08/12/2025
হযরত আইয়ুব আ:– এর গল্পে আমরা দেখি, একজন মানুষ সবকিছু হারিয়েও বেঁচে আছেন শুধুমাত্র আল্লাহর স্মরণে, ধৈর্যধারণ করে।
ঘর নেই, সম্পদ নেই, সন্তান নেই, পাশে থাকার মতো মানুষও নেই। দেহ ভেঙে পড়েছে, শক্তি শেষ হয়ে আসছে, তবুও তাঁর হৃদয় আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাস, অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়নি। তিনি ধৈর্যচ্যুত হননি।
তিনি অভিযোগ করেননি, “কেন আমার সাথে এমন হলো?” তিনি তাকিয়েছিলেন শুধু আল্লাহর দিকে, আল্লাহরকে সন্তুষ্ট করার আশায়।
আর আল্লাহ তাঁকে ঘোষণা দিলেন— ধৈর্যশীল বান্দা, উত্তম বান্দা। (সূরা সাদ: ৪৪)
এই ধৈর্যের দৃশ্য সাহাবীদের জীবনেও দেখা যায়।
বিলাল রা. ছিলেন দাস। তাঁকে মাটিতে ফেলে বুকের উপর পাথর চাপানো হতো, রোদে পুড়ে যেত শরীর। চারদিকে অপমান আর নির্যাতন, কিন্তু তাঁর জবান থেকে বের হতো একটাই শব্দ, “আহাদ… আহাদ…”।
তিনি কষ্টকে পরাজিত করেছেন ধৈর্যের শক্তিতে।
খাব্বাব রা. ছিলেন লোহার কারিগর। উত্তপ্ত কয়লার উপর তাঁকে শোয়ানো হতো, পিঠের চামড়া গলে যেত, তবুও তিনি আল্লাহর পথে স্থির ছিলেন। তাঁকে দেখে সাহাবীরা বলতেন, “এমন ধৈর্য আমরা দেখিনি।”
এরা কেউ আরাম পাননি, সম্পদ পাননি। তাদের পরীক্ষা ছিল কষ্টের ভেতর ঈমান ধরে রাখা, আর সেখানেও তারা উত্তম হয়েছেন
অন্যদিকে হযরত সুলাইমান আ:–এর পরীক্ষা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তাঁর হাতে ছিল রাজত্ব, সেনাবাহিনী, সম্পদ, শক্তি।
তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল বাতাস, জিন, পাখি। এত বিশাল সামর্থ্যও তাঁকে উচ্চাভিলাষী করেনি। তিনি প্রতিটি নিয়ামতের পিছনে আল্লাহর দয়া দেখতেন, বলতেন, “এটা আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ।”
আর আল্লাহ তাঁকে উত্তম বান্দা হিশেবে অভিহিত করেন। (সূরা সাদ: ৩০)
প্রাচুর্যের মাঝেও নম্র থাকা- এইটিই ছিল তাঁর পরীক্ষা এবং তাঁর বিশালত্ব।
সাহাবীদের মধ্যেও আমরা সেই সুলাইমানি পরীক্ষা দেখি।
উসমান ইবনে আফফান রা. ছিলেন অপরিমেয় সম্পদের মালিক, কিন্তু তাঁর বিনয় ছিল গভীর। নিজের জন্য কম ব্যবহার করতেন, অন্যদের জন্য দিতেন অঢেল।
তাবুকের দিনে তিনি শত শত উট, অসংখ্য স্বর্ণমুদ্রা দান করেছেন আল্লাহর রাস্তায়। নবী ﷺ তাঁকে দেখে বলেছিলেন যে, আজ উসমানের দান এমন এক দান, যা তার পরে তাঁর কোনো কিছুই তাকে ক্ষতি করতে পারবে না।
আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রা. ছিলেন ব্যবসার বিস্ময়। মদিনায় এসে শূন্য থেকে শুরু করে অল্প সময়েই বিশাল সম্পদের অধিকারী হন। কিন্তু তিনি বুঝতেন এই প্রাচুর্যও পরীক্ষা।
তাঁর ঘরে অনাহারীদের জন্য রান্না হতো নিয়মিত। একবার কয়েকশো উট ভর্তি মাল এলে তিনি সবকিছুই একবারে দান করে দেন। তিনি জানতেন, প্রাচুর্যের ভেতরে শোকরই প্রকৃত সফলতা।
দুই পক্ষই আল্লাহর কাছে সম্মানিত। একজন কষ্টের পরীক্ষায় ধৈর্য ধরে উত্তম হন, আরেকজন প্রাচুর্যের পরীক্ষায় শোকর করে উত্তম হন।
যেখানে শরীর দুর্বল, কিন্তু ঈমান দৃঢ়- সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন আইয়ুব আ:, বিলাল রা., খাব্বাব রা.।
আর যেখানে সম্পদ প্রবাহিত, তবুও হৃদয় বিনয়ী- সেই জায়গায় আছেন সুলাইমান আঃ, উসমান রা., আব্দুর রহমান রা.।
পরীক্ষা ভিন্ন, কিন্তু মূল্যায়ন একই। আল্লাহ কাউকে কষ্ট দিয়ে দেখেন, কারো হাতে সম্পদ দিয়ে দেখেন।
কেউ হারিয়ে উত্তম হয়, কেউ পেয়ে উত্তম হয়।
তাই জীবনের কোনো অবস্থাই শেষ কথা নয়। শেষ কথা একটাই— এই অবস্থার ভেতর আমরা কতটা আল্লাহর দিকে ফিরে থাকি। ( আরিফুল ইসলাম ভাইয়ের ওয়াল হতে )