09/08/2026
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি
বিষয়: সাধক বাউল কবি, গীতিকার, সুরকার ও লোকসংগীতশিল্পী আবদুল মজিদ তালুকদারের স্মৃতি, জীবন ও সৃষ্টিকর্ম রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণের আবেদন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
শ্রদ্ধা ও বিনয়ের সঙ্গে আপনার সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি বাংলাদেশের লোকসংগীত ও লোকসংস্কৃতির এক নিবেদিতপ্রাণ সাধক আবদুল মজিদ তালুকদারের প্রতি।
নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার ইটাউতা গ্রামে জন্ম নেওয়া এই মরমী সাধক শুধু একজন লোকশিল্পী ছিলেন না—তিনি ছিলেন গীতিকার, সুরকার, বাউল সাধক ও লোকসংস্কৃতির একজন নিবেদিত সাধক। তাঁর জীবনের দীর্ঘ সময়জুড়ে গান, সাহিত্য ও সংগীত সাধনার মাধ্যমে তিনি এ দেশের লোকঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছেন।
১৯৪২ সালে তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিওতে তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। তৎকালীন পূর্ব বাংলার অল্পসংখ্যক নির্বাচিত শিল্পীর মধ্যে তিনি অন্যতম ছিলেন।
পরবর্তীতে তিনি বেতার, টেলিভিশন ও গ্রামোফোনের শিল্পী হিসেবে সংগীত পরিবেশন করেন। তাঁর কণ্ঠে ও তাঁর রচিত গান বিভিন্ন সময় মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয় উৎসব উপলক্ষে স্বরচিত গান পরিবেশন করে তিনি পুরস্কার ও গোল্ড মেডেল লাভ করেন। একই সময় তিনি সর্বভারতীয় কৃষক সম্মেলনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে স্বরচিত গান পরিবেশন করেন।
ভাষা আন্দোলনের সময়ও তিনি গানকে মানুষের অধিকার ও চেতনার ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পক্ষে গান গেয়ে তিনি মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করেন। পরবর্তীতে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা আরও গভীর হয়।
তিনি বাংলা একাডেমির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং বাংলা একাডেমির সদস্য সংগ্রাহক প্রথম ও দ্বিতীয় অধিবেশনেও গান পরিবেশন করেন—যা তাঁর সাংস্কৃতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
১৯৫৭ সালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর কামগামী সম্মেলনেও তিনি স্বরচিত গান পরিবেশন করেন। এভাবেই তৎকালীন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর সঙ্গে তাঁর সংগীতজীবন নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিল।
মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তিনি নীরব ছিলেন না। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাকামী মানুষকে উৎসাহিত করেছেন। স্বাধীনতার পর তিনি সরকারি ব্যবস্থাপনায় মহকুমা জনসংযোগ অফিসের শিল্পী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আবদুল মজিদ তালুকদার শুধু গান গেয়ে থেমে থাকেননি। তিনি বিপুল সংখ্যক গান ও সাহিত্যকর্ম রচনা করেছেন এবং মোট ২২টি পাণ্ডুলিপি রেখে গেছেন। এর মধ্যে তাঁর জীবদ্দশায় ১১টি পাণ্ডুলিপি/গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তীতে তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর অপ্রকাশিত সৃষ্টির ধারাবাহিকতায় বর্তমানে আরও ২টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ফলে তাঁর সৃষ্টির বিশাল ভাণ্ডার এখনো সংরক্ষণ ও গবেষণার অপেক্ষায় রয়েছে।
এই মূল্যবান পাণ্ডুলিপি, গান, গ্রামোফোন রেকর্ড, ছবি, চিঠিপত্র ও অন্যান্য স্মৃতিচিহ্ন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।
আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই—
নেত্রকোনা-৩ (কেন্দুয়া-আটপাড়া) আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য ড. রফিকুল ইসলাম হিলালী মহোদয় জাতীয় সংসদে আবদুল মজিদ তালুকদারের কথা বলেছেন। তিনি তাঁর সৃষ্টিকর্মের মূল্যায়ন করে বলেছেন—
“আবদুল মজিদ তালুকদারের সৃষ্টিকর্ম মানুষের হৃদয়ে যুগের পর যুগ বেঁচে থাকবে।”
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
জাতীয় সংসদে একজন মাননীয় সংসদ সদস্যের এই মূল্যায়ন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এটি শুধু একজন প্রয়াত শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা নয়; এটি বাংলাদেশের লোকসংগীত ও লোকঐতিহ্যে আবদুল মজিদ তালুকদারের অবদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।
তাই আপনার কাছে আমাদের বিনীত কিন্তু দৃঢ় আবেদন—
আবদুল মজিদ তালুকদারের জীবন, গান, ২২টি পাণ্ডুলিপি, প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত রচনা, গ্রামোফোন রেকর্ড, ছবি, চিঠিপত্র ও অন্যান্য ঐতিহাসিক দলিল রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক।
তাঁর জন্মভূমি নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার ইটাউতা গ্রামে প্রতিষ্ঠা করা হোক—
“আবদুল মজিদ তালুকদার স্মৃতি ও লোকসংগীত কেন্দ্র”
যেখানে তাঁর জীবন ও কর্মের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস, গান, পাণ্ডুলিপি, রেকর্ড, ছবি ও স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষিত থাকবে এবং গবেষক ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাঁর সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
এটি শুধু একজন শিল্পীর পরিবারের দাবি নয়। এটি বাংলাদেশের লোকসংগীত, লোকসংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস সংরক্ষণের দাবি।
একজন শিল্পী চলে যান, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি থেকে যায়। আর সেই সৃষ্টি যদি সংরক্ষণ করা না হয়, তাহলে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হারিয়ে যেতে পারে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদে তাঁর কথা উঠেছে। তাঁর সৃষ্টিকর্ম মানুষের হৃদয়ে যুগের পর যুগ বেঁচে থাকবে—এ কথা বলা হয়েছে। এখন আমরা চাই, তাঁর সেই সৃষ্টি ও স্মৃতিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগও গ্রহণ করা হোক।
আপনার একটি উদ্যোগ আবদুল মজিদ তালুকদারের স্মৃতি রক্ষার পাশাপাশি নেত্রকোনার ভাটি অঞ্চলের লোকসংগীত ও লোকঐতিহ্যকে জাতীয় পর্যায়ে আরও মর্যাদার সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে আবদুল মজিদ তালুকদারের জীবন ও সৃষ্টিকর্ম রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণের জন্য আপনার সদয় দৃষ্টি ও কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
বিনীত
শিল্পী আবুল বাসার তালুকদার
পুত্র—সাধক বাউল কবি আবদুল মজিদ তালুকদারের
গ্রাম: ইটাউতা
উপজেলা: কেন্দুয়া
জেলা: নেত্রকোনা