘুমের ভাব মুছতে লাগলেন। অতঃপর সূরা আলে ইমরানের শেষ আয়াতগুলো তিলাওয়াত করলেন। এরপর তিনি একটি ঝুলন্ত মশকের কাছে গেলেন এবং সেটা দিয়ে সর্বোত্তমভাবে অজু করলেন। এরপর তিনি নামাজে (তাহাজ্জুদ) দাঁড়িয়ে গেলেন।
সূত্র: (সহীহ বুখারী: ১৮৩, সহীহ মুসলিম: ৭৬৩)
৬. দুই হাত কবজি পর্যন্ত তিনবার ধৌত করা:
পাত্রে হাত দেওয়ার আগে বা অজুর শুরুতে দুই হাত কবজি পর্যন্ত তিনবার ধুয়ে নেওয়া সুন্নাত। কারণ ঘুমের অবস্থায় হাত কোথায় ছিল তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না।
(দলীল: বুখারী ১৬২, মুসলিম ২৭৮)
৭. নাকে পানি দিয়ে তিনবার নাক ঝেড়ে পরিষ্কার করা:
ঘুম থেকে ওঠার পর অজুর সময় তিনবার নাকে পানি দিয়ে ভালোভাবে নাক ঝাড়তে হবে। কারণ ঘুমের সময় শয়তান নাকের ছিদ্রে রাত যাপন করে।
(দলীল: বুখারী ৩২৯৫, মুসলিম ২৩৮)
৮. অজু করা:
সালাত আদায়ের আগে সর্বোত্তমভাবে অজু করা। ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণিত হাদীসে এসেছে, নবীজী (সা.) ঘুম থেকে উঠে হাত-মুখ ধুয়ে তিলাওয়াত শেষে ঝুলন্ত মশক থেকে পানি নিয়ে অজু করেছেন।
(দলীল: বুখারী ১৮৩)
নোট: অজুর সুন্নাতগুলো আমাদের অধিকাংশেরই জানা। তবে এই ধাপগুলো ধারাবাহিকভাবে পালন করলে ঘুম থেকে ওঠার মুহূর্ত থেকেই দিনটি সুন্নাতী তরিকায় শুরু করা সম্ভব।
১. অজুর সময় মিসওয়াক করা:
কুলি করার আগে মিসওয়াক করা সুন্নাত। এটি অজুর সওয়াবকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
দলীল: নবীজী (সা.) বলেছেন, "যদি আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর না হতো, তবে আমি প্রত্যেক অজুর সময় তাদের মিসওয়াকের নির্দেশ দিতাম।" (মুসনাদে আহমদ ১৯২৮, হাকেম ১/২৪৫, বুখারী-মুয়াল্লাক)
সহায়ক দলীল: আয়েশা (রা.) বলেন, "নবীজী (সা.) ঘুম থেকে উঠে মিসওয়াক করতেন, এরপর অজু করতেন।" (মুসলিম ৭৫৬)
২. অজুর শুরুতে 'বিসমিল্লাহ' বলা:
অজু শুরু করার সময় আল্লাহর নাম নেওয়া সুন্নাত।
দলীল: "যে ব্যক্তি আল্লাহর নাম নিল না, তার (পূর্ণাঙ্গ) অজু হলো না।" (আবু দাউদ ১০১, ইবনে মাজাহ ৩৯৭)
৩. কবজি পর্যন্ত উভয় হাত তিনবার ধোয়া:
অজুর শুরুতে দুই হাত কবজি পর্যন্ত ধোয়া সুন্নাত।
দলীল: উসমান (রা.) নবীজী (সা.)-এর অজুর বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রথমে পাত্র থেকে পানি নিয়ে কবজি পর্যন্ত তিনবার ধুয়ে দেখিয়েছেন। (বুখারী ১৬৪, মুসলিম ২২৬)
৪. ডান দিক থেকে শুরু করা:
হাত ও পা ধোয়ার সময় আগে ডান হাত ও ডান পা ধোয়া।
দলীল: আয়েশা (রা.) বলেন, "নবীজী (সা.) অজুসহ সকল ভালো কাজে ডান দিক থেকে শুরু করা পছন্দ করতেন।" (বুখারী ১৬৮, মুসলিম ২৬৮)
৫. কুলি করা ও নাকে পানি দেওয়া:
এক আঁজলা পানি দিয়ে কুলি করা ও নাকে পানি দেওয়া সুন্নাত।
দলীল: আব্দুল্লাহ ইবনে যায়দ (রা.) বলেন, "নবীজী (সা.) এক আঁজলা পানি দিয়ে কুলি করতেন ও নাকে পানি দিতেন এবং এমন তিনবার করতেন।" (বুখারী ১৯২, মুসলিম ২৩৫)
৬. মাজমাজাহ ও ইসতিনশাক (গভীরভাবে কুলি ও নাক পরিষ্কার):
রোজাদার না হলে নাকে পানি দেওয়ার সময় গভীরে পানি পৌঁছানো সুন্নাত।
দলীল: "পূর্ণাঙ্গভাবে অজু করো... এবং রোজাদার না হলে ভালো করে নাকে পানি দাও।" (আবু দাউদ ১৪২, তিরমিযী ৭৮৮)
৭. সুন্নাত তরিকায় মাথা মাসাহ করা:
উভয় হাত মাথার সামনে থেকে শুরু করে পেছনে নিয়ে যাওয়া এবং আবার সামনে ফিরিয়ে আনা। (নারীদের জন্য পেছনের ঝুলন্ত চুল মাসাহ করা আবশ্যক নয়)।
দলীল: "তিনি মাথার অগ্রভাগ থেকে মাসাহ শুরু করে পেছনে নিয়ে গেলেন, আবার সেখান থেকে সামনে ফিরিয়ে আনলেন।" (বুখারী ১৮৫, মুসলিম ২৩৫)
৮. সকল অঙ্গ তিনবার ধোয়া (বৈচিত্র্যসহ):
অঙ্গগুলো একবার ধোয়া ওয়াজিব, তিনবার ধোয়া সুন্নাত। কখনো কখনো একবার বা দুবার ধোয়াও সুন্নাত দ্বারা প্রমাণিত।
দলীল: নবীজী (সা.) একবার করেও ধৌত করেছেন (বুখারী ১৫৭), আবার দুইবার করেও ধৌত করেছেন (বুখারী ১৫৮), তবে তিনবার ধোয়া তাঁর নিয়মিত সুন্নাত। (মুসলিম ২২৬)
৯. অজুর পরের দুআসমূহ:
প্রথম দুআ: জান্নাতের আটটি দরজা লাভের মাধ্যম
আরবি: أَشْهَدُ أَنَّ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ ، وَأَنَّ مُحَمَّداً عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ
উচ্চারণ: আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়া আন্না মুহাম্মাদান আব্দুল্লাহি ওয়া রাসূলুহু।
ফজিলত ও দলীল: উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের যে ব্যক্তি সুন্দরভাবে অজু করার পরে এই দুআ পড়বে, তার জন্য জান্নাতের ৮টি দরজা উন্মুক্ত হয়ে যাবে। যেই দরজা দিয়ে ইচ্ছা সে তাতে প্রবেশ করবে।’ (সহীহ মুসলিম ২৩৪)
দ্বিতীয় দুআ: আমলনামা আরশের নিচে সুরক্ষিত হওয়ার মাধ্যম
আরবি: سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ ، أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ ، أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ
উচ্চারণ: সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা, আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লা আনতা, আসতাগফিরুকা ওয়া আতূবু ইলাইকা।
ফজিলত ও দলীল: আবু সাঈদ (রা.) থেকে ‘মারফূ’ সূত্রে বর্ণিত আছে, ‘যে ব্যক্তি অজু শেষ করে এই দুআ পড়বে—এটি একটি কাগজে মুড়িয়ে আল্লাহ তাআলা তার ওপর সীল মেরে দিবেন। অতঃপর সেটা আরশের নিচে সুরক্ষিত করে রেখে দেয়া হবে। কিয়ামতের আগে সেটা খোলা হবে না।’
(নাসায়ী: ১৪৭, হাকেম ১/৭৫২; হাফেয ইবনে হাজার এটার সনদ সহীহ বলেছেন—দেখুন নাতায়িজুল আফকার ১/২৪৬। তিনি আরও বলেছেন, যদি এটি মারফূ নাও হয়, তথাপি এটি ‘মারফূ’ এর হুকুমেই পড়বে। কারণ এটি এমন একটি গায়েব বা অদৃশ্য সওয়াবের সংবাদ যেখানে যুক্তি বা অনুমান খাটে না; সাহাবী অবশ্যই এটি নবীজী থেকেই শুনেছেন)
:: পর্ব দুইয়ের জন্য অপেক্ষা করুন। পোস্টটি অবশ্যই শেয়ার করবেন।
#আলো