মায়াবিনী -গল্পকথন

মায়াবিনী -গল্পকথন Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from মায়াবিনী -গল্পকথন, Real Estate, Cox's Bazar.
(17)

আমি ক্ষুদ্র এক ফুল । দূর্বাঘাসের উপর জমা শিশিরের মতন ক্ষুদ্র। মেঠোপথে ফোঁটা অবহেলিত ফুল। ধরণীতে এসেছি মায়া বিলাতে। আমাকে ভেঙে-চুড়ে মেলে ধরতে। তারপর আমি বিলীন হবো মায়াবী আকাশে।

 #বেলা_অবেলায়  #পর্ব_৩লেখনী : কুলচুমা ইয়াছমিন কনা ড্রয়িং রুমে ঢুকে দেয়ালে টাঙানো বড় ছবি টি দেখে অবাক হয়ে গেলো বাঈজিদ।মাহ...
05/09/2026

#বেলা_অবেলায় #পর্ব_৩
লেখনী : কুলচুমা ইয়াছমিন কনা

ড্রয়িং রুমে ঢুকে দেয়ালে টাঙানো বড় ছবি টি দেখে অবাক হয়ে গেলো বাঈজিদ।
মাহনূর তাহলে আমজাদ হোসেন এর মেয়ে!
বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, সমাজসেবক এবং কলেজের অধ্যাপক। উনার অবস্থান,চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, পরোপকারিতার প্রভাব কক্সবাজারে এতো বেশি যে, উনাকে চেনে না, উনার সম্পর্কে জানে না এমন মানুষ খুব কমই আছে । বিভিন্ন প্রোগ্রাম উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, শিক্ষণীয় সেমিনার, সংবর্ধনা অনুষ্ঠানসহ শহরের নানাবিধ সামাজিক কালচারাল অনুষ্ঠানে উনার উপস্থিতি প্রায় দেখা যেতো।
আমজাদ হোসেন কে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে বাঈজিদের। ভালো পরিচয়ও ছিলো। চমৎকার একজন মানুষ। কক্সবাজারে যে ক'জন ভালো মানুষের দেখা পেয়েছে, তাঁর মধ্যে আমজাদ হোসেন একজন। চোখে-মুখে, কথায় যেমন আন্তরিক ছিলেন তেমনি দারুণ মোটিভেট করার ক্ষমতা ছিলো।
বাঈজিদকে খুব স্নেহ করতেন। প্রায় ভালো-মন্দ খোঁজ নিয়ে বলতেন,বাঈজিদ এটা তোমার শহর মনে করবে। যেকোনো প্রয়োজনে আমাকে ইনফর্ম করবে। কক্সবাজার কে আপন করে দেখো,কক্সবাজারের মানুষের আন্তরিকতা তোমাকে মুগ্ধ করবে।
প্রায় বলতেন, একদিন বাড়িতে এসো। কিন্তু আমি বাড়িতে থাকি রাত ১২ টার পর,হা হা।
তারপর নিজেই হাসতে হাসতে বলতেন, তুমি আসলে, আমি বাড়িতে থাকবো। একদিন জানিয়ে, চলে এসো কেমন? তোমার আন্টি কিন্তু দারুণ মজার মজার পিঠা বানায়!
ভরাট কন্ঠে কবিতা আবৃত্তি করতেন ভদ্রলোক । চৌকস বক্তৃতা দিতেন। নিজের জীবনের ছোট ছোট ঘটনা দিয়েই তরুণ প্রজন্ম কে মোটিভেট করতেন।
উনার মৃত্যুর সংবাদ যখন পায়,তখন বাঈজিদ একটা অপারেশনে ছিলো। বাড়িতে আসার সুযোগ না হলেও, উনার জানাজায় অংশগ্রহণ করেছিল।

মাহনূর একবারও উচ্চারণ করেনি, তাঁর বাবা আমজাদ হোসেন। অদ্ভুত মেয়ে!
বাঈজিদ নামটা পড়েছে, দেখেছেও। কিন্তু কত আমজাদ হোসেন-ই তো থাকতে পারে। তাছাড়া এই মেয়েটা তাঁর কথায়, আচরণে একবারের জন্যও নিজের পরিচয় প্রকাশের চেষ্টা করেনি।
বাঈজিদের আগেই মনে হয়েছিল, এই মেয়েটা আর দশটা মেয়ে থেকে একটু ভিন্ন। কিন্তু এখন দেখছে,আপাদমস্তক ভিন্ন।
ইন্টারেস্টিং!

বাঈজিদকে দেয়ালে টাঙানো ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মাহনূর বললো, আমার বাবা,আমজাদ হোসেন।

জ্বি, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেন।
আমজাদ স্যার আমার ভালো পরিচিত। স্যারের বাড়ি এসে পড়লাম বুঝতে ই পারিনি। স্যার প্রায় আসতে বলতেন, কিন্তু এভাবে আসবো ভাবিনি।

মুচকি হেসে, খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, মাহনূর বসার জন্য বললো।
আপনারা বসুন প্লিজ,আমি চা-নাস্তার ব্যবস্থা করছি। আর মাকে ডেকে দিচ্ছি।

মাহনূর প্রস্থান করার সাথে সাথে, হল রুমের মতো বড় ঘর টা তে চোখ বুলাতে শুরু করলো বাঈজিদ।
ঘরটা হুট করে দেখলে খুব স্বাভাবিক মনে হবে। কিন্তু মনোযোগ স্থির করে দেখলে, চোখে পড়বে অনেক কিছুই। বিশাল বড় ড্রয়িং রুমটা ভালো করে খেয়াল করলে বুঝা যায়, একই ঘরের মাঝখানে একটা অদৃষ্ট দেয়াল আছে। যেন দুটি আলাদা জগত, আলাদা সময় কিংবা আলাদা রুচি।
বুঝিয়ে বলছি-
যেই পাশে এই মুহূর্তে বাঈজিদ দাঁড়িয়ে আছে, সেই পাশ টা ই আভিজাত্যের ছড়াছড়ি। যেমনটা আমজাদ হোসেনের বাড়িতে হওয়া একদম স্বাভাবিক। ইতালিয়ান মার্বেলের মেঝের ওপর, গাঢ় কাঠের ভারী ফার্নিচারগুলো দারুণ দেখাচ্ছে। দক্ষিণ দেয়ালের পাশে চেস্টারফিল্ড সোফা, তাঁর কিছু টা দূরত্বে দুটো উইংব্যাক চেয়ার, মাঝখানে কাচের টপের সেন্টার টেবিল।
দেয়ালঘেঁষা কনসোল টেবিলের ওপর দামি টেবিল ল্যাম্প, চকচক করছে। পাশে পালিশ করা কাঠের ক্যাবিনেট। ভারী পর্দা আর নরম আলোয় অংশটুকু আভিজাত্যপূর্ণ, তবে কোথাও বাড়াবাড়ি নেই।

অন্য পাশটার দিকে হেঁটে গেলো বাঈজিদ। মিলিয়ে দেখলে এই পাশটা সম্পূর্ণ আলাদা।
পুরোনো ধাঁচের এক সেট কাঠের সোফা, সাদা কাপড়ের কভার, দুটো হাতলওয়ালা চেয়ার।
আর ছোট গোল কাঠের টেবিল,যেটা সাদা রানার দিয়ে আবৃত । তাঁর উপর কাঁচের ফুলদানি,তাতে তাজা, শুভ্র, কিছু ফুল রাখা। যার মোহনীয় ঘ্রাণ পুরো ঘরে ছড়াচ্ছে।
জানালার পাশে বেতের আরাম কেদারা। দেয়ালে কয়েকটি পুরোনো সাদাকালো ছবি, দামি কিছু নেই, কিন্তু সবকিছুতেই একটা শান্ত, স্নিগ্ধ ঘরোয়া সৌন্দর্য।
পাতলা সাদা পর্দাগুলো মৃদু বাতাসে এদিক ওদিক সরে যাচ্ছে। পর্দাগুলোর ওপাশে একটা বারান্দা। লম্বা বারান্দা জুড়ে নানান ফুলের গাছ।
বাঈজিদ পুরো ঘরটা দেখে অবাকই হলো।
এই পাশটায় বাঈজিদের বেশ ভালো-স্নিগ্ধ মনে হলো। স্বাচ্ছন্দ্যে এই পাশের একটা কাঠের সোফায় বসে পড়লো। সাদা কাভারে আবৃত কুশন টা কোলে তোলে নিলো।
তাজা ফুলগুলোর সুগন্ধিতে একবার চোখ বন্ধ করে নিলো। মাহনূর এসে বললো, একি! আপনি এদিকে চলে আসলেন যে?
দেখতে, দেখতে চলে এলাম। এদিক টা-ই বেশ আরামবোধ করছি। এতো সুন্দর করে সাজানো! এতো স্নিগ্ধ! অসাধারণ সত্যি।

এই পাশটায় বাপ্পি বসতো। বাপ্পির প্রিয় কর্ণার বলতে পারেন। সকালে খুব ভোরে এদিক দিয়ে হুড়মুড়িয়ে বাতাস ঢুকে। বাপ্পি ঐ বেতেরচেয়ার টায় বসে কুরআন তেলাওয়াত করতো। বারান্দার ফুলের সুবাস, সকালের বাতাস, গ্রিন টি আর শুভ্র এই পরিবেশ টা তে বাপ্পি যতক্ষণ সম্ভব কাটাতেন। বাপ্পির স্টাডি রুমটাও এমন সাদামাটা। তবে বেডরুম টা মাম্মির পছন্দে,তাই ওটা দামী দামী আসবাবে ভরা। বাপ্পি বেডরুমে শুধু ঘুমাতেন। বাকি যতক্ষণ বাড়ি থাকতেন, ড্রয়িং রুমের এই সাইড আর স্টাডি রুমে ই সময় কাটাতেন। আসলে বাপ্পি চাকচিক্যময় জীবন কম পছন্দ করত। তাই এপাশ টা বাপ্পি নিজের মতো ই রেখেছে। আমরাও আর পরিবর্তন করিনি। আমারও ভালো লাগে। এখন এদিক টা আমিই ইউজ করি বেশিরভাগ।
চলুন, আমরা ওপাশ টা-ই গিয়ে বসি।

মাহনূর পাশের উইংব্যাক চেয়ারে বসলো। সুতির একটা কুর্তি পরনে। সাদা কুর্তির সাথে কালো পায়জামা। গলায় স্কার্ফ ঝুলানো। চুলগুলো ক্লিপ দিয়ে আটকনাো। সম্ভবত সকালে চিরুনি লাগানো হয়নি। পাখির বাসার মতো ঝাঁগড়া হয়ে আছে।
তবে এতটুকু অগোছালো লাগছে না। কথায়, বেশভূষায় এতটুকু জড়তা নেই, ঢং নেই।
এই জেনারেশনে এমন এক পিস, কীভাবে? আপন মনে ভেবেই হেসে উঠলো বাঈজিদ।

নীরবতা ভেঙে মাহনূর বাঈজিদ কে উদ্দেশ্য করে বললো, আপনি বাপ্পির পরিচিত আমি জানি। আপনার কথা বাপ্পির কাছে শুনেছিলাম।

কিন্তু আপনি সেটা থানায় বললেন না কেন?

খুব হেয়ালি ভাবে উত্তর দিলো মাহনূর,এমনি।
মাথাটা সামান্য দুলে, কাত করে বলল। মাথার চেয়ে বেশি দুললো তাঁর কার্লি চুল।
বাঈজিদ নিজেই বুঝতে পারছে না, এই মেয়েটার প্রতিটি পলক সে এতো বেশি খেয়াল করছে কেন? অবশ্য তাঁর পেশায় এটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা অপরাধীর ক্ষেত্রে। জীবনে প্রথমবার কোনো মেয়ে কে এভাবে খেয়াল করছে। নিজের ভেতর কিছু একটা হচ্ছে। কিছু একটা.. কিন্তু কি সেটা বুঝে উঠতে পারছে না।
বাঈজিদের ৩৪ বছরের জীবনে এমন অনাসৃষ্টি কারবার কখনো ঘটেনি। নিজের উপরই বিরক্ত হলো বায়ঈজিদ!

মিনিট দুয়েক পরে, দিলরুবা হোসেন আসলেন। শুভেচ্ছা বিনিময় করে, বসলেন।

পোশাকে,ব্যক্তিত্বে আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট।
পরনে রুচিশীল পোশাক, সাজে কোনো বাড়তি চাকচিক্য নেই। বসার ভঙ্গিতেও দারুণ আত্মসংযম আর আত্ম-অহংকার। পরিপাটি করে বাঁধা চুল, মাথার ওপর দিয়ে টেনে রাখা অর্ধেক ওড়না।
বাড়াবাড়ি রকমের রূপবতী ছিলেন, সেটা স্পষ্ট। এই বয়সেও চোখে লাগার মতো রূপ। পোশাকে,আচরণে যথেষ্ট মডার্ন। কিন্তু চোখ জুড়ায় গভীর বিষণ্নতা, যা উনার চেহারা আর বেশভূষার সাথে একেবারে ই বেমানান ।
চোখের নিচে জমে থাকা কালচে ছাপ দেখে মনে হচ্ছে, বহু রাত ঘুমহীন কাটিয়েছেন । অথচ সেই ক্লান্তি তিনি যত্ন করে আড়াল করে রেখেছেন। আভিজাত্যের আবরণ ভেদ করে শুধু চোখ দুটোই যেন, অগোচরে কিছু একটা বলে যাচ্ছে।

কন্ঠের স্বতঃস্ফূর্ততা ছাড়া কথা বলছেন দিলরুবা হোসনে।
-রাকিবের ব্যাপার টা একটু দেখবেন স্যার। আমি কোনো ঝামেলা চায় না। তাছাড়া মেয়ে দুটো কে নিয়ে ভয় হয়। এদিক ওদিক যায়, অমন খারাপ ছেলেদের কুনজর পড়লে বিপদ, ভয় হয় ! আমার হাসব্যান্ড আমজাদ হোসেন সারাজীবন মানুষের পাশে থেকেছেন, মানুষের প্রতি সদয় ছিলেন, উনার প্রতি পুরো এলাকা বিনয়ী ছিলেন কিন্তু আজ উনি গত হতেই আমাদের পেছনে লেগে পড়লেন কিছু দুষ্ট চক্র।
এরকমটা আমি কখনোই ভাবিনি।
আমাদের অর্থবিত্তের অভাব নেই, যা আছে তা নিয়েই সন্তানগুলো মানুষ করতে চাই। প্লিজ এই
ব্যাপার টা দেখে, একটা সমাধান করে দিন। কৃতজ্ঞ থাকবো।
জ্বি আন্টি, চিন্তা করবেন না। অন্যায় কে আমরা কখনোই প্রশ্রয় দেবো না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, আমরা দেখছি ব্যাপার টা। বাঈজিদ কফির কাপ টা, কাঁচের টেবিলে রেখে আশ্বস্ত কন্ঠ বলল দিলরুবা হোসেন কে।

--------------------------------
মাহনূর এর ক্লাস শেষ হয় বিকাল তিন টায়। যেহেতু এখনো চতুর্থ বর্ষের ক্লাস পুরোদমে শুরু হয়নি,সেহেতু আজ ১২ টাতেই শেষ। সপ্তাহে তিন দিন ক্লাস থাকে।
রবি,মঙ্গল, বৃহস্পতি।
ভাদ্র মাসের এই সময়ে বেলা ১২ টা মানে প্রখর রোদ।
সেই রোদে ক্লাস থেকে বের হলো মাহনূর। ক্যাম্পাসের গাছপালায় ঘেরা পথটা পেরিয়ে, রাস্তায় উঠতেই রোদে চোখ আপনাআপনি ছোট হয়ে এলো। সূর্য যখন মাথার উপর চড়ে ডিগবাজি খেলছে,মেজাজ যখন প্রচন্ড ক্ষিপ্ত, ঠিক তখন সামনে এসে দাঁড়ালো -ওসি বাঈজিদ রহমান।
দুপাটি দাঁত বের করে খিলখিল করে হাসছে। পরনে মেরুন রঙের চেকের টিশার্ট। দুই বাহুর পেশি ফুলে স্পষ্টতা জানান দিচ্ছে।
মাহনূর হুট করে কি রিঅ্যাকশন দিবে, কি বলবে বুঝে উঠতে পারলো না। তাকে সেই হতবুদ্ধি থেকে বাঁচিয়ে দিয়ে বাঈজিদ বলল,-কার্লি বার্ড, কেমন আছেন?

-জ্বি ভালো, আপনি এখানে?
কলেজেও আসামি খুঁজেন নাকি!

-হুম ওরকমই কিছু। তারপর.. কি অবস্থা আপনার.. কার্লি ডল?

চোখ-মুখ শক্ত করে, ধীর-ঠান্ডা কন্ঠে মাহনূর প্রশ্ন করল, আপনি এতো রকম নাম কোথায় পান? আমাকে সিম্পলি মাহনূর ডাকবেন। শুধু মাহনূর, বুঝেছেন?

হেয়ালি ভঙ্গিতে বাঈজিদ বললো, ভেবে দেখবো নূর বেগম।

নূর বেগম? এটা কেমন নাম হ্যাঁ? নূর বেগম কে?

চকচকে সিলভার কালারের ব্রেসলেট পরা হাতটা দিয়ে, চুল পেছনে সরাতে সরাতে বললো -মাহনূর এর নূর। আর বেগম টা আমি ই যুক্ত করেছি!

মাহনূর প্রচণ্ড উত্তাপ থেকে বাঁচার চেষ্টায় ব্যাগ টা মাথার উপর রেখে, মেজাজ টা ঠান্ডা রেখে, শান্ত কন্ঠে বলল-লিসেন,আপনার বয়স আর পেশার সাথে এই ক্যারেক্টার টা ঠিক যায় না। কেমন যেন একটা বিহেভিয়ার, কাইন্ড অপ গায়ে পড়া স্বভাব! আপনার হওয়া উচিত-রাগী,গম্ভীর, রাশভারী গলার স্বর,কঠিন চোঁয়াল। সারাক্ষণ এমন ভ্যাঁ ভ্যাঁ,ফানি,জোকার টাইপ আচরণ টা ঠিক যায়না। বুঝেছেন? আসি আমি..।
কথাগুলো যতটা স্পিডে বলে শেষ করলো, ততটা স্পিডেই হন হন করে চলে গেলো।

ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি টেনে,বাঈজিদ মনে মনে বলল - আমি তো ওইরকমই কার্লি চুলের মেয়ে। তোমার ক্ষেত্রেই কেবল এমন দিশাহীন বেমানান বাক্য বেরিয়ে আসে। পূর্ণ যৌবন পেরিয়ে এসে, হেলে পড়া সূর্যের গায়ে, হঠাৎ একটুকরো ভোর হয়ে কেন আসলে?

কলেজ থেকে এসে রোজকার নিয়মে গোসল সেরে নিলো মাহনূর। তারপর ড্রয়িং রুমে অপেক্ষারত ম্যানেজার মুমিনের সাথে দেখা করতে গেলো।
কলেজ থেকে আসার পথেই মুমিন সাহেবকে কল দিয়ে আসার কথা জানিয়ে দিয়েছিল।
সাদিয়া কে দুই কাপ কফি দিতে বলে, ড্রয়িং রুমে বসলো।

আসসালামুয়ালাইকুম আঙ্কেল, কেমন আছেন?

আমি ভালো মা, তোমার কি খবর?

বেশ আছি আঙ্কেল। আঙ্কেল, বলেছিলেন হোটেলের জন্য কিছু নতুন কর্মী দরকার সেটা কি করলেন?

তোমার কথা মতো আমি বিজ্ঞাপন দিয়েছিলাম। ইতোমধ্যে বেশ কিছু সিভি জমা হয়েছে। তাছাড়া আগামী শনিবার বিডি জবস এর উদ্যোগে একটা জব ফেয়ার মেলা হচ্ছে। আমরা সেখানে অংশগ্রহন করেও দক্ষ কর্মী খোঁজে নিতে পারি। তারপর একদিন তোমার সময় মতো ভাইভা তে ডাকবো।

না,না আঙ্কেল। আমার দরকার নেই। আমি ওসবের কি বুঝি বলুন..। আপনি কয়েকজন কে সাথে নিয়ে একটা বোর্ড গঠন করে, ইন্টারভিউ নিয়ে নিন।

কিন্তু মা,তুমি তো বর্তমানে কোম্পানির এমডি। তোমাকে ছাড়া..।

আঙ্কেল আপনি আছেন নাহ? আপনার উপর নির্দ্বিধায় ভরসা করতে পারি। যেমনটা বাবা করতেন..। প্লিজ আঙ্কেল, আপনি আপনার মতো করে হ্যান্ডেল করুন।
চলবে..
পরবর্তী পর্ব পেতে মায়াবিনী -গল্পকথন এর সাথে থাকুন।

 #পর্ব -২'কুহু কুঞ্জ ' ভবনের  দুই তলার বারান্দায় বসে পত্রিকা পড়ছেন লতিফুর রহমান। পত্রিকার পাতায় মনোযোগ আছে কিনা বুঝা মুশ...
03/09/2026

#পর্ব -২
'কুহু কুঞ্জ ' ভবনের দুই তলার বারান্দায় বসে পত্রিকা পড়ছেন লতিফুর রহমান। পত্রিকার পাতায় মনোযোগ আছে কিনা বুঝা মুশকিল। কারণ তিনি কিছুক্ষণ পর পর আকাশের দিকে তাকান,দীর্ঘশ্বাস ফেলেন,মাথা হেলিয়ে চোখ বুজেন কখনো। সামনে রাখা চায়ের কাপে চুমুক দেন। তারপর অতি অনাগ্রহী মুখাবয়ব করে, কাপটা টেবিলে রেখে দেন। যেন চায়ের কাপের সাথে গোপন যুদ্ধ চলছে। স্নায়ু যুদ্ধ। মানুষ যখন নিজের ভেতরের কোনো একটা বিষয় মানতে পারেন না,যখন নিজের প্রতি প্রচন্ড রাগ ও হতাশা অনুভব করেন, তখন মানুষ জগতের সবকিছুর সাথে ই স্নায়ু যুদ্ধ করেন। মস্তিষ্কের যুদ্ধ, জগতের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ। ভেতর টা রক্তাক্ত হওয়ার যুদ্ধে, জয় অনিশ্চিত। পরাজয় টা-ই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শেষ ফলাফল।
লতিফুর রহমান আবারও পত্রিকায় চোখ রাখলেন। কয়েক মুহূর্ত পর হাতের কালো লেদারের ঘড়ির দিকে তাকান।।
কারো অপেক্ষা!
কিংবা সময়ের গতি খুব ধীর অনুভব করছেন তিনি।

জীবন টা এমনই। যখন সুসময় আসবে, সব ঠিকঠাক থাকবে, সময়ের গতি দ্রুত মনে হবে। আর যখন খারাপ সময় আসবে,একাকিত্বে ভুগবেন,অসুখে পড়বেন..মনে হবে সময়ের চেয়ে ধীর আর কিছু নেই।
লতিফুর রহমান চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন আট মাস আগে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। সারাজীবন চাকরি, সংসার আর লেখালেখি তে সময় দিয়েছেন। জীবনের তাগিদে ছুটেছেন বিরামহীন। একটা সময় অপেক্ষা করতেন অবসর বয়সটুকুর জন্য। ছেলের কাঁধে সব দায়িত্ব বুঝিয়ে, নিজেকে শান্তি তে রাখার বড় অপেক্ষা ছিলো, শেষ কয়েক বছর ধরে। তারপর সেই কাঙ্ক্ষিত সময় আসলো। কিন্তু জীবনের প্রতি এতো বিতৃষ্ণা আসবে কে জানত!
পত্রিকা টা রেখে এবার একটা বই হাতে তোলে নিলেন। পাওলো কোয়েলহোর লেখা দ্যা অ্যালকেমিস্ট বই। অনেক বছর আগে একবার পড়েছিলেন, আজ আবার নতুন এক অনুবাদকের বই হাতে নিলেন। ভদ্রলোক গল্পটার চমৎকার বাংলা অনুবাদ করেছেন। পড়ার আগ্রহ ই বেড়ে যায় বহুগুণ।

লতিফুর রহমানের আজকাল সময় কাটে বই-পত্র পড়ে। লেখালেখি করতেন তরুণ বয়স থেকে ই। বছর দুয়েক পর পর একটা দুটো বই বের করেন। বড় ছেলে বাঈজিদের এ-ই বিষয়ে আগ্রহ টা সবচেয়ে বেশি। লতিফুর রহমান নিজের ভালো লাগা থেকে লেখেন আর বাঈজিদ নিজের ভালো লাগা থেকে সেই লেখা প্রকাশের চেষ্টা করে। লতিফুর রহমানের এক ছেলে,এক মেয়ে। মেয়ে 'মিশু রহমান' ঢাকা ভার্সিটিতে পড়ে। হলে ই থাকে । ছেলের পোস্টিং কক্সবাজার সদর মডেল থানায়। ছেলের এই ফ্ল্যাটে
উঠেছেন চার মাস হতে চললো । ভাড়া বাসা। ছিমছাম দুই রুমের একটা বাসা। এই বাসার সবচেযে আকর্ষণীয় দিক হলো দক্ষিণের বারান্দা টা। লম্বা বারান্দাটার সামনেই বিমানবন্দর। খোলা মাঠ। কাশফুল ফুটে সাদা হয়ে আছে চারপাশ। আকাশ টা খুব সুন্দর দেখা যায়। শহরে সাধারণত, বারান্দা দিয়ে তাকালেই পর পর বিল্ডিং চোখে পড়ে । কিন্তু এই বারান্দা দিয়ে যতদূর চোখ যায়,শুধু প্রকৃতি। দূরের ঝাউবন টা ও স্পষ্ট। হুড়মুড়িয়ে বাতাস ঢুকে সারাদিন।
ছুটা বোয়া আসে দিনে দুই বার। বাকি কাজ বাবা-ছেলে করে নেয়। রান্না বান্নায় বাবার চেয়ে ছেলে বেশ এক্সপার্ট।
ঢাকার উত্তরায় একটা নিজস্ব ফ্ল্যাট আছে। সারাজীবনের সঞ্চিত অর্থে ফ্ল্যাট টা কিনেছেন। স্ত্রী 'খাদিজা রহমান' গত হয়েছেন আজ ৬ মাস হলো। হুট করে স্ত্রী'র চলে যাওয়ার ব্যাপারটা ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছে লতিফুর রহমান কে। সারাজীবন সংসারের টানাপোড়েন আর চাকরির পেছনে ছুটেছেন। মধ্যবিত্ত একজন স্কুল মাস্টারের সাধ থাকলেও সাধ্য থাকে না। স্ত্রী র শখ-আহ্লাদ পূরণের চিন্তা করার অবকাশটুকুও পাননি কখনো। আর্থিক স্বচ্ছলতা বা সময় কোনো টা-ই হয়ে উঠেনি। আর যখন অবসর নিলেন, ছেলে-মেয়ে বড় হল,সুখের সময় আসলো তখন একা করে দিয়ে স্ত্রী চলে গেলেন। বড় আফসোস হয় লতিফুর রহমানের। একটা বিকেলের, একটা নীল সমুদ্রের, একটা পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা গোধূলির জন্য আফসোস হয়।
সময়কে যদি পেছনে নেওয়া যেতো, লতিফুর রহমান তাঁর স্ত্রী র সাথে ভালো সময়গুলো কাটিয়ে আসতেন। সংসারের গল্পের বাইরে গিয়ে কিছু স্মৃতি, কিছু গল্প জমাতেন। একান্ত নিজেদের গল্প।
পয়ত্রিশ বছর, চার মাস, চৌদ্দ দিনের সংসার জীবনে কখনো মানুষ টা'র পছন্দের জিনিসের নাম জিজ্ঞেস করা হয়নি। কি তাঁর পছন্দ, কিসে তাঁর শখ..কিছু ই না। অথচ মানুষ টা নিয়ম করে, প্রতি বেলায় জিজ্ঞেস করতো- আজ কি রান্না করবো? চা দেবো? ঘুম হয়েছে? তোমার ওষুধ টা শেষ, নিয়ে এসো।

মেয়ের মোড অফ , ছেলের মেজাজ চওড়া, গ্যাস বিল দিতে হবে, গ্রাম থেকে কল এসেছিল..সব খবর দিতো খাদিজা।
শুধু নিজের খবর টা কখনো বললো না! তাঁর কি কোনো খবর কোনো কালেই ছিলো না?
আমাদের বাঙালি সমাজে মেয়েদের সংসার শুরু হয় সকালে রান্নাঘর দিয়ে। শেষ হয় বিছানায় এলিয়ে দেওয়া ক্লান্ত শরীরে। এই একই নিয়ম বহুবছর ধরে চলতে থাকে। তারপর মেয়েটা একটু একটু করে ভুলে বসে; তাঁর পছন্দের খাবারের নাম, ভালো লাগার কথা, শখের কথা, ইচ্ছার কথা..সব।

আমরা ভাবি সংসার টানে পুরুষ। ভুল কথা। সংসার টানে নারী।

পুরুষের শার্টের ছেঁড়া বোতাম,কলারে লাগা দাগ,খাবারের টেবিলে ঝকঝকে গ্লাস, চাবির গোছা, ওয়ালেট টা ঠিকঠাক জায়গায় রাখা , ভেজা তোয়ালের শুকনো কড়কড়ে গন্ধ..এই সবকিছু টানেন একজন নারী। তেল-মসলার পরিমাণের দিকে রোজ খেয়াল রাখা মেয়েটা, পুরুষের পছন্দের খাবারের হিসাব রাখা মেয়েটা, বিছানার ভাঁজে স্বপ্ন লুকোনো মেয়েটির চেয়ে বেশি প্রতিদান কার এই সংসারে?

লতিফুর রহমান স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে এসব ছোট কাটো বিষয় নিয়ে গভীর ভাবে ভাবছেন। যতই ভাবছেন স্ত্রীর শূন্যতা ক্রমশ বাড়ছে চারপাশে। গভীর রাতে মানুষ টা কে হাতড়ে বেড়ান, নেই। কোথাও নেই।

মনে পড়ে -খাদিজা বিয়ের কয়েক বছর পর একটা জামদানী শাড়ি চেয়েছিল।
বলেছিলাম, এনে দিবো। পরের মাসের বেতন টা পেলে দিবো। সেই মাসে মায়ের অসুখ টা বাড়ল। কিনে দেওয়া হলো না। তারপরের মাসে বাড়িতে অনেক মেহমান পড়ে,খরচ বেশি হওয়ায় কিনে দেওয়া হয়নি। তার পরের মাসে বাঈজিদের জন্ম,এবারেও কিনে দেওয়া হয়নি। তারপর জামদানী শাড়ির কথা ভুলেই যান লতিফুর রহমান। খাদিজাও আর কখনো বলেনি।

অভিমানে বলেনি। অথবা পড়ার আর শখ ছিলো ই না। মানুষের শখ একসময় মরে যায়। মরা অবস্থায়ও থাকে কিছু দিন। তারপর গাছের মরা পাতাটার মতো ঝরে পড়ে নিঃশব্দে। সেই পড়ে যাওয়ার খবর গাছ ঠিকই জানে,জানে না আশেপাশের মানুষ।
খাদিজার একটা চেইন ছিলো। তারা ফুল বসানো চেইন। গলায় দিলে খুব সুন্দর লাগতো। খাদিজার গলাটা ছিলো ভাঁজ ভাঁজ। গলায় চেইন টা চকচক করতো। টান টান ফর্সা ত্বকের গলায় বড় সুন্দর দেখাত। একটা ব্যবসায়ে মূলধন দেওয়ার জন্য বিক্রি করে দিই। ব্যবসাটা গেলো, চেইন টাও গেলো। খালি গলা টা আমার সামনে রইলো। বছরের পর পর ঐ শূন্য গলায় খাদিজা হাত দিয়ে বলতো, এই গলায় কি আর কখনো চেইন দিতে পারবো না। আমি আশ্বাস দিয়ে বলতাম,পারবে।
বছর চারেক আগে একটা চেইন কিনে দিয়েছিলাম। আগের চেয়ে মোটা,সুন্দর ডিজাইন। কিন্তু খাদিজা পড়লো না। একবার দেখে আলমারিতে তোলে রাখল। বলল-গলার চামড়া ঝুলে গেছে, ভালো লাগবে না। এই বয়সে এসন অলংকার পড়ার কি আছে বলেন? রেখে দিই, ছেলের বউকে দেবো।
মূলত, খাদিজার ইচ্ছা ততদিনে মরে গেছে।
মানুষ বৃদ্ধ হলেও,শরীরের চামড়া ঝুলে পড়লেও শখ থাকলে সব ইচ্ছা করে। মনের মৃত্যু না হলে,মানুষ নিজেকে সাজাতে কখনোই ইতস্তত করবে না। বয়স সংখ্যা মাত্র, যদি মন টা তাজা থাকে। কিন্তু যার মন টা ধীরে ধীরে মরে যায়,বয়স তাকে খুব সহজে কাবু করতে পারে। তারপর শরীর আর বয়সের দ্বন্দ্বে বাসা বাঁধে অসুখ। মানসিক ভাবে দূর্বল মানুষ টা তখন সেই অসুখের কাছেও পরাজয় মেনে নেয়।

লতিফুর রহমানের মানসিক পরিস্থিতি দেখে,বাঈজিদ বাবাকে একা ফ্ল্যাটে রেখে আসার সাহস পাচ্ছিল না। নিজেরও চাকরিতে ফিরতে হতো। শেষ পর্যন্ত বাবাকে কক্সবাজার সঙ্গে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। নতুন পরিবেশ, নতুন জীবনে হয়তো আরেকটু স্বাভাবিক থাকবে। ছোট বোন মিশু র সামনে সেমিস্টার ফাইনাল। তাই ওকে বাসায় এসে, বাবার সাথে থাকার কথা টা বাঈজিদ এড়িয়ে গেছে।
-------------------------------
বাঈজিদ নিজে বসে থেকে ডিউটি অফিসার কে জিডি লিখতে বললেন। মাহনূরের বলা মৌখিক অভিযোগ টি দ্রুত সময়ের মধ্যে শেষ করলেন ডিউটি অফিসার।
বাঈজিদ সবকিছু মনোযোগ দিয়ে শুনলেন।
তারপর জিডির নম্বর ও অভিযোগের কাগজটি একবার দেখে নিলেন।
মাহনূরের দিকে ফিরে বললেন-আপনারা আপাতত কাউকে উত্তেজিত করবেন না। ওরা মোটেও সুবিধার না, খারাপ কিছু হতে পারে। সাবধানে পদক্ষেপ নিতে হবে। ওদের সঙ্গে নিজেরা ঝামেলায় যাবেন না কোনো ভাবেই । আপনারা যেসব জিনিসের প্রমাণ রাখতে পারেন, সেগুলো সংরক্ষণ করবেন। জানালায় কিছু ছুড়ে মারলে সেটা পরিষ্কার করার আগে ছবি তুলে রাখবেন। অথবা ভিডিও করবেন। সম্ভব হলে আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করবেন। আর পুরো বিষয়টা আমি..,মানে আমরা দেখছি। আপনি বড় আর সাহসী সেজে কিছু করতে যাবেন না। সব বিষয়ে বড় হতে নেই, বুঝলেন কানিং গার্ল?

-কানিং গার্ল? আমি..? আপনি এটা কেন বললেন? এতোক্ষণ আমি আপনাকে ভালো মানুষ ভাবতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু আপনি..

-কী আমি? ট্রু ক্লেভার গার্ল!

-আপনি সত্যি ই খুব খারাপ। আপনি এতো বড় দায়িত্ব পেলেন কীভাবে? আজব! চুলের একটা গোছায় আঙ্গুল পেঁচিয়ে, চোখ কটমট করে বলে যাচ্ছে মাহনূর। কন্ঠ অত্যন্ত শান্ত কিন্তু থুতনি কাপছে রাগে।
বাঈজিদ শান্ত সরে বলল,-কুল, ইউ আর টু মাচ বোল্ড অ্যান্ড স্ট্রং গার্ল। যাস্ট রিলাক্স। মজা করছিলাম। সরি...হ্যাঁ?

কোনো উত্তর না দিয়ে উঠে দাঁড়াল মাহনূর।

বাঈজিদ বললো, শুনুন-আগামী কাল এসআই আর দু'জন কনস্টেবল যাবেন ঘটনাস্থলে। পুরো বিষয় টা তদন্ত করবেন,এবং কিছু প্রত্যক্ষ দর্শীর সাক্ষী নিবেন।

পরদিন থানা থেকে পুলিশ এসেছে শুনে,বেরিয়ে আসল মাহনূর। সে অপেক্ষা করছিল সকাল থেকেই।
তাদের সাথে ওসি বাঈজিদ কে আসতে দেখে কিছু টা অবাক হলো মাহনূর। মনে মনে ভাবল, যতটা ভেবেছিলাম অতটাও কেয়ারলেস না ব্যাটা। চাকরির প্রতি সৎ আছে তাহলে! নিজে চলে আসলো, বাহ।

প্রথমে পুলিশ বাড়ির চারপাশটা ঘুরে দেখলেন। জানালার নিচে পড়ে থাকা নোংরা জিনিস, ভাঙা বোতল আর আবর্জনার কয়েকটি নমুনা দেখে ছবি তুললেন। বাড়ির ভাড়াটেদের সঙ্গেও আলাদাভাবে কথা বললেন বাঈজিদ।
একজন ভাড়াটে বললেন,
-স্যার, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে রাত হলেই ওরা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে নোংরা ভাবে হাসি ঠাট্টা করে। মাঝে মাঝে জানালায় ঢিলও ছুড়ে মারে। বাচ্চাগুলো ভয় পায়। তাছাড়া সুস্থ পরিবেশও বিঘ্নিত হচ্ছে।
এসআই তাঁর নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর লিখে নিলেন। আরও দুজন ভাড়াটের বক্তব্যও নিলেন।
এরপর তিনি মাহনূরকে জিজ্ঞেস করলেন,
-আপনাদের কাছে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ আছে?
মাহনূর বলল, গেটের সামনে আর পাশের গলির একটা ক্যামেরা আছে। ফুটেজ বের করে দিতে পারব।
-গুড,সবগুলো কপি করে রাখবেন। বিশেষ করে যেদিন ওরা এসেছিল, সেদিনের ফুটেজ যেন মুছে না যায়। তাদের পরবর্তী প্রতিটি স্টেপ রেকর্ড রাখার চেষ্টা করবেন। সিসি ক্যামেরা কাভার না করলে,প্রয়োজনে ভিডিও করবেন।
তদন্তকারী কনস্টেবল দু'জন আশপাশের কয়েকজন দোকানদার ও প্রতিবেশীর সঙ্গেও কথা বললেন। তাঁদের কেউ কেউ জানালেন, কয়েকজন যুবক নিয়মিত ওই বাড়ির সামনে জড়ো হয় এবং বাড়ির মালিককে জায়গাটি ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে।
বিশেষ করে, মালিক পক্ষের কোনো পুরুষ না থাকায় বেশি সুযোগ নিচ্ছে তাঁরা। তাছাড়া তাঁরা এভাবে আরো অনেকের জায়গা অন্যায়ভাবে জোর-জবরদস্তি এবং হুমকির মাধ্যমে দখল নিয়েছে। এই মাহনূর মেয়েটা সাহসী আছে। তবে তাঁর জন্য ভয় হয়।
ফিরে আসার আগে মাহনূর বললো, স্যার বাসায় আসুন। এক কাপ চা খেয়ে যাবেন। মা খুশী হবেন।
এক মিনিট কি যেন ভাবলো বাঈজিদ। তারপর বললো চলুন।
ড্রয়িং রুমে ঢুকে দেয়ালে টাঙানো বড় ছবি টি দেখে অবাক হয়ে গেলো বাঈজদি।
মাহনূর তাহলে..। চলবে..
পরবর্তী পর্ব পেতে মায়াবিনী -গল্পকথন পেইজের সাথে থাকুন।

#গল্প : #বেলা-অবেলায়
লেখক: কুলচুমা ইয়াছমিন কনা

02/09/2026

বেলা ১১টা। থানার সামনে বসে আছে কার্লি চুলের একটা মেয়ে। হাতে ফ্রেস পানির বোতল। পানির পরিমাণ তলানির দুই আঙুল উপরে। দিনের এই ভাগে ভাদ্র মাসের উত্তপ্ত গরম কিছু টা বেড়ে যায়। সকাল টা হালকা শীতলতা দিয়ে শুরু হলেও, বেলা বাড়তেই উষ্ণতা বাড়ে। মেয়েটা ক্ষণে ক্ষণে কপালের ঘাম মুছছে একই টিস্যুর পৌনঃ ব্যবহারের মাধ্যমে । চোখে-মুখে বিরক্তির চিহ্ন নেই।
পাড়ার কিছু বদমাশ ছেলেপুলের নামে জিডি করতে এসেছে । বিস্তারিত শুনে কনেস্টবল 'ফারুক ' কয়েক পলক আপাদমস্তক দেখে নিলেন মেয়েটা কে । তারপর হাই তোলে, ঠান্ডা হওয়া চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললেন, অপেক্ষা করতে। মেয়েটি বিনাবাক্যে উঠে আসে, যেন অপেক্ষা করার কথাটা সে আগেই ধরে নিয়েছে; একজন মেয়ে যদি পাড়ার মাস্তান ছেলেপুলেদের বিরুদ্ধে মামলা করতে আসে,ব্যাপারটা স্বাভাবিক ভাবে আগাবে না জানা কথা। তাছাড়া বাংলাদেশে জনগণের সেবায় নিয়োজিত কোনো সার্ভিস ই হুট করে পাওয়া যায় না। এই দেশে সরকারি সব সহায়তা আসে ঘুরিয়ে পেছিয়ে। কচ্ছপের গতিতে। তাও টাকার জোরে। অর্থ আর ক্ষমতার জোর দিয়ে মূল্যায়ন হবে আপনি কতটুকু সহায়তা পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু বড় বড় হেডলাইনে লেখা থাকে,জনগণের সেবায় নিয়োজিত!

পেটে ইদুর দৌড় শুরু হয়েছে। এখনো পর্যন্ত পেটে পানি ছাড়া কিছুই পড়েনি। দুপুরের খাবারটুকু ঠিক সময়ে জুটলেই হলো। সকালের প্রথম কাজ ছিলো কোচিং এ ক্লাস নেওয়া । সকাল ৭-৯ টা পর্যন্ত ইংরেজি ক্লাস নেয়। তারপর গিয়েছিল মেয়রের কাছে। দেখা পায়নি,উনাদের সাথে দেখা করার আবার লম্বা সিডিউল থাকে কিনা! মেয়েটি তাঁর যথাযথ পরিচয় দিলে অবশ্য এতোটাও কঠিন হতো না। তবে পরিচয় দিয়ে সাহায্য নেওয়ার ব্যাপার টা তাঁর খুব একটা প্রয়োজন মনে হয়নি
তারপর সেখান থেকে বেরিয়ে, এসেছে, সোজা থানায়। মাঝখানে রাস্তার জ্যামে আঁটকে ছিলো টানা ৪০ মিনিট । তাতেও এই মেয়ের বিরক্তি নেই। জ্যামে আঁটকে থাকা সময়ে তাঁর করা কয়েকটি কাজের নমুনা দিই;পত্রিকা পড়েছে ১০-১৫ মিনিট মতো। ডাইরিতে কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য টুকে নিয়েছে। রাস্তার দক্ষিণ পাশে বটতলার নিচে বসে ছিলো এক ভিক্ষুক, একটা পা নেই। উনাকে কিছু খাবার কিনে দিয়েছে। তারপর এক সাহেবের সাথে ঝগড়া করেছে কয়েক মিনিট।
ঝগড়া কেন করলো? ঐ সাহেব তাঁর গাড়ি নিয়ে, সামনের রিক্সায় তাগাদা দিয়ে দিয়ে বিরক্ত করছিল। এ-ই লম্বা জটে বেচারা রিক্সাওয়ালার কিছু ই করার নেই, তবুও সে কাচুমাচু করছিল ভয়ে।
যে ই মেয়ে শহরের ব্যস্ত জ্যামের ফাঁকে এতো কাজ সেরে নেয়, তাঁর বিরক্তি আসার প্রশ্ন নিশ্চয় মাথা থেকে উবে গেছে?
আজকালকার অস্থির জেনারেশনে এমন ধৈর্য্যশীল একজনের সম্পর্কে জানতে কেমন বোধ করছেন আপনারা?

চলুন মেয়েটির সম্পর্কে জেনে আসা যাক-
আমাদের এই ভিন্ন ধর্মী চরিত্রের নাম মাহনূর। 'মাহনূর' শব্দের অর্থ চাঁদের আলো। মাহনূরের বাবা আমজাদ হোসেন বলতেন, 'মাহনূর' এর জন্মের পরপর চাঁদ তার আলো ফিরে পেয়েছিল,তাই এই নাম রেখেছিলেন। সময় টা ২০০৪ সালের ৫ মে, রাত আনুমানিক ১.৫২ মিনিটে চন্দ্রগ্রহণ শুরু হয়। চাঁদ তার রুপালী আলো হারিয়ে ধীরে ধীরে তামাটে-লাল বর্ণ ধারণ করে।
চারপাশ নিস্তব্ধ,ভারি। মফস্বল শহরের রাস্তায় মাঝে মাঝে কয়েকটা গাড়ির শব্দ ছাড়া খুব বেশি কিছু ছিলো না। নিশাচর পাখি আর কুকুরের ডাক অদ্ভুত এক রেখা ধরে একসঙ্গে ডাকছিলো। মা দিলরুবা হোসেন প্রসব বেদনায় কাতর। হাসপাতালের করিডোরে পায়চারী করছেন বাবা আমজাদ হোসেন। রাত ২ টা ৩০ মিনিট, গ্রহণ ছিলো সর্বোচ্চ পর্যায়ে। চাঁদ তখন পৃথিবীর ছায়ার সর্বোচ্চ গভীরে। সময় টা ধীরে গড়ালো, চারপাশের পরিবেশ ক্রমাগত ভারি হচ্ছিল..। তারপর, সমস্ত নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করে, নির্দিষ্ট প্রসূতি কক্ষ থেকে ভেসে এলো একটা শিশুর রিনরিনে কান্নার শব্দ। রাত তখন ৩ টা ৫ মিনিট। আমজাদ হোসেন ছুটে গেলেন নির্দিষ্ট কক্ষের দিকে। বহুল প্রত্যাশিত খবরে যখন খুশির ঝলক, ঠিক তখন ঝলমলে পূর্ণিমার আলো করিডোরে প্রতিফলিত হল। ঠিক ৩ টা ০৮ মিনিটে পূর্ণগ্রহণ শেষ হলো। নার্স শিশুটিকে বাবার কোলে তোলে দিলেন। শিশুটির কপালে পূর্নিমার আলো খেলা করছে। আমজাদ হোসেন মুগ্ধ হলেন। ছোট্ট সুন্দর পুতুলের মতো মুখটা সেদিন তাঁর কাছে মনে হয়েছিল, একটুকরো চাঁদ। সেই চাঁদ আর আকাশের চাঁদ বারবার দেখলেন তিনি। তারপর আজান দিয়ে, মেয়ের নাম রাখলেন 'মাহনূর'(চাঁদের আলো)।
আমজাদ হোসেন কক্সবাজার শহরের প্রথম সারির ধনীদের মধ্যে একজন। হোটেল, রেস্তোরাঁর রমরমা ব্যবসা। এছাড়াও রয়েছে একটা হাসপাতাল, একাধিক বহুতল ভবন। কক্সবাজার এলাকা টা রেস্টুরেন্ট আর হোটেলের ব্যবসার জন্য দারুণ সাফল্যের। একেবারে সোনার ডিম পাড়া হাঁস। একবার শুরু করতে পারলে, দক্ষ পরিচালনা দিয়ে বহুদূর যেতে পারবেন। আমজাদ হোসেন ও তাদের মধ্যে একজন। তাঁর শুরু টা ছিলো ভাতের হোটেল
দিয়ে। কিন্তু শেষ টা পরবর্তী তিন প্রজন্ম ভোগ করেও শেষ করতে পারবে না। আমজাদ হোসেন ভীষণ কর্মঠ আর সৎ মানুষ ছিলেন। শহরের নাম করা ব্যবসায়ী হওয়ার পরও তিনি নিজের ফ্যাশন থেকে সরে যাননি কখনো। তিনি একটা কলেজের গণিতের অধ্যাপক ছিলেন। জীবনে কখনো একটা ক্লাসও মিস করতেন না। ক্লাস নেওয়া, ব্যবসা,ঘর.. সব তিনি সমান তালে সামলাতেন। তিনি দিন শুরু করতেন ভোর ৫ টায়। আর বিরতি নিতেন রাত ১২ টা কিংবা তার-ও পর। সেই ছুটাছুটি শরীর হয়তো আর নিতে পারেনি। তাই অল্প বয়সে হুট করে একদিন চলে গেলেন হার্ট এট্যাকে। আর বাড়ির বড় মেয়ে হিসেবে সব ভার হুড়মুড়িয়ে পড়ল আমাদের কার্লি চুলের মেয়ে মাহনূর এর উপর । তাঁর ইচ্ছায় হোক কিংবা অনিচ্ছায়, এই দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ মাহনূর এর ছিলো না। মাহনূর দায়িত্ব কে গ্রহণ করেনি,বরং
দায়িত্ব মাহিনূর কে গ্রহন করেছে।
এ-ই পর্যায়ে আমার মাহিনূরের প্রতি ক্ষানিকটা মায়া হচ্ছে। কারণ অনার্স তৃতীয় বর্ষে পড়া একটা মেয়ের জন্য, দায়িত্ব গুলো একটু ভারি ই হয়েছে। বাড়িতে মা এবং ছোট দুই ভাই-বোন। ভাই (মাহির)এইচএসসি পরীক্ষার্থী। আর বোন(মাহরাজ)দশম শ্রেণিতে পড়ে।

দায়িত্ব আর ফ্যাশন দুটোই বাবার মতো একসাথে ব্যালেন্স করে চলেছে মাহনূর। এই মাহনূর সম্পর্কে যত জানবেন তত বিরক্ত হবেন আপনারা। মনে হবে এটা কি মেয়ে? আর দশটা সাধারণ মেয়ের প্রতিচ্ছবি খুব একটা পাবেন না এই মেয়ের মধ্যে। এমন রোবোটিক মেয়ের স্টোরি পড়তে কার ভালো লাগে বলেন?
ম্যাচিউরড, র‍্যাশনাল, ডাউন টু আর্থ টাইপ বলা যায়।
অন্যের কাছে প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট এর আশায় বসে থাকার মতো চরিত্র না। আজ-কাল মেয়েরা নিজেরে কুইন ট্রিটমেন্ট দিতে পছন্দ করে। সেখানে এই মেয়ে নিজেরে খাটাইতে পছন্দ করে। মাসে কয়েকবার পার্লারে যাওয়া, সপ্তাহ সপ্তাহ শপিং এ যাওয়া, সোশ্যাল মিডিয়ায় এক্টিভিটি ঘন্টায় ঘন্টায় জানান দেওয়া এসব তাঁর স্বভাবের ধারে কাছেও নেই।
আধিক্যেতা,বোকাসোকা ভাব, লজ্জা এসব খুব কম বলা যায়। বুঝেন তবে কতটা বোরিং চরিত্রের মেয়ে।

গল্পে ফিরে আসা যাক।
মাহনূর পানির বোতল টা ডাস্টবিনে রেখে, আরেকবার থানার ভেতরে গেল। কনস্টেবল ' ফারুক ' মোবাইলে কিছু একটা গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখছেন আর হাসছেন।
"স্যার, ডিউটি অফিসার এসেছেন? আমার একটু তাড়া ছিল। "
কনস্টেবল মাহনূর এর কথা শুনলো কিনা বুঝা গেলো না। আগের অবস্থাতেই আছেন। মাহনূর এবার কিছু টা উঁচু কন্ঠে ডাকল,স্যার..।
কনস্টেবল বিরক্তি-মাখা মুখে, বড় বড় চোখ করে মাহনূর কে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল; ঠিক সে সময় কনস্টেবল এর কাঁধে জোরে হাতের ছাপড় দিলেন অফিসার ইনচার্জ 'বাঈজিদ রহমান '। তারপর সামনের মেয়েটির দিকে চেয়ে বলল,"তুমি কি কোনো কাজে এসেছো?"
মাহনূর মনে মনে বেশ বিরক্ত হল। কেউ অচেনা কাউকে শুরুতেই তুমি সম্বোধন কীভাবে করে? আজব! লোকটা ঠিক কোন পদে আছেন বুঝার চেষ্টা করল মাহনূর-কাঁধের ব্যাজে তিনটা তারকা, ডান পাশে নেমপ্লেটে লেখা 'বাঈজিদ রহমান '।
খুব একটা বুঝে উঠতে না পারলেও নামটা তাঁর চেনা।
মানে তিনি কক্সবাজার সদর থানার ওসি বাঈজিদ। উনার কথা বাবার কাছে কয়েকবার শুনেছে। কয়েকবার নিউজেও দেখেছে। কপালের ঠিক মাঝখানে একটা কালো দাগ ব্যতীত পুরো চেহারা নিঁখুত। কালো দাগটাও দেখতে বেমানান মনে হয় না। যেন ঐ দাগটা এই চেহারার সাথে একেবারে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ঠোঁটের কোণে কৌতুক মাখা হাসি। কিন্তু চেহেরার অবয়ব টা গাম্ভীর্যে ভরা। আচ্ছা এরকম কীভাবে হয়? একজন মানুষের ঠোঁটে হাসি অথচ চেহারা জুড়ে গাম্ভীর্যের ছড়াছড়ি।
দুই জোড়া ভ্রু কুঞ্জিত করে মাহনূর কে কিছু বলতে গেল বাঈজিদ,হাত আর ঠোঁট ফাঁক করেও বলল না বাঈজিদ। সোজা কনস্টেবল ফারুকের দিকে ঘোরে জিজ্ঞেস করলেন, কী চান উনি?
অকস্মাৎ ঘটনায় একটু বিব্রত বোধ করলেও, হজম করে নিল মাহনূর।
"স্যার উনি জিডি করতে এসেছেন। ছাত্রদলের রাকিব আর তাঁর ছেলেপুলেদের বিরুদ্ধে।"
ফারুকের কথা শেষ হলে,মাহনূর কে প্রশ্ন করল," রাকিবের সাথে কিসের সমস্যা তোমার? জিডি করতে এসেছো, কিন্তু একা কেন? বাড়ির বড় কাওকে নিয়ে আসতে! তুমি ছোট মানুষ, এসব একা একা করার মতো কাজ না। তাছাড়া জিডি করার পর তারা তোমাকে আরো বেশি বিরক্ত করতে পারে।ব্যাপার টা বড়দের মাধ্যমে সমাধান করার চেষ্টা কর।ওদের সাথে লাগতে যাওয়া ঠিক না। অথবা বাবা-মা কাওকে নিয়ে এসো। যাও..।"
বাঈজিদের কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে মুখ খুলল মাহনূর। শান্ত কিন্তু রাগ মেশানো কণ্ঠস্বর - সরি স্যার, আপনার কথা মতো চলে যেতে পারবো না। আমি জানতাম রাকিবের বিরুদ্ধে কোনো স্টেপ নেওয়ার ক্ষমতা আপনাদের নেই। আমার বাবা-মা কেউ আসতে পারবে না। আমি এই দেশের নাগরিক। নাগরিক সুবিধা পাওয়ার অধিকার আমারও আছে। আর আপনি আমাকে বারবার ছোট বলছেন কেন? আমি যথেষ্ট এডাল্ট। আর একটা কথা, আপনি ভেবেছেন,রাকিব আমাকে ডিস্টার্ব করে। সেই সাহস রাকিবের কেন, তাঁর বাপেরও নেই। আপনারা সব মেয়েকে অবলা ভাবতে এতো পছন্দ করেন কেন? রাকিব আমার সাথে লাগলে তাঁর শাস্তি আমি ঘরে বসেই দিয়ে দিতাম। সমস্যা অন্য জায়গায়। রাকিব
আমাদের একটা ভবনের সীমানা নিয়ে ঝামেলা করছে। অন্যায় ভাবে দখল করতে চাই। গতকাল ছেলেপুলে নিয়ে, ভাড়াটিয়াদের জানালা দিয়ে নোংরা আবর্জনা, মূত্র ছুড়ে মেরেছে। এই কাজ পরপর কয়েকবার করেছে। সে চাই ভাড়াটিয়া রা চলে যাক। তারপর সে দখল নিবে। আপনি পুরো বিষয় টা তদারকি করে সাবধান করুণ প্লিজ।

মাহনূর একটানা কথা বলে থামতেই, এক গ্লাস জল এগিয়ে দিল বাঈজিদ। এতক্ষণ মেয়েটির প্রতিটি কথা যেমন মনোযোগ দিয়ে শুনেছে, তেমনি মুগ্ধ হয়েছে। এই মেয়ের সাহস আর জেদ আছে বলতে হবে।

আমি নিশ্চয় তোমাকে সাহায্য করবো। কিন্তু বাড়ির বড় কাওকে নিয়ে আসলে ভালো হতো না?

বড় কেউ না থাকলে কীভাবে আনবো? বাবা নেই। মা অসুস্থ। আমি বাড়ির বড়। ছোট দুজন ভাই বোন আছে। তাছাড়া আমি এর চেয়ে কঠিন কাজ সামলাচ্ছি আরো দুই বছর আগে থেকে। আমাকে অতটাও ছোট ভাববেন না। আমার অনার্স তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষা শেষ হলো। আগামী মাসে চতুর্থ বর্ষের ক্লাস শুরু।

বাঈজিদ হাসি চেপে একটু চওড়া গলায় বললো, " ওহহো.. আপনি তো তাহলে ছোট না। আমার ভুল হয়েছে কিছু টা। তুমি শব্দ টা আপনার পছন্দ হচ্ছে না বুঝতে পারছি। দায়িত্ব আপনাকে সময়ের আগে বড় করে দিয়েছে। তাই আপনি নিজেকে বড় ভাবতেই অভ্যস্ত।
কিন্তু আপনি অতটাও বড় হননি।
তবে, আপনার সমস্যা টা আমি সমাধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো। "

মাহনূর সন্তুষ্ট হলো কিনা বুঝা গেলো না। ক্যাসের খুলে যাওয়া ফিতা ঠিকা করার বৃথা চেষ্টা করে যাচ্ছে। চোখে-মুখে বিরক্তি।
যেই মেয়ে এতক্ষণ এতোটা ম্যাচিউরড আচরণ করলো, সে কিনা ঠিকঠাক মতো জুতার ফিতা বাঁধতে জানে না?

বাঈজিদ একটু কটাক্ষ করে বলল," কি হলো বড় মেয়ে? আসেন আপনার অভিযোগ টা লিখি। আপনি বড় হয়ে গেলেন অথচ জুতার ফিতা বাঁধতে শেখেননি?"
জুতায় হাত রেখে, ওই অবস্থায় মাথা কিছু টা উপরে তুলে উত্তর দিলো মাহনূর," কিছু মনে করবেন না স্যার। আপনি খুব অপ্রয়োজনীয় কথা বলেন। সবাই কি সব পারে? আমি জুতার ফিতা বাঁধতে পারিনা। এই কাজটা সবসময় বাবা করতেন তাই শেখা হয়নি। বাবা না থাকলে অন্য জুতা পরতাম। কিন্তু এখন চেষ্টা করছি। পারফেক্ট না, কিন্তু শেখা হয়ে যাবে। কাউকে নিয়ে এভাবে মজা করবেন না। আমার এসব একদম পছন্দ না।

"আপনার খিদা লেগেছে? "

বাঈজিদের আকস্মিক প্রশ্নে বিস্মিত হল মাহনূর। খিদা তো লেগেছে আরো দু ঘন্টা আগে। কিন্তু এই লোক বুঝলো কীভাবে? সে কি ভুল ভাল কিছু বলে ফেলছে ? নাকি চোখ-মুখ শুকিয়ে গেছে!
কিন্তু..

চলবে..
পর্ব-১ (পরবর্তী পর্ব পেতে মায়াবিনী -গল্পকথন পেইজের সাথে থাকুন)
#গল্প: #বেলা_অবেলায়
লেখক : কুলচুমা ইয়াছমিন কনা

01/09/2026

কাব্য?
কেমন আছেন আপনি? 'প্রিয়'-শব্দটা ইচ্ছে করেই এড়িয়ে গেলাম। যে কখনো আপন-ই হয়নি তাঁকে প্রিয় সম্বোধন করা তো দুঃসাহসিক ব্যাপার, বলেন?
আপনি কি শরৎ এর আমেজ টের পেয়েছেন? বর্ষার জলে ভেসে, হঠাৎ সাদা মেঘের উড়াউড়ি কি আপনার ঠিকানায়ও হয়? আজ সকালের ঘুম ভাঙতেই চিরাচরিত আলসেমি ভর করেছিল। তারপর চোখ গেলো, পাশের রেলিং এ। একটা কাঠঠোকরা পাখি নত মস্তকে বসে আছে। আমার মনে হলো,আপনি এলেন বুঝি! আচ্ছা আপনি কি পাখি হতে পারেন না?
আমার অভ্যাস এখনো বদলায় নি,বুঝলেন..। অভ্যাস বদলালে কি আর কাঠঠোকরা পাখির মধ্যে আপনাকে খোঁজি!
আপনার কাব্য নামটা দিয়েছিলাম, আপনার কবিতা হওয়ার লোভে। নাহয় সাধ করে আপনার নাম রাখতে যাওয়ার কে আমি? আপনি কখনোই আমার আপন কেউ নন। আপনি শুধু আমার মনে লালন করা একটা কল্পনা, একটা অভ্যাস,একটা কবিতা। আপনাকে বলেছিলাম, আমার ক্যাকটাস তিনটা নতুন বাচ্চা দিয়েছে। আপনি হেসেছিলেন। আমার ক্যাকটাসগুলো মারা গেছে। সেই খোঁজ আপনি রাখলেন না কাব্য।
জানেন, আমার শখের শিউলি গাছে অনেক কুড়ি এসেছে। আপনি বলেছিলেন, আমাকে শিউলি ফুল কুড়িয়ে দিবেন। তারপর কতো শরৎ চলে গেলো, কত শিউলি অভিমানে ঝরে পড়লো, কত মেঘ নীরবে নীলের বুকে হারিয়ে গেলো। কিন্তু আপনি..!
আচ্ছা আপনার মনে পড়ে? বলেছিলেন এক বিকেলে একসাথে পাহাড় দেখার কথা। পাহাড়ের কিনারে বসে,চা খেতে খেতে আকাশ দেখার কথা? কিংবা একদিন হুট করে এসে আমাকে চমকে দেওয়ার কথা?
আপনি বলেছিলেন, নিজের হাতে রান্না করে খাওয়ানোর কথা। আপনি কি সব ভুলে গেলেন? আমার একটা নীল মলাটের ডাইরি পাওয়ার কথা ছিলো, দুই হাত ভর্তি কাঁচের চুড়ি পরিয়ে দেওয়ার কথা ছিলো, কথা ছিলো আমাকে নিয়ে এলোমেলো কাব্য সাজাবর। কথা আরো অনেক ছিলো..।
শুভ্র কাশবনে, নীল শাড়িতে আমাকে দেখার কথা ছিলো। আর আপনার সাদা..। মনে পড়ে কাব্য? তারপর কত শরতে এলোকেশী কাশফুল এলো,সৌন্দর্য বিলিয়ে দিয়ে শীতের বুকে গা ঢাকা দিলো। আসলেন না কেবল আপনি।
কাব্য, এই বিশ্ব ভ্রম্মান্ডে আপনার অস্তিত্ব কি বাস্তব? নাকি আপনি ধূমকেতু র মতো বহুবছরে একবার দেখা যাওয়া নশ্বর রঙ। আমার সন্দেহ হয়!

আমি চাই না আপনি আসেন।
আপনি শুধু কল্পনায় সুন্দর। বাস্তব অস্তিত্বের আপনি কঠোর, হৃদয়হীন,নিষ্ঠুরতম ।
ছলনায় ঘেরা মায়াজাল।
আপনি বরং আমার অভ্যাসে,কল্পনায় আর কাব্যে থাকুন। কবিতা য় থাকুন।
বর্ষার কদমে, শরৎ এর শিউলি তে, হেমন্তের সরষে ক্ষেতে কিংবা বসন্তের পল্লবে থাকুন।
দূরের নক্ষত্র হয়ে, আমার রাতজাগা রাতের সঙ্গী হয়ে থাকুন। অথবা মহাশূন্যে বিলীন হয়ে যান চিরতরে।
হেলির ধূমকেতু র মতো!

ইতি,
আপনার কবিতা হতে চাওয়া
অ কবিতা ....................

Address

Cox's Bazar
2772022

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when মায়াবিনী -গল্পকথন posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share

Category