19/02/2022
আমার সন্তানদের বলছি
আমাদের সন্তানদের বলব জীবনের যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে চোখ বুজে ফেল। তারপর সে অন্ধকার গড়ে দেওয়া চোখের সামনে একবার তোমার পরিবারের মায়াবী মুখগুলো কল্পনা কর। অন্ধকার চোখ মানুষকে যা দেখাতে পারে, খোলা চোখের আলো অনেক সময় তা দেখাতে পারে না। তোমার বাবার ক্লান্তিতে ভেঙে পড়া মুখটার কথা মনে কর, তোমার মায়ের আদর মাখা মায়াবী মুখটার কথা মনে কর। তোমার-বোনের অসহায় মুখগুলোর কথা চিন্তা কর। তখন মায়ার বন্ধন এসে জানিয়ে দেবে তোমার কী করা উচিত, কী করা উচিত নয়। মনে পড়ছে তোমার বাবার কথা? তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে গিয়ে যার একটা দামি চাদর কেনার ইচ্ছা থাকলেও তা আর কেনা হয়নি। শীতে থরথর করে কেঁপেছেন, যা কাউকে বুঝতে দেননি। গরমে ঘামে ভিজেছে সারা শরীর, অথচ হাতপাখার বাতাসে সন্তুষ্ট থেকেছেন। তোমার বাবার চেহারা খুব অসাধারণ নয়, খুব সহজ-সরল ছা-পোষা একজন মানুষ। তোমার চিন্তা করতে করতে কপালে ভাঁজ পড়েছে, শরীরের চামড়াটাও ঝুলে পড়েছে। কখনো নিজের সুখের কথা ভাবেননি, রাত-দিন তোমার সুখের কথা ভেবেছেন। তোমাকে অনেক বড় মানুষ করবেন বলে কখনো নিজের শখ, আহ্লাদ মেটাননি। এই তোমার জন্মদাতা বাবা, যিনি বুকের ভিতরের বোবাকান্না চেপে রেখে মুখের হাসিটা ধরে রেখেছেন। হয়তো নির্দয় পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে অভিনয় করে যাচ্ছেন নিজের অজান্তে, তার পরও জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ার লড়াইটা থামাননি। ক্রমাগত নিজের স্বপ্ন ক্ষয়ে ক্ষয়ে তোমার স্বপ্ন গড়ে তোলার ব্যাকুলতা যে মানুষটাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে, তোমার সেই বাবা তোমার চোখে কি বাস্তব জীবনের নায়ক হয়ে উঠতে পেরেছেন? তোমার দেহের ভিতরের মানুষটাকে প্রশ্ন কর, উত্তরটা হয়তো পেয়ে যাবে। মনে পড়ছে কি তোমার মায়ের কথা, গাঁও-গেরামের একজন সাধারণ মেয়ে। একটা লাল বেনারসি শাড়ির ইচ্ছা থাকলেও কখনো মুখ ফুটে বলেননি। একটা কাপড় শরীরে জড়িয়ে সারাটা জীবন তোমার সুখের জন্য লড়েছেন। ছেঁড়া শাড়িতে সুই আর সুতোর লড়াই চলেছে অনেকবার, তবু তোমাকে নিয়ে মায়ের স্বপ্ন বড় থেকে বড় হয়েছে। এতটাই বড় যে এমন বড় করে পৃথিবীতে মা ছাড়া আর কেউ ভাবতে পারে না। সংসারের ঘানি টানতে টানতে নিজেকে দিনে দিনে নিঃশেষ করেছেন তোমার মা, তবু থেমে যাননি। তোমাকে পেট ভরে খাওয়াবেন বলে নিজে না খেয়ে থেকেছেন। ক্ষুধার যন্ত্রণায় ভিতরটা উথাল-পাতাল করেছে কিন্তু কাউকে বুঝতে দেননি। সারা জীবন নিজের কষ্টগুলো লুকিয়েছেন, নীরবে চোখ মুছেছেন কিন্তু তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে দেননি। মা তোমাকে রাজপুত্রের সাজে কতবার স্বপ্নে দেখেছেন আর মনে মনে আনমনে হেসেছেন। প্রার্থনা করেছেন তুমি যেন বড় হয়ে রাজাদের রাজা হও, জীবনে সফল হও। তোমার মা খুব শিক্ষিত নন, তবু শিক্ষার মর্ম বুঝেছেন। তুমি শিক্ষিত হয়ে দেশ ও দশের মধ্যে একজন হবে এ চিন্তা তোমার মাকে সব সময় তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। সারাক্ষণ তোমার মঙ্গল চিন্তা করেছেন আর নিজের সবকিছু জলাঞ্জলি দিয়ে তোমাকে ভালোবেসেছেন। মায়ের স্বার্থহীন ভালোবাসার মতো অমূল্য সম্পদ তো আর পৃথিবীতে কিছু নেই। তোমার চিন্তায় চোখের নিচে কালো দাগ পড়েছে, কেশবতী ছিলেন তোমার মা আর এখন চুলগুলো এলোমেলো, উশকো-খুশকো। মুখের চামড়াটা আর মখমলের মতো নেই, অনেকটা রুক্ষ হয়ে গেছে। তোমার জন্য নিজেকে ক্ষয়ে ক্ষয়ে কোথায় যেন হারিয়ে ফেলেছেন সেই নানান রঙের দিনগুলো। একটা ছেঁড়া স্যান্ডেলের আঘাত পেতে পেতে তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছেন। তিনি কোনো নায়িকা নন, তিনি তোমার মা, গর্ভধারিণী জননী। তোমার স্বপ্ন সার্থক করার জন্য তোমার মমতাময়ী মা যে ত্যাগ করে চলেছেন, সে ত্যাগের মূল্য কি তুমি উপলব্ধি করতে পার? তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে দেখতে নিজের স্বপ্নগুলো হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। তবু মুখে অমৃত মধুর হাসিটা ধরে রেখেছেন। মা, তোমার মা, পুতুল হয়ে তোমার স্বপ্নের সুতোর টানে নেচে বেড়াচ্ছেন, ঠিক নৃত্যকলা নয় বরং নিজেকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে তোমার জন্য জীবন বাজি রেখে লড়াই করে যাচ্ছেন।
মনে পড়ছে ছোট বোনটার অসহায় মুখটার কথা। পায়ে আলতা পরে নেচে নেচে বেড়ানোর খুব ইচ্ছা তোমার বোনের। রুপার নূপুর পায়ে জড়িয়ে শব্দের ঝঙ্কার তোলার স্বপ্ন তোমার বোনের। হাতে রেশমি চুড়ি পরে প্রকৃতির বুকে মিশে যাওয়ার অনেক শখ তোমার ছোট বোনটার। পাশের সাহেবদের বাড়ির মেয়েটার বড় পুতুলটা দেখে তোমার বোনেরও ইচ্ছা হচ্ছিল এমন একটা পুতুল কেনার; কিন্তু কাউকে বলতে পারেনি। আদুরে বোন তোমার, না পাওয়ার কষ্টে মুখ লুকিয়ে কেঁদেছে কিন্তু কাউকে বুঝতে দেয়নি। ছোট একটা মেয়ে তার পরও স্বপ্নগুলো বুকের ভিতরে দিনের পর দিন পুষে রেখেছে। তোমার বোনটাও তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে যদিও সে বোঝে না স্বপ্ন জিনিসটা কী। অভুক্ত যন্ত্রণায় কাতর মুখটা তার কতটা অসহায় হয়ে পড়ে মাঝেমধ্যে, তোমার চোখে কি তা ধরা পড়েছে? সে তেমন কিছু বোঝে না তবে জানে তার ভাইজান একদিন চাকরি করলে তার সব শখ পূরণ হবে। একটা ছোট দেহের ছোট মন, খুব নিষ্পাপ, খুব মায়াবী, তোমার স্বপ্নজয়ের অপেক্ষায় বসে থাকে, ফুলের মালা গাঁথে, চাঁদের আলো দেখে আনন্দে হাসে। চোখ দুটো সে আলোয় চিকচিক করে ওঠে। কারণ তোমার বোনের কাছে তুমি যে চাঁদের মতোই মহামূল্যবান। তোমার অবুঝ বোনের সেই মায়ার জাদু কি তোমাকে আবেগে আপ্লুত করে নাকি কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে তোমার পরীক্ষা নেয়। কেইবা জানে তা, তুমিই ভালো বলতে পারবে।
মনে পড়ছে কাদামাটিতে গড়াগড়ি খাওয়া ভাইটার কথা? পুকুরে সাঁতার কাটতে খুব ভালোবাসে সে। যার খুব শখ একটা সাইকেল কিনবে। অথচ মুখে তা কখনো আনেনি, অপেক্ষা করছে তোমার জন্য, তোমার স্বপ্নজয়ের জন্য। চোখে-মুখে হাজারো স্বপ্ন তার, তার পরও নির্বাক, স্থবির, জড়তায় আক্রান্ত। অনেকটা ক্যামেরাবন্দি ছবির মতো, কিংবা বড় বড় চিত্রশিল্পীর জলরঙে আঁকা ছবির মতো। কী আর বোঝে তোমার ভোলাভালা ছোট ভাইটা, সে জানে তুমি একদিন আলাদিনের চেরাগ পাবে। সে চেরাগটা দিয়ে তুমি তাদের অপূর্ণ স্বপ্নগুলো কানায় কানায় পূরণ করবে।
একবার এ কথাগুলো ভাব তো। খুব গভীরভাবে। বরফখণ্ডের মতো হয়ে, পোড়া আগুনের কয়লা হয়ে। তুমি যদি জীবনের কাছে পরাজয় মেনে নিয়ে এমন কিছু একটা করে বস তবে তাদের সে স্বপ্নগুলো যে মুহূর্তেই ভেঙে যাবে, আনন্দের দিন আসছে বলে যে মুখগুলো ক্ষয়ে ক্ষয়ে একটার পর একটা দিন গুনছে তাদের সবকিছু যে নিমেষেই মিছে হয়ে যাবে। মাদককে না বল, ধূমপানকে না বল, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে না বল, অসৎ সঙ্গকে না বল, হতাশাকে না বল, আত্মহত্যাকে না বল, অন্ধকার জগতের রঙিন ভ্রান্তিবিলাসকে না বল। সব নেতিবাচকতাকে না বল। দেশকে ভালোবাসো, মানুষকে ভালোবাসা, নতুন নতুন চিন্তাশক্তি দিয়ে পৃথিবী বদলে ফেল, মানবিক মূল্যবোধকে আঁকড়ে ধর, বড় বড় লেখকের বই পড়, মাটির নিচে দাঁড়িয়ে স্বপ্ন দেখ, জীবনে ঠকতে ঠকতে সফল হও। জিততে শেখ, হারতেও শেখ, আঘাত পেয়ে পেয়ে খাঁটি সোনা হও, মানুষের ভিতরের অনুভূতিগুলো বোঝার চেষ্টা কর, মন খুলে হাস, মন খুলে কাঁদো। তুমি একা নও, সারা পৃথিবী তোমার সঙ্গে আছে, তোমার স্বপ্নজয়ের অপেক্ষায় আছে। দেশ তোমাকে কী দিল তা বড় কথা নয়, দেশকে তুমি কী দিলে তা-ই বড় কথা- এ কথাটি কখনো ভুলো না। উদার হও, মহান হও, ত্যাগী হও, কঠিন সত্যের মুখোমুখি হও, জেগে ওঠ তোমার আপন শক্তিতে।
আপনজনদের মুখগুলো বারবার তোমার সামনে ভাসিয়ে তোল, তোমার কল্পনার হাত দিয়ে তাদের মায়ার হাতগুলো খুব শক্ত করে ধর। সেখান থেকেই স্বপ্ন, আশা ও আনন্দের দুর্লভ এক সমীকরণ তৈরি হবে যা চোখ দিয়ে দেখা যায় না, অন্তর দিয়ে অনুধাবন করতে হয়। মায়া... মায়ার টান কখনো ভুলো না। ভালোবাসার বন্ধনের সঙ্গে মায়ার টানকে এক সুতোয় গেঁথে গেঁথে জীবন জয়ের মালাটা নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করুক তোমাদের দেহের ভিতরে, মনের ভিতরে, ভিতরে-বাইরে, অন্তরে-অন্তরে। মায়ার টান হোক তোমার স্বপ্নজয়ের শক্তি, আগামীর অমিত সম্ভাবনা।
(যদি লিখাটা ভালো লাগে তাহলে শেয়ার করে আরেকজনকে জানার সুযোগ করে দিন)