15/11/2023
মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, বিমান মুখোপাধ্যায়, ডক্টর অনুপ ঘোষাল,সবাই কি নজরুল গীতি ভুল গেয়েছেন????
------------------------------
নজরুল ইসলাম ছিলেন একজন ধর্মনিরপেক্ষ উদার মানসিকতার গীতি কবি। যাঁরা এখন নজরুল গীতি চর্চা করেন তাদের মধ্যে কি এই গুণগুলি সত্যিই আছে? নজরুল ইসলাম যেমন তাঁর সব গানের সুর করেননি, আবার স্বরলিপিও করে যান নি। তাঁর অসংখ্য গানগুলোর সব রেকর্ড করাও হয়নি। আদি রেকর্ডের গানগুলো যদি সব সঠিক হয় তাহলে মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, পরবর্তীতে বিমান মুখোপাধ্যায়, অনুপ ঘোষাল এঁনারা কি সব তাদের নিজস্ব সুরে গানগুলো করলেন?
মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় কে বাদ দিলে নজরুল গীতির মেরুদন্ড থাকেনা। অথচ বর্তমানে তাঁর একটা গানও গাইলে সঙ্গে সঙ্গে বলা হয় এটা নাকি অরিজিনাল সুর নয়। মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের মতো গাওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই একথা সত্যি। কিন্তু কিছুটা হলেও আমরা তো চেষ্টা করতে পারতাম। বহু প্রচলিত সুরের নজরুল গীতি গুলো এখন শুনলে মনে হয়, এ, আর, রহমান সব জায়গায়ই আছে। যেমন ইতিমধ্যে বাংলাদেশের একটা নামকরা প্রতিষ্ঠান থেকে রেকর্ডকৃত "হে গোবিন্দ রাখো চরণে" গানটি শুনে আমি হতভম্ব হয়ে গেছি। অর্থাৎ পূর্বের যে সব গুনী শিল্পীরা এই গান গেয়েছেন তাঁরা সকলেই ভুল গেয়েছেন???
নজরুল গীতিকে অত্যন্ত ভালোবেসেও আজ আমি আতঙ্কিত নজরুল গীতি গাইতে। ডক্টর অনুপ ঘোষালের কাছে নজরুলগীতি শেখার আমার সুযোগ হয়েছিল। কিছু নজরুল গীতি শিখেও ছিলাম। আজ সেগুলো গাইতে ভয় পাই, আতঙ্কিত হই।
আমার মনে হয় এমন দুরবস্থায়, বহু শিল্পীরা নজরুল গীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন এবং নেবেন। যিনি ছিলেন বাঁধনহারা তাঁকেই আমরা বেঁধে ফেলেছি।
এই কথাগুলো বলার অর্থ এই নয় যে, আমি এ আর রহমানকে সাপোর্ট করছি। তিনি যেটা করেছেন সেটাকে সাপোর্ট করার কোন জায়গা নেই। পক্ষান্তরে আর একটা কথা বলতে চাই, তার সুর করা ‘‘কারার ঐ লৌহ কপাট’’ গানটি বেশি বিরোধিতা করে প্রকারান্তরে তাকেই বেশি প্রচারের আলোয় আমরা নিয়ে আসছি না তো? সাধারণভাবে ওই গানটি শুনলে কেউ বুঝতেই পারত না যে ওটা কাজী নজরুল ইসলামের লেখা কারার ঐ লৌহ কপাট গানটি গাওয়া হচ্ছে । বিদগ্ধজনেরা বিষয়টা একটু ভেবে দেখতে পারেন।
ফিরোজা বেগমকেও বাদ দেওয়ার কারণ তিনি নাকি "আধুনিক গানের শিল্পী ছিলেন, নজরুল গীতির শিল্পী ছিলেন না" (প্রয়াত বাবু রহমান)।
বিমান মুখোপাধ্যায়ের সান্নিধ্যে যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। নজরুল গীতি কিভাবে সুরের মধ্যে থেকে ইম্প্রোভাইজ করতে হয় সেটা দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল কয়েকবার। বর্তমানে পন্ডিত অজয় চক্রবর্তীও নজরুল গীতিতে কিছু কিছু সুরের ইম্প্রোভাইজ করেছেন। যেগুলো আমাদের দেশে রেডিও টেলিভিশনে গাওয়ার উপায় নেই।
শুধু কি তাই? আমাদের দেশের নজরুল গীতির প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরা যারা আছেন - মনে করুন "ক "এর কাছে শিখেছি এবার "খ" কে শুনালাম। তখন "খ" বলবেন "ক" ভুল শিখিয়েছেন। আদিরেকর্ডে এটা নেই।
নজরুল গীতিকে ভালোবেসে গাইতে গেলে এদেশের প্রধান সমস্যা হলো এটাই।
মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের মতো শিল্পী পৃথিবীতে হাজার বছরে একটা জন্মায় না। শুধু নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এমন মহান শিল্পী কে নজরুল সংগীত গবেষকদের সম্মান দেখানো উচিত।
আসলে আমরা আমাদেরকে যতটাই সঙ্গীত শিল্পী মনে করি না কেন, মূলত আমরা সঙ্গীত ব্যবসায়ী। বাংলাদেশে আর দশটা ব্যবসায় যেভাবে ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে, ঠিক তেমনি রবীন্দ্র সংগীত, নজরুল গীতি, শাস্ত্রীয় সংগীত, সর্বক্ষেত্রেই এখন সিন্ডিকেট বিরাজ করছে। এর থেকে মুক্তি পাওয়ার কোন রাস্তা আপাতত দেখতে পাচ্ছি না।