10/09/2026
প্রায় চল্লিশ বছর পর আবারও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির মর্যাদাপূর্ণ আসনে বসল বাংলাদেশ। ইতিহাসের পাতায় নতুন অধ্যায় যোগ হলো সেই দিনটি—২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর। নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে, আন্তর্জাতিক মহলের নজরদারিতে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এই মুহূর্তটি কেবল একজন কূটনীতিকের ব্যক্তিগত সাফল্য নয়। এটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসের এক গর্বের অধ্যায়। ১৯৮৬-৮৭ সালে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি হওয়ার পর প্রায় চল্লিশ বছর পর আবারও এই পদটি দেশের হাতে এসেছে। খলিলুর রহমান হয়ে উঠলেন দ্বিতীয় বাংলাদেশি, যিনি বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিনিধিত্বশীল ফোরামের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
আরো ভালোলাগার বিষয় হলো, “ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়াসহ বিশ্বের ১৯৩টি দেশের প্রতিনিধিরা এখন বাংলাদেশি এই সভাপতিকে সম্বোধন করবেন—‘মি. প্রেসিডেন্ট’ বলে!”
তবে ঘটনা শুরু হয় ২ জুন ২০২৬-এর সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। এদিন জাতিসংঘ সদর দপ্তরে গোপন ব্যালটে ভোট হয়। মোট ১৯০টি ভোটের মধ্যে খলিলুর রহমান পান ৯৯টি। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দূত আন্দ্রেয়াস এস. কাকোরিস, যিনি পান ৯১টি ভোট। এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের পালায় এই নির্বাচন হয়, আর সেখানেই বাংলাদেশের প্রার্থী জয়ী হন।
খলিলুর রহমানের কূটনৈতিক জীবন দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ। ১৯৫৪ সালে জন্ম। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ ফরেন সার্ভিসে যোগ দেন তিনি। পরে জাতিসংঘেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন—ইউএনসিটিএডি-তে বিশেষ উপদেষ্টা, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মুখপাত্রসহ নানা পদে। বাংলাদেশে ফিরে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে কাজ করেন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
সভাপতি হিসেবে তাঁর মেয়াদ এক বছর।
এই সময়ে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। নতুন মহাসচিব নির্বাচনের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াও তাঁর সভাপতিত্বকালে সম্পন্ন হবে।
মঙ্গলবার নিউইয়র্কের স্থানীয় সময়ে দুপুরে তাঁর সভাপতিত্বে ৮১তম অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। দায়িত্ব নেওয়ার আগে তিনি নিজের পরিকল্পনা তুলে ধরেন এবং কাজ শুরু করেন। বাংলাদেশ সময় রাত প্রায় ৯টার দিকে শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে এই ঐতিহাসিক মুহূর্ত সম্পন্ন হয়।
এই সাফল্য শুধু একজন ব্যক্তির নয়—এটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক দক্ষতা, ধৈর্য এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থার প্রতিফলন। চার দশক পর ফিরে আসা এই নেতৃত্ব বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের কণ্ঠকে আরও শক্তিশালী ও সম্মানিত করেছে। খলিলুর রহমান এখন শুধু বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নন—তিনি ১৯৩টি দেশের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থার সভাপতি। তাঁর নেতৃত্বে জাতিসংঘ যেন আবারও আস্থা ও কার্যকারিতার নতুন দিগন্ত খুঁজে পায়—এমনটাই প্রত্যাশা