10/08/2026
মাত্র ১০ বছর বয়সে শুরু, এরপর বদলে গেল পুরো জীবন
মাত্র ১০ বছর বয়স। পৃথিবীকে জানার, খেলাধুলা করার আর স্বপ্ন দেখার বয়স। কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার ডেডে কোসওয়ারার জীবনে সেই বয়সেই ঘটে যায় এমন একটি ঘটনা, যা পরবর্তী কয়েক দশক ধরে তাঁর জীবনকে কঠিন সংগ্রামে পরিণত করে।
হাঁটুর কাছে ছোট্ট একটি ক্ষত হয়েছিল তাঁর। শুরুতে সেটিকে হয়তো সাধারণ একটি ক্ষত বলেই মনে হয়েছিল। তখন কেউই ধারণা করতে পারেনি, এই ছোট্ট সমস্যাই ধীরে ধীরে তাঁর শরীরে বিরল এক রোগের প্রকাশ ঘটাবে এবং একসময় তাঁর হাত-পা ও শরীরের বিভিন্ন অংশের ত্বকে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি তৈরি হবে।
বছরের পর বছর সেই ত্বকের বৃদ্ধি বাড়তে থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর হাত-পায়ের ত্বক দেখতে অনেকটা গাছের বাকলের মতো হয়ে যায়। এই অস্বাভাবিক চেহারার কারণে মানুষের মধ্যে তাঁকে নিয়ে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়। একপর্যায়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘Tree Man’ নামে।
তবে এই নামের আড়ালে ছিল একজন মানুষের দীর্ঘদিনের কষ্ট, চিকিৎসার সংগ্রাম এবং স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
বিরল জেনেটিক রোগ Epidermodysplasia Verruciformis
ডেডে কোসওয়ারার সমস্যাটি ছিল অত্যন্ত বিরল একটি জেনেটিক রোগ—Epidermodysplasia Verruciformis বা EV। এটি এমন একটি বিরল বংশগত ত্বকের সমস্যা, যেখানে নির্দিষ্ট ধরনের মানব প্যাপিলোমাভাইরাসের (HPV) সংক্রমণের প্রতি শরীর অস্বাভাবিকভাবে সংবেদনশীল হয়ে পড়ে।
ফলে ত্বকে বিভিন্ন ধরনের অস্বাভাবিক ক্ষত বা আঁচিলের মতো বৃদ্ধি দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো শরীরের বিভিন্ন অংশে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর ত্বকের সমস্যার কারণ হতে পারে।
ডেডের ক্ষেত্রে এই অস্বাভাবিক ত্বকের বৃদ্ধি তাঁর হাত, পা, মুখসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়েছিল। স্বাভাবিক কাজকর্মও তাঁর জন্য ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠেছিল।
একজন মানুষের শরীর যখন ধীরে ধীরে এমনভাবে পরিবর্তিত হতে থাকে, তখন শুধু শারীরিক কষ্টই নয়—মানসিক চাপও তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। ডেডেকেও মানুষের কৌতূহলী দৃষ্টি, প্রশ্ন এবং তাঁর শারীরিক অবস্থাকে ঘিরে নানা প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
‘Tree Man’ নামটি কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে?
ডেডের শরীরে ত্বকের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ছবি ও ভিডিও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি বিশ্বের মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘Tree Man’ হিসেবে।
তাঁর হাত-পায়ের ত্বকের অস্বাভাবিক গঠন দেখে অনেকেই বিস্মিত হতেন। কিন্তু ক্যামেরার সামনে দেখা সেই দৃশ্যের পেছনে যে একজন বাস্তব মানুষ ছিলেন, তাঁর প্রতিদিনের জীবন যে কতটা কঠিন ছিল—সেটি অনেক সময় মানুষের চোখে ধরা পড়ত না।
তিনি কোনো প্রদর্শনীর বস্তু ছিলেন না। তাঁর শরীরের পরিবর্তন ছিল একটি বিরল রোগের ফল, আর সেই রোগের সঙ্গে লড়াই করেই তাঁকে জীবন কাটাতে হয়েছে।
২০০৮ সালে বড় অস্ত্রোপচার
ডেডে কোসওয়ারার চিকিৎসাজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল ২০০৮ সালের অস্ত্রোপচার।
সে সময় চিকিৎসকেরা তাঁর শরীর থেকে বিপুল পরিমাণ আক্রান্ত টিস্যু অপসারণ করেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে প্রায় ৬ কেজি অস্বাভাবিক টিস্যু সরানো হয়েছিল।
অস্ত্রোপচারের পর তাঁর শারীরিক অবস্থায় কিছুটা উন্নতি দেখা যায়। তিনি কিছুটা স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগও পান। দীর্ঘদিনের কষ্টের পর এটি ছিল তাঁর জন্য বড় ধরনের স্বস্তির মুহূর্ত।
কিন্তু সমস্যাটি পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর শরীরে আবারও অস্বাভাবিক ত্বকের বৃদ্ধি দেখা দিতে থাকে। ফলে তাঁকে পুনরায় চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ একটি অস্ত্রোপচার তাঁর জীবনের সব সমস্যা স্থায়ীভাবে দূর করতে পারেনি।
বারবার চিকিৎসা, বারবার ফিরে আসা সমস্যা
ডেডের জীবনের সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলোর একটি ছিল এই পুনরাবৃত্তি।
একদিকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আক্রান্ত অংশ অপসারণ করা হচ্ছিল, অন্যদিকে সময়ের সঙ্গে আবারও নতুন বৃদ্ধি দেখা দিচ্ছিল। ফলে তাঁকে একাধিকবার চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
একজন মানুষের জন্য এমন পরিস্থিতি কতটা কঠিন হতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়।
শুধু শারীরিক অস্বস্তি নয়, স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করা, দৈনন্দিন কাজ করা এবং মানুষের সামনে নিজেকে স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপন করাও তাঁর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
তার ওপর ছিল মানুষের অবিরাম কৌতূহল।
অনেক মানুষ তাঁকে দেখতেন বিস্ময়ের চোখে। কেউ ছবি তুলতে চাইতেন, কেউ প্রশ্ন করতেন, আবার কেউ তাঁর শারীরিক অবস্থাকে অবাক করা কোনো ঘটনা হিসেবে দেখতেন। অথচ ডেডের কাছে এটি ছিল তাঁর প্রতিদিনের বাস্তবতা।
রোগের চেয়েও বড় ছিল মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি
ডেডে কোসওয়ারার গল্প শুধু একটি বিরল রোগের গল্প নয়। এটি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিরও একটি গল্প।
অস্বাভাবিক চেহারার মানুষকে সমাজ অনেক সময় কৌতূহলের বিষয় হিসেবে দেখে। কিন্তু একজন মানুষের বাহ্যিক চেহারার পেছনে থাকা অনুভূতি, ভয়, কষ্ট ও স্বপ্নের কথা আমরা অনেক সময় ভুলে যাই।
ডেডের ক্ষেত্রেও তাঁর শরীরের অস্বাভাবিক পরিবর্তনই মানুষের সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছিল। কিন্তু তিনি ছিলেন একজন বাবা, একজন মানুষ এবং নিজের মতো করে স্বাভাবিক জীবন কাটাতে চাওয়া একজন ব্যক্তি।
‘Tree Man’ নামটি তাঁকে বিশ্বের কাছে পরিচিত করেছিল, কিন্তু সেই পরিচয়ের পেছনে থাকা মানুষটির গল্প ছিল অনেক বেশি মানবিক।
শেষ জীবন
দীর্ঘদিনের চিকিৎসা, শারীরিক সমস্যা এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ডেডে জীবন চালিয়ে গেছেন।
তাঁর গল্প বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। তাঁর চিকিৎসা নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আগ্রহ তৈরি হয়। বিভিন্ন সময়ে তাঁর অবস্থার উন্নতি ও অবনতির খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত ২০১৬ সালে, মাত্র ৪৪ বছর বয়সে ডেডে কোসওয়ারা মারা যান।
তাঁর চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয় দীর্ঘ কয়েক দশকের এক কঠিন সংগ্রাম। তবে তাঁর গল্প এখনো মানুষের মনে জায়গা করে আছে।
ডেডের গল্প থেকে আমাদের শিক্ষা
ডেডে কোসওয়ারার জীবন আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—কোনো মানুষকে শুধু তাঁর চেহারা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়।
আমরা যখন কারও অস্বাভাবিক চেহারা দেখি, তখন হয়তো প্রথমে অবাক হই। কিন্তু সেই চেহারার পেছনে থাকা মানুষটির জীবন, কষ্ট এবং সংগ্রামের কথা মনে রাখা জরুরি।
ডেডে তাঁর শরীরের এমন একটি পরিবর্তনের সঙ্গে লড়াই করেছেন, যা তিনি নিজে বেছে নেননি। তাঁর জীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার এবং মানুষের কৌতূহলী দৃষ্টির মধ্যে।
তবুও তিনি বেঁচে ছিলেন। লড়াই করেছেন। স্বাভাবিক জীবনের আশায় চিকিৎসা নিয়েছেন। তাঁর এই সংগ্রামই তাঁকে স্মরণীয় করে রেখেছে।
‘Tree Man’ নামে পরিচিত ডেডে কোসওয়ারার শরীর হয়তো মানুষের কাছে একসময় বিস্ময়ের বিষয় হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তাঁর জীবনকে শুধু বিস্ময় হিসেবে দেখলে তাঁর গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি হারিয়ে যায়।
কারণ তাঁর শরীরের পরিবর্তন ছিল রোগের বাস্তবতা, কিন্তু সেই পরিবর্তনের মধ্যেও তাঁর অনুভূতি ছিল একজন সাধারণ মানুষের মতোই।
তাঁর গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষের শরীর কখনো কখনো আমাদের প্রত্যাশার মতো থাকে না। কিন্তু শরীরের চেহারা একজন মানুষের মূল্য নির্ধারণ করে না।
কাউকে দেখে হাসার আগে, অবাক হওয়ার আগে কিংবা বিচার করার আগে একবার ভাবা উচিত—হয়তো সেই মানুষটি এমন একটি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, যার কথা আমরা কিছুই জানি না।
ডেডে কোসওয়ারা আজ নেই। কিন্তু তাঁর জীবন আমাদের সামনে রেখে গেছে সহমর্মিতার একটি শক্তিশালী বার্তা।
মানুষকে তার চেহারা দিয়ে নয়, তার সাহস, সংগ্রাম এবং মানবিকতা দিয়ে বিচার করাই উচিত। ❤️