05/06/2024
১. তাকওয়ার পর সর্বাপেক্ষা উত্তম জিনিষ
তাকওয়ার পর সর্বাপেক্ষা উত্তম জিনিষ সতী নারী হযরত মাওলানা আশেকে ইলাহী বুলন্দ শহরী (রাহঃ) এ প্রসঙ্গে একটি হাদীস পেশ করেছেন। হাদীসের অর্থ নিম্নে প্রদত্ত হল :
হযরত আবু উমামা (রাঃ) হুজুর (সাঃ)-এর বাণী বর্ণনা করেন, মুমিন বান্দা খোদাভীরুতা অর্জনের পর নিজের জন্য সবচেয়ে উত্তম বস্তু যা সে নির্বাচন করে, তা হল নেকবখত স্ত্রী। যার গুণ এমন, স্বামী যখন তাকে কোন কাজের আদেশ দেয়, তখন তা পূর্ণ করতে স্বামীকে সহযোগিতা করে। আর স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিজের ও স্বামীর ধন-সম্পদের হিফাজত -মিশকাত, ২৬
করে।
হযরত বুলন্দ শহরী (রাঃ) উল্লেখিত হাদীসের ব্যাখ্যা এরূপ করেছেন, উক্ত হাদীস শরীফে মহানবী (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, তাকওয়ার নিয়ামত একটি অনেক বড় নিয়ামত। যদি কেউ এ মহা মূল্যবান নিয়ামত সহজেই প্রাপ্ত হয়, তাহলে সে বড় ভাগ্যবান, বরকতময় ব্যক্তি। কেননা, প্রকৃত দ্বীনদারী তাকওয়ারই নাম । এর কারণ এই যে, তাকওয়া হল ফরয, ওয়াজিব আদায় করা এবং হারাম, মকরূহ ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে বেঁচে থাকার নাম । ঐ গুণ অর্জন করতে পারলে বান্দা আল্লাহ তা'আলার প্রিয় পাত্র হয়ে যায় । তাকওয়া ব্যতীত আরো অসংখ্য নিয়ামত এমনও রয়েছে, যার স্তর যদিও তাকওয়ার নিয়ামত থেকে কম। কিন্তু মানব জীবনের জন্য সেটাও অনেক জরুরী ও অমূল্য। ঐ সমস্ত নিয়ামতের মধ্যে সবচে' মূল্যবান নিয়ামত কি? তা মহানবী (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, তাহল নেক ও সতী স্ত্রী, অতঃপর তিনি নেক ও আদর্শ স্ত্রীর গুণাবলি বর্ণনা করলেন-
১ম গুণ ঃ স্বামীর অনুগত, বাধ্যগত হওয়া। স্বামী যা আদেশ করেন, তা পূর্ণ করে এবং নাফরমানী করে স্বামীর অন্তরকে ব্যাথিত করে না । শর্ত হল, স্বামী তাকে শরীয়ত বিরোধী কোন কাজের আদেশ দেয় না । কেননা, শরীয়ত বিরোধী কাজে কারো আনুগত্য হারাম। কারণ, এতে সৃষ্টিকর্তা, রক্ষাকর্তা মহান আল্লাহ তা'আলার নাফরমানী হয়, যিনি রাজাধিরাজ, বিশ্ববিধাতা ।
২য় গুণ ঃ নবীজী (সাঃ) ইরশাদ করেন, যদি স্বামী স্ত্রীর প্রতি দৃষ্টিপাত করে, তাহলে স্ত্রী স্বামীকে সন্তুষ্ট করে দেয়। অর্থাৎ স্ত্রী তার ঢং, সাজ- সজ্জা, রূপচর্চা স্বামীর মরজী মুতাবেক করে । যখন স্বামীর দৃষ্টি স্ত্রীর চেহারায় পড়ে, তখন তাকে দেখে স্বামীর অন্তর সন্তুষ্ট হয়ে যায়। কোন কোন নির্বোধ নারী অশালীন আচরণ করে । কথায় কথায় মুখ বক্র করে । অসুস্থতা প্রকাশের জন্য খামোখা কোকাতে থাকে। রূক্ষ মেজাজ প্রদর্শন করে। কোন কোন স্ত্রী অগোছানো কেশে অপরিচ্ছন্ন বেশে কাজের বুয়ার মত স্বামীর সম্মুখে ঘোরাফেরা করে। এতে স্বামী মানসিকভাবে ক্লীষ্ট এবং আন্তারিকভাবে ক্ষিপ্ত হতে থাকে। স্বামী এমন স্ত্রীর চেহারার প্রতি দৃষ্টিপাত করাও অপছন্দ করে; বরং বাইরে থেকে গৃহে প্রত্যাবর্তন করাও মুসীবত মনে করে। এদের মধ্যে ঐ সব নারীরাও রয়েছে, যারা নমায রোজার পাবন্দ হওয়ার কারণে নিজেদেরকে নেককার, দ্বীনদার, পরহেজগার মনে করে, অথচ নেককার ও আদর্শ স্ত্রীর গুণাগুণের মধ্যে এ গুণটিও অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে যে, সে স্বামীর অনুগত, বাধ্যগত হবে এবং স্বামী তার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে স্বামীকে সন্তুষ্ট করে দেবে। তবে শরীয়ত বিরোধী খাহেশ পূর্ণ করবে না। এটা জায়েয নেই ৷
৩য় গুণ ঃ নবীজী (সাঃ) ইরশাদ করেন, স্বামী যদি কছম খায় (শপথ করে) কোন কাজ করার, যার সম্পর্ক ইহলৌকিক বা পারলৌকিক, যেমন- আজ তুমি অবশ্যই আমার মায়ের বাড়ি বেড়াতে যাবে অথবা বড় ছেলেকে গরম পানি দ্বারা গোছল করাবে কিংবা আজ তুমি তাহাজ্জুদ নামায পড়বে, তাহলে স্ত্রী স্বামীর শপথকে সত্যে পরিণত করে। অর্থাৎ স্বামী যে কাজের শপথ করে, সে কাজ করে স্বামীকে সন্তুষ্ট করে। তবে শর্ত হল, সে কাজ শরীয়ত সম্মত হতে হবে। অন্যথায় স্বামীর কছম পূর্ণ করলে গুনাহগার হবে।
লক্ষ্যনীয় বিষয় এই যে, স্বামী কর্তৃক এভাবে কছম খাওয়া যে, “তুমি কিন্তু এ কাজটি অবশ্যই করবে”, স্ত্রীর প্রতি অধিক প্রেম-ভালবাসার কারণেই হয়ে থকে। যার সাথে গভীর সুসম্পর্ক এবং যার উপর অধিকার চলে, তাকেই বলা যেতে পারে, “এ কাজ তোমাকে করতেই হবে।” এমন পরিস্থিতিতে কোন কোন সময় স্বামী স্ত্রীকে কছম দিয়ে থাকে। কখনও কখনও স্বয়ং স্বামী নিজেও কছম খেয়ে থাকে। যে সব স্ত্রীদের সাথে স্বামীদের আন্তরিক ও অকৃত্রিম ভালবাসা ও সুসম্পর্ক রয়েছে, তারাই কেবল স্বামীদেরকে সন্তুষ্ট রাখার প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখে। উল্লেখিত তৃতীয় গুণ বর্ণনায় ঐ বিশেষ প্রেম-ভালবাসা, দাবী ও চাহিদা আলোচিত হয়েছে, যা প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি স্বামী-স্ত্রীর মাঝে হওয়া বাঞ্ছনীয় ।
৪র্থ গুণ : নবীজী (সাঃ) ইরশাদ করেন, যদি স্বামী কোথাও চলে যায় এবং স্ত্রীকে গৃহে রেখে যায়, যেমনটি অধিকাংশ সময় হয়ে থাকে, তখন স্ত্রীর কর্তব্য এই যে, স্বীয় জীবন, যৌবন এবং স্বামীর ধন-সম্পদ সংরক্ষণে ঐ পন্থা অবলম্বন কবরে, যে পন্থা সে স্বামীর উপস্থিতিতে করে। আত্ম- মর্যাদাবোধসম্পন্ন স্বামীরা কখনও এটা পছন্দ করবে না যে, তার স্ত্রী অন্য কোন বেগানা পুরুষকে দেখুক বা বেগানা পুরুষের সম্মুখে আসুক কিংবা পর-পুরুষের চোখে চোখ রেখে হাসুক অথবা মন বিনিময় করুক। যখন স্বামী গৃহে উপস্থিত থাকে, তখন সে একান্ত তারই স্ত্রী হয়ে থাকে। আর যখন স্বামী কোন কাজে বাইরে চলে যায়, তখনও একমাত্র তারই স্ত্রীরূপে গৃহে পর্দানশীন হয়ে অবস্থান করে। যখন কোন পুরুষের সাথে বিবাহ হয়ে গেল, তখন চারিত্রিক পবিত্রতা ও সতীত্ব সংরক্ষণ ঐ পুরুষ (স্বামী) এর সাথে সম্পৃক্ত হয়ে গেল। এখন স্ত্রী মানসিক ও মানবিক কামনা-বাসনা পূর্ণ করার কেন্দ্রস্থল একমাত্র স্বামীকেই বানিয়ে নেবে, অন্য কাউকে নয় । আর স্বামীর অনুপস্থিতিতে এক রকম আচরণ, আর তার অনুউপস্থিতিতে অন্য রকম। যেমন ঃ তার টাকা-পয়সা লুটিয়ে দেবে অথবা মায়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দেবে কিংবা আত্মীয়-স্বজনদের জন্য ব্যয় করবে। যদি স্বামীর অনুপস্থিতিতে অথবা তার অনুমতি ব্যতীত তার ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা অপচয় করে, তাহলে তা হবে খিয়ানত ও স্বামীর সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা ৷ যেমন ঃ একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।
لا تبغيه خونا فى نفسها ولا ماله المشكوة ص ۲۸۳
একটি প্রশ্ন তার ও তার উত্তর
যদি কেউ প্রশ্ন করে যে, আমাদের সমাজে কোন কোন স্বামী এমন রয়েছে, যারা স্বীয় প্রাণপ্রিয় স্ত্রীকে বেগানা পুরুষদের সম্মুখে উপস্থিত করে। বরং তাদের সাথে স্ত্রীকে হাত মিলাতে বলে । শুধু তা নয়, বরং পর পুরুষদের সম্মুখে নাচতে বাধ্য করে। এখন যদি ঐ সমস্ত স্বামীদের স্ত্রীগণ স্বামীর অনুপস্থিতে পরপুরুষের সাথে কুসম্পর্ক রাখে, যা স্বামীর ইচ্ছানুযায়ী: সম্পাদিত হয়। তাহলে তা বৈধ হওয়া উচিত? কারণ, এতে স্বামীর সাথে খিয়ানতও হয় না, বিশ্বাস ঘাতকতাও হয় না। কেননা, স্বামী তো স্বয়ং নিজেই চায় যে, তার স্ত্রী বেগানা পুরুষদের সাথে মেলা-মেশা করুক। বরং অনেক স্বামী তো এতে আনন্দিত হয়। কারণ, তারা স্বীয় স্ত্রীকে মডাৰ্ণ দেখতে চায়। তার স্ত্রীর বয় ফ্রেন্ড অসংখ্য। এটা তো আপটুডেট হওয়ার আলামত। আনন্দিত হওয়ারই কথা? ঐ প্রশ্নের উত্তর এই যে, হাদীস শরীফে মুসলমান নারী-পুরুষের অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে। কোন মুসলমান কখনও নির্লজ্জ ও মর্যাদাবোধহীন হতে পারে না এবং কখনও এটা বরদাস্ত করতে পারে না যে, তারই প্রাণপ্রিয় স্ত্রীর উপর কোন বেগানা পুরুষের দৃষ্টি পড়ুক কিংবা হস্ত প্রসারিত হোক। আর না কোন মুমিন আদর্শ স্ত্রী এটা পছন্দ করবে যে, স্বামী ব্যতীত অন্য কোন পুরুষের সাথে তার কুসম্পর্ক হোক। যারা বর্তমান আধূনা সমাজ ব্যবস্থার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে চায় এবং স্ত্রীকে মডার্ণ বানানো পছন্দ করে, তারা নিঃসন্দেহে ইয়াহুদী নাছারাদের জীবন ব্যবস্থারই অনুকরণ করছে। তাদের মধ্যে কতটুকু ঈমান রয়েছে, প্রিয় নবীজীর (সাঃ) সাথে তাদের কতটুকু মুহাব্বত, কুরআন হাদীসের সাথে তাদের কতটুকু ভালবাসা? যদি এসব যাচাই করা হয়, তাহলে ফলাফল দাড়াবে শূন্যের কোঠায়। এরা সহীহ মুমিন হওয়া তো দূরের কথা, সহীহ মানুষ কিনা তাতেও রয়েছে প্রচুর সন্দেহ।
উল্লেখিত হাদীস শরীফে এমন ঈমানহারা বদ নসীব মানুষের আলোচনা করা হয়নি; বরং সম্মানিত মর্যাদাবোধসম্পন্ন মুমিন নারী-পুরুষের আলোচনা করা হয়েছে।