26/10/2018
চান্দিনার মরহুম কামাল উদ্দিন স্যারের সাথে আমার স্মৃতি কথা: পর্ব-২
গতপর্বে কিভাবে স্যারের সাথে পরিচয় হয়েছিল সেই বিষয়ে লিখেছিলাম, আজকে লিখবো স্যারের কিছু ভবিষৎবাণী নিয়ে এবং স্যারের মৃত্যুর আগের দিনগুলোর কথা। প্রতিদিন বিকেলবেলা স্যারের কাছে পড়তে যেতাম, স্যার আমাকে সর্বেচ্চ আধাঘণ্টা পড়াতেন। কিন্তু আমি পুরো বিকেলটাই স্যারের সাথে কাটাতাম, স্যার অনেক গল্প করতেন আমার সাথে, তারপর মাঝেমাঝে স্যারের সাথে কাজও করতাম। স্যারের একটা বড় নার্সারি ছিল আমাদের হাইস্কুলের পাশে, এই নার্সারিতে আমি আর স্যার প্রায়ই কাজ করতাম। আমাদের গ্রামবাসী তথা স্কুলের কমিটি অনেকেই জানেনা, আমি আর স্যার মিলে এই স্কুল আঙ্গিনায় অনেক গাছ লাগিয়েছিলাম, কালের সাক্ষী হয়ে কিছু গাছ এখনো দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু স্যার নেই!!! স্কুলের অফিস রুমে স্যারের রেস্ট করার জন্য একটা চৌকি(ছোট খাট) ছিল, একদিন বিকেলবেলা গিয়ে দেখি স্যার চৌকিতে শুয়ে আছে। দেখেই বুঝতে পারলাম স্যারের মনটা ভালো নেই, আমাকে দেখেই বলল রুহুল বস। আজকে তোকে পড়াবো না, আয় দুইজন মিলে গান গাই!! আমি শুনে লজ্জায় লাল হয়ে গেলাম!! যেই কথা, সেই কাজ..স্কুলের আলমিরা থেকে একটি ব্যাটারিচালিত ছোট হারমোনিয়াম বের করলেন, আর নিজে নিজে সেটা বাজিয়ে গান শুরু করলেন...সেদিনের স্যারের গাওয়া একটি গানের কথা মনে আছে, গানটি হল:- "আমার স্বাদ না মিটিলো, আশা না ফুরাইল"। গান শুধু স্যার ই গাইতেছিল, আর আমারে বলতেছিল, তোকে গান শিখতে হবে। আমি মাথা নাড়তেছিলাম। গান গাওয়া শেষ হলে, স্যার বলল নে গান শিখার জন্য এই হারমোনিয়াম টা তোকে আমি দিলাম, তুই এটা মাঝেমাঝে বাজিয়ে গান শিখবি। হারমোনিয়াম পেয়ে সেদিন কি যে খুশি হয়েছিলাম, বলে বুঝাতে পারবোনা। এখনো স্যারের দেওয়া সেই হারমোনিয়াম টা আমার বাসায় সংরক্ষিত আছে। এরকম অনেক অবিশ্বাস্য স্মৃতি স্যারের সাথে আমার আছে। স্যার বেশী গল্প করতেন তখন, যখন আমি আর স্যার দুইজন মিলে নার্সারি তে কাজ করতাম। নার্সারির কাজগুলা খুব পরিশ্রম এর কাজ ছিল। তবুও এটুকু কষ্টও হতো না, কারন স্যার বিভিন্ন গল্প করে কাজের পরিশ্রম হালকা করে দিতেন... স্যারের নার্সারিতে শুধু আমি না, অনেক ছাত্রই কাজ করতেন। বিনিময়ে এই নার্সারি থেকে বিভিন্ন গাছের চারা পেতেন এবং অনেক দরিদ্র ছাত্রকে স্যার আর্থিকভাবে সাহায্য করতেন। তবেঁ এতো ছোট বয়সে কিভাবে জানি আমি স্যারের খুব বিশ্বস্ত হয়ে গিয়েছিলাম, এই বিশাল নার্সারির সম্পূর্ণ দায়িত্ব বলতে গেলে আমার কাছেই ছিল, নার্সারির চাবি আমার কাছে থাকতো। আমার কাজ ছিল, প্রতি শুক্র ও সোমবার(আমাদের এলাকার বাজার এর দিন) শামুর ছেলে সোলেমান(ছেলেটা কিছুদিন আগে মারা গেছে) কে সাথে নিয়ে নার্সারি থেকে চারা বিক্রি করা। আজকে যে নেতৃত্ব দেওয়ার কিছু গুণাবলি আয়ত্ত্ব করেছি, এগুলা স্যারে কাছ থেকে শেখা। কারণ এই নার্সারি থেকে চারা তোলা থেকে বিক্রি পর্যন্ত পুরা কাজগুলোই করতো অল্পবয়সী কিছু ছেলে, আমার কাজ ছিল সাথে থাকা। বিক্রির পর টাকা হাতে নেওয়া এবং লেবার দের পাওনা টা বুঝিয়ে দেওয়া। অবশিষ্ট টাকাটা আমি স্যারের কাছে নিয়ে হিসাব দিতাম, কিন্তু স্যার এই টাকা পকেটে নিতেন না। সেটা আমার মাধ্যমেই আমার এলাকার কিছু সুবিধাবঞ্চিত ছেলেমেয়ের মাঝে বিলিয়ে দিতেন এবং এটা স্যারের সামনেই দেওয়া হতো। স্যারের সেই সমাজসেবা গুলা আজীবন মনে থাকবে আমার। আমি তখন খুব ছোট হলেও কিছু কথা স্যার আমাকে বলতেন যেগুলা এখন বাস্তব!! তখন মনে করতাম স্যার ঘন কথা বলে। যেমন, স্যার আমাকে প্রায়ই একটি কথা বলতেন..দেখিস রুহুল, আমি হয়তো থাকবো না কিন্তু এই স্কুলের বিশাল জায়গা একসময় বেদখল হয়ে যাবে, গুরগার জলার ব্যাপক উন্নতি সাধন হবে(বর্তমানে শুনেছি এই গুরাগারজলাতে নাকি সরকার প্রাকৃতিক মাছের অভয়ারণ্য করবে), তোদের পার্শ্ববর্তী পোনশাই গ্রামে একদিন হাসপাতাল হবে (উল্লেখ্য যে এই গ্রামের অধিকাংশ মানুষ ডিমব্যাপারী আর ভিক্ষুক ছিল, এখন ঠিকই পরিবর্তন হয়েছে)। স্যারের এই ভবিষৎবাণী গুলা আজ আমি অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণ পেয়ে মনে হচ্ছে, স্যার একজন সাধারণ মানুষ ছিলেন না। আমার দেখা তিনি একজন মহামানব ছিলেন। স্যারের আদর্শ আমার মাঝে প্রতিফলিত হোক, এই কামনা করে আজকের পর্ব শেষ করছি। আর এক পর্ব লিখবো। আশা করি সাথে থাকবেন.............
মো: রুহুল আমিন
এস.এস.সি ২০১০ ব্যাচ