25/01/2026
হিন্দু ধর্মে নদীর দেবী, সঙ্গীতের দেবী এবং জ্ঞানের দেবী সরস্বতী সেটা আমরা সবাই জানি। সাধারণ হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ধারণা যে এই সরস্বতীর পুজা করলে, তার মূর্তি ঘরে রাখলে বা তাঁর কাছে চাইলে উক্ত জিনিষগুলো পাবে তাই না? এই দেবী সরস্বতীর পোশাকের রং হয় শুভ্র, সাথে থাকে একটি বাদ্যযন্ত্র বীণা, দেবী বসে থাকেন পদ্ম ফুলের উপর এবং তাঁর সাথে থাকে একটি রাজহংস।
নদী, সঙ্গীত ও জ্ঞানের মধ্যে সম্পর্কটি কি তাহলে? নদীর প্রবাহিত পানি ময়লা আবর্জনাকে শুদ্ধ করে। বেদ যুগে সঙ্গীত ছিল কথামালা। খেয়াল করুন ব্রহ্মধর্ম নির্ভর রবীন্দ্র সঙ্গীত কথা প্রধান। প্রবাহিত নতির মতই কথার প্রবাহ মনকে শুদ্ধ করে, মানুষকে জ্ঞানী করে। হংস কলুষিত জলে বিচরণ করে কিন্তু সে খাবার সময় ঠোঁটের দুই ধার দিয়ে নোংরা বস্তু ফেলে দেয়, শুধুই শুদ্ধ জল সেবন করে। পদ্ম নোংরা জলে জন্মায় কিন্তু তার পুষ্প শুভ্র সাদা। এই পুরো সরস্বতী মোটিফটিই বা সরস্বতী ধারণাটির অর্থই হল অজ্ঞতা ও কলুষিত স্থান থেকে আসলেও নিজেকে শিক্ষার মাধ্যমে পরিশুদ্ধ করা। নদীর জন্ম হয় অজানা, অগুরুত্বপূর্ণ কোথাও ছোট খাল হিসাবে কিন্তু সে যে দিক দিয়ে বয়ে যায় সেই পথের সবাইকে সে শুদ্ধ করে। সেই কারণে যত পথ বেয়ে সেটি যায় ততই সেটি পরিপুষ্ট হয়, বয়ে যাওয়া এলাকা সুজলা সুফলা হয়।
সরস্বতীর মূর্তি গড়ে ঘরে রাখা বা পুজার দিন সবাই মিলে পুজা দেওয়া সাম্প্রতিক ঘটনা। হাজার দুয়েক বছর আগে থেকে শুরু যখন থেকে আধুনিক হিন্দু ধর্ম বা অবতারবাদ চালু হয়। এর আগে বেদ যুগে মানুষ সরস্বতীর মূর্তি নয়, বরং সরস্বতীর আত্মায় বিশ্বাস করত। তারা বিশ্বাস করত সরস্বতী আছেন সর্বত্র এবং তিনি নদী, সঙ্গীত এবং জ্ঞানের অর্থাৎ আত্মার পরিশুদ্ধতার দেখভাল করেন। তার কাছে কোন কিছু চেয়ে কোন লাভ নেই, তিনি পরিতুষ্ট হন এমন কাজ করতে হবে, তিনি রুষ্ট হন এমন কাজ করা যাবে না।
কিন্তু নদীর দেবী, সঙ্গীতের দেবী এবং জ্ঞানের দেবী সরস্বতীর ধারণাটা এল কোথা থেকে? ছবিতে বামের ছবিটি এআই এর মাধ্যমে আমার আঁকা একটি সরস্বতীর ছবি। কিন্তু ডানের ছবিতে একটি ধাতব পাত্রে হাতে পদ্ম নিয়ে পানির উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া যে রিলিফটি দেখা যাচ্ছে সেটি প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে ইরানের দেবী আনাহিতার। যার পুরো নাম দেবী আরেদ্বী সুরা আনাহিতা।
প্রাচীন ইরানী আবেস্তান ভাষায় “আবান” মানে জল বা সিক্ত, যিনি উর্বরতা, নিরাময় এবং প্রজ্ঞার সাথে যুক্ত। দেবী অনাহিতার প্রতীক পদ্ম ফুল। ইরানে অনুষ্ঠিত হয় একটি উৎসব যার নাম লোটাস ফেস্টিভ্যাল বা ফার্সিতে যেটা জশন-ই নীলুফার। এই উৎসবের আয়োজন সম্ভবত গ্রীষ্মের শুরুতে পদ্ম ফুল ফোটার উপর ভিত্তি করে করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ইরানে জরাথুস্ত্র কতৃক একেশ্বরবাদের অধীনে দেব দেবীর পুনর্বিন্যাস হলে জলের দেবী আনাহিতা সেখানে আহুরা মাজদার অধীনস্ত দেবতাগোষ্ঠির একজন দেবী হিসাবে গণ্য হন। ইরানে দেবী আনাহিতার মন্দিরও আছে।
আধ্যাত্মবাদকে ধারণ করতে গেলে মানুষের মস্তিস্কের বিশেষ ক্ষমতা তৈরি হতে হয়। মস্তিস্কের বিশেষ ক্ষমতা নির্ভর করে পেশা হিসাবে মানুষ কি চর্চা করছে এবং কোন পরিবেশে জীবন যাপন করে সেটির উপর। আধ্যাত্মবাদকে ধারণ করার মস্তিস্কের বিশেষ ক্ষমতা হারিয়ে ফেললে মানুষ মূর্তি গড়ে বা মসজিদ মন্দির বানিয়ে আচার অনুষ্ঠান পালন করাকেই ধর্ম কর্ম পালন মনে করে। কোন ধর্মের উদ্দেশ্যই আসলে সেটা নয়।