19/08/2022
#মাকতাবাতুল_আযহার_রিভিউ_প্রতিযোগিতা_২০২২
বই : খুলুকিন আযীম
লেখক : মুহাম্মাদ আতীক উল্লাহ
প্রকাশনায় : মাকতাবাতুল আযহার
পৃষ্ঠাসংখ্যা : ৬৪০
রিভিউ লেখক : Rashed Mohammad Zia
✍️লেখক পরিচিতি :
শায়খ আতীক উল্লাহ একটি নাম। একটি আবেগ। একটি ভালোবাসা। বাংলাভাষায় দ্বীনি বিষয়াবলী নিয়ে জীবনঘনিষ্ঠ লেখালেখিতে তাঁর তুলনা নিতান্তই অপ্রতুল। তাঁর রচনাসম্ভার যেন ফুলেফলে সুশোভিত একটি উন্মুক্ত বাগান। শায়খ আতীক উল্লাহর ব্যক্তিসত্তা ও লেখকসত্তার মধ্যকার যোগসূত্র খুবই মজবুত। তাই তাঁর প্রতিটি লেখা পাঠকের হৃদয়ে ভাবাবেগের জোয়ার তুলে। লেখক পাঠকের মধ্যে তৈরী হয় এক আত্মিক সম্পর্ক। যে সম্পর্কের সূচনা হয় পাঠকের হৃদয়ে লেখকের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা থেকে। কুরআনকে ভালোবাসার বিনম্র প্রয়াস' স্লোগান ধারণ করে তিনি কুরআন গবেষণায় নিজেকে নিয়ে গিয়েছেন এক অনন্য উচ্চতায়। মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছেন 'কুরআনের পাখি' নামে। তাছাড়া জীবনজাগার গল্প রচনায় তাঁর মননশীল অভিরুচি পাঠকমাত্রই বিমোহিত করে।
📚গ্রন্থপরিচিতি :
বাংলাভাষায় নবীজীবনীর উপর অসংখ্য সীরাহগ্রন্থ রচিত হয়েছে। সীরাহ রচনার এ ধারা ইদানিং গতিময়তা লাভ করেছে। নিঃসন্দেহে এটি বাংলাভাষী পাঠকবর্গের জন্য তৃপ্তিকর বিষয়। তবে দু' একটি বই ব্যতিত প্রায় প্রতিটি গ্রন্থে নবীজিকে গতানুগতিক রীতিতেই তুলে ধরা হয়েছে। এক্ষেত্রে শায়খ আতীক উল্লাহর 'সুনানিয়্যাত' সিরিজের প্রথম সংকলন 'খুলুকিন আযীম' ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে। এ গ্রন্থে লেখকের অনুসৃত বর্ণনারীতি নবীজির সীরাহ রচনার জগতে এক নতুনধারার সূচনা করেছে। নবীজি তো আমাদের জন্য উসওয়াতুন হাসানাহ। উত্তম আদর্শ।
সুরা আহযাবের ২১ নং আয়াতে মহান আল্লাহর সুস্পষ্ট ঘোষণা,
لَقَدۡ کَانَ لَکُمۡ فِیۡ رَسُوۡلِ اللّٰہِ اُسۡوَۃٌ حَسَنَۃٌ لِّمَنۡ کَانَ یَرۡجُوا اللّٰہَ وَالۡیَوۡمَ الۡاٰخِرَ وَذَکَرَ اللّٰہَ کَثِیۡرًا.
- অবশ্যই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ তাদের জন্য যারা আল্লাহ ও পরকাল প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।
অতএব সেই আদর্শ আমাদের জীবনে বাস্তবায়িত করতে হলে সর্বাগ্রে তাঁর দৈনন্দিন জীবনধারা সম্পর্কে বিস্তৃত ও গভীর জ্ঞান রাখা উচিত। আমরা জানি, শেষরাতে তাহাজ্জুদ সালাতের জন্য জাগ্রত হওয়ার মধ্য দিয়ে নবীজির দিন শুরু হতো এবং রাতের সর্বশেষ সালাত বিতর আদায়ের মাধ্যমে নবীজির একেকটি কর্মব্যস্ত দিনের সুন্দর পরিসমাপ্তি ঘটতো। এ গ্রন্থে সুলেখক শায়খ আতীক উল্লাহর হাতে নবীজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ 'দৈনন্দিন জীবনযাপন রীতির পরিপূর্ণ একটি প্রতিচ্ছবি পরিস্ফুটিত হয়েছে।
📌বিষয়বস্তু :
সুলেখক শায়খ আতীক উল্লাহ তাঁর ঢাউস সাইজের এ গ্রন্থে নবীজির দৈনিক যে সকল সুন্নাহ ও রীতিনীতির উপর আলোকপাত করেছেন, সংক্ষেপে তা তুলে ধরছি।
▪️যিকরুল্লাহ - আল্লাহর যিকির (২১-১০৪ পৃ.) :
এ শিরোনামের অধীনে লেখক নবীজির পঠিত দৈনন্দিন যিকিরসমূহের বর্ণনা দিয়েছেন। সারাদিনের যিকিরসমূহের ফজীলত ও গুরুত্বের কথাও তুলে এনেছেন হাদীসের আশ্রয়ে। মূলত নবীজির দিনগুলি ছিল যিকিরময়। তাঁর কোন ক্ষণই যিকিরমুক্ত ছিলনা। বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত নবীজির পঠিত যিকিরগুলোই এ শিরোনামের অধীনে স্থান পেয়েছে।
▪️সকাল-সন্ধ্যা ( ১০৫ - ১৬৬ পৃ.) :
এ শিরোনামের অধীনে লেখক নবীজির পঠিত সকাল ও সন্ধ্যার দুয়ায়ে মাসনুনাহ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। হাদীস থেকে প্রতিটি দুয়া, তাসবীহাত ও ইসতিগফারের সপক্ষে সহীহ প্রমাণ পেশ করেছেন। পাশাপাশি হাদীসে উল্লেখিত দুয়া, তাসবীহাত ও নবীজির প্রতি দরূদ পাঠের বিশেষ উপকারিতার কথাও আলোচনা করেছেন।
▪️সালাত পরবর্তী আমল ( ১৬৭ - ১৮২ পৃ.) :
সালাত পরবর্তী কিছু মাসনূন আমল সালাতে কৃত ভুলত্রুটির মাশুল। এসব আমল সালাতকে সুশোভিত করে তুলে। তাই নবীজি এই আমলগুলো ছাড়তেন না।সালাত সমাপ্ত করে নবীজি কি কি দুয়া পড়তেন, নবীজির ইসতিগফারের নিয়ম, সালাত পরবর্তী সুন্নাহসম্মত দুয়াসমূহ পড়ার সময় কখন এবং উপকারিতা কি কি ইত্যাদি বিষয় এই শিরোনামের ছায়ায় সুন্দরভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
▪️তাহাজ্জুদ ( ১৮৩ - ২০৮ পৃ.) :
তাহাজ্জুদের সালাত নবীজির নিয়মিত আমল ছিল। কুরআন কারীমে এ সালাতের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। লেখক শায়খ আতীক উল্লাহ 'তাহাজ্জুদ' শিরোনামের অধীনে নবীজির তাহাজ্জুদ আদায়ের ধরণ ও রাকাতসংখ্যা, তাহাজ্জুদে পঠিত দুয়া, জামাত তাহাজ্জুদের সালাত আদায় এবং এ সালাতের অত্যধিক উপকারিতার কথা হৃদয়গ্রাহী বর্ণনায় তুলে ধরেছেন। যা যেকোন পাঠককে তাহাজ্জুদ সালাতের প্রতি আগ্রহী করে তুলবে।
▪️পবিত্রতা - পরিচ্ছন্নতা ( ২০৯ - ২২৮ পৃ.) :
পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা মুমিন ব্যক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। মহান আল্লাহ পবিত্রতা - পরিচ্ছন্নতা পছন্দ করেন। নবীজিও সাহাবায়ে কিরামকে পবিত্রতার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন। তাই লেখকও নবীজির আমলী জিন্দেগির পূর্ণাঙ্গ চিত্র আঁকতে গিয়ে পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা অর্জনের প্রাসঙ্গিক সুন্নাহসমূহের প্রতি পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন।
▪️সালাত ( ২২৯ - ৩৭৮ পৃ.) :
এ গ্রন্থের সবচেয়ে দীর্ঘ আলোচনা সন্নিবেশিত হয়েছে সালাতের ব্যাপারেই। এটি অবশ্যই চাহিদার সাথে যথার্থ সামঞ্জস্যপূর্ণও। কারণ কুরআন কারীমে সালাতকেই মুমিনের শ্রেষ্ঠতম দায়িত্ব হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সুরা নিসার ১০৩ নং আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন,
فَاِذَا قَضَیۡتُمُ الصَّلٰوۃَ فَاذۡکُرُوا اللّٰہَ قِیٰمًا وَّ قُعُوۡدًا وَّ عَلٰی جُنُوۡبِکُمۡ ۚ فَاِذَا اطۡمَاۡنَنۡتُمۡ فَاَقِیۡمُوا الصَّلٰوۃَ ۚ اِنَّ الصَّلٰوۃَ کَانَتۡ عَلَی الۡمُؤۡمِنِیۡنَ کِتٰبًا مَّوۡقُوۡتًا.
- অতঃপর যখন তোমরা সালাত পূর্ণ করবে তখন দাঁড়ানো, বসা ও শোয়া অবস্থায় আল্লাহর স্মরণ করবে। অতঃপর যখন নিশ্চিন্ত হবে তখন সালাত (পূর্বের নিয়মে) কায়েম করবে। নিশ্চয় সালাত মুমিনদের উপর নির্দিষ্ট সময়ে আবশ্যকীয় কর্তব্য।
ফলে নবীজির দৈনিক আমলসমূহের মধ্যে সালাতই সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব পেয়েছে। তাই সালাত সংশ্লিষ্ট বিবিধ সুন্নাহ সম্পর্কে লেখক দেড়শ পৃষ্ঠাব্যাপী বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। যা বলতে গেলে একটি বইয়ের ভিতর আরেকটি বইয়ের রূপ পরিগ্রহ করেছে। সালাতের সুন্নাহ, আদাব ও নীতির আলোচনা এসেছে। বিশেষকরে কিয়াম, রুকু ও সাজদাতে“খুশু-খুযু” সহকারে নিবিষ্টতার সাথে সালাত আদায়ের সুন্নাহ পদ্ধতি নিয়ে লেখক প্রাণভরে আলোচনা করেছেন।
▪️জুমআ ( ৩৭৯ - ৪২৪ পৃ.) :
কুরআন সুন্নাহ মুমিনদের জন্য জুমআবারকে বিশেষ গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ করে উপস্থাপন করেছে। জুমআবার আমাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়ামাত। নবীজি জুমআবারে নিজে বিশেষ প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন। জুমআবারের আমলসমূহ আদায়ে পরিবার পরিজন ও সাহাবা কিরামকে আলাদাভাবে তাগাদা দিতেন। 'জুমআ' শিরোনামের অধীনে লেখক জুমআবারে সুরা কাহাফ তিলাওয়াতের উপকারিতা, দরূদ পাঠের গুরুত্ব, জুমাআবের সাজশোভা, জুমার সালাতে গমন ও মাসজিদে অবস্থানের সুন্নাহপদ্ধতি, জুমাবারে আহার বিশ্রামের নববি নিয়ম ইত্যাদি বিষয় চমৎকার বর্ণনায় উপস্থাপন করেছেন।
▪️সিয়াম ( ৪২৫ - ৪৬৬ পৃ.) :
সিয়াম সাধনা মুমিন জীবনের বার্ষিক একটি উৎসবের মতোই। সমগ্র দুনিয়ায় রমাদান মাসে এক অনন্য আবহ ও পরিবেশ বিরাজ করে। নবীজির রমাদান কিরকম ছিলো, মূলত লেখক 'সিয়াম শিরোনামে এ বিষয়টির উপরে আলোকপাতে প্রয়াসী হয়েছেন। এতে ইফতার ও সাহরীর সুন্নাহ, রমাদানকালীন দুয়া- ইসতিগফার, দানশীলতা, ইতিকাফের মহত্ত্ব, লাইলাতুল কদর, রমাদান পরবর্তী সাওমের ফজীলত ইত্যকার বিষয়ে দলীলসমৃদ্ধ আলোচনা উঠে এসেছে।
▪️ঈদ উৎসব ( ৪৬৭ - ৪৮৪ পৃ.) :
দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিনদের জন্য দুনিয়াবী এওয়ার্ড হলো ঈদুল ফিতর। এ অধ্যায়ে লেখক ঈদের সুন্নাহসমূহের উপর দৃষ্টিপাত করেছেন। একজন মুমিন ব্যক্তির ঈদের দিন কিভাবে কাটানো উচিত, তার একটি মানসম্মত প্রেসক্রিপশন আমরা এখান থেকে পেতে পারি।
▪️কুরবানী ( ৪৮৫ - ৪৯১ পৃ.) :
মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসব অনুষ্ঠান হলো 'ঈদুল আযহা' বা কুরবানির দিন। কুরবানি বছরে একবার আগমন করে বলে আমাদের অনেকের মন থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ বিস্মৃত হয়ে যায়। কুরবানি সংশ্লিষ্ট কতিপয় সুন্নাহ আমরা এ অধ্যায় থেকে জেনে নিতে পারি। যেমন কুরবানিতে পশু জবাইয়ের সময় কখন এবং আইয়ামে তাশরীকে তাকবীরের গুরুত্ব ও ফজীলত ইত্যাদি।
▪️পানাহার ( ৪৯২ - ৫৪০ পৃ.) :
আমাদের দৈনন্দিন জীবনধারা পানাহারের সাথে উৎপ্রোতভাবে জড়িত। পানাহার সংশ্লিষ্ট নবীজির সুন্নাহসমূহের উপর একটি সামগ্রিক ধারণা থাকলে আমাদের খাওয়াদাওয়াও ইবাদাতে পরিণত হবে, বরকত আসবে এবং স্বাস্থ্যও সুরক্ষিত থাকবে। তাই লেখক এখানে পানাহার সংশ্লিষ্ট খুবই দরকারি ও উপযোগী সুন্নাহসমূহ তুলে এনেছেন। প্রতিটি সুন্নাহ যেহেতু হাদীস থেকেই আহরিত, তাই দলীলও যোগ করে দিয়েছেন নির্ভরযোগ্য সূত্রের আলোকে।
▪️সফর ( ৫৪১ - ৫৭২ পৃ.) :
কুরআন কারীমে সফরকে বলা হয়েছে জীবিকা ও শিক্ষার উৎস। সফর করলে অতীতযুগের অবাধ্য জাতিসমূহের নির্মম পরিণতির কথা জানা যায়। সফর জীবিকার জন্যও হতে পারে। জীবিকার সন্ধানে সফর করার প্রতি নবীজি আমাদেরকে হাদীসে উৎসাহিত করেছেন। লেখক এখানে সফরের দুয়া, আদাব, সফর থেকে নীড়ে ফিরার সময় করণীয়, যানবাহনে আরোহণের দুয়াসহ সফরের কিছু দামি সুন্নাহর কথা তুলে ধরেছেন।
▪️হাদীস শরীফে কুরআন ( ৫৭৩ - ৬০২ পৃ.) :
শায়খ আতীক উল্লাহর এ গ্রন্থটি যেন হাদীসের চোখে জীবন দেখার একটি আয়না। হাদীস মূলত একটি আয়না। দর্পণ। এ আয়না চোখের সামনে ধরে আমরা মনের কল্পনায় নবীজিকেই দেখে থাকি। তাই লেখক এখানে হাদীসের আয়নায় কুরআনকে দেখতে চেয়েছেন। নামাযের ভিতরে বাইরে কুরআন কারীম তিলাওয়াতের ফজীলত, কুরআন পঠনপাঠনের রীতি ও নীতি, কুরআনি হালাকা ইত্যাদি বিষয় লেখকের স্বভাবজাত কলমি বর্ণনায় আকর্ষণীয়ভাবে উঠে এসেছে।
▪️বিবিধ ( ৬০৩ - ৬৪০ পৃ.) :
সর্বশেষ কোন নির্দিষ্ট শিরোনাম ছাড়া কিছু বিষয়ে লেখকের কলম কথা বলেছে। যেখানে নানাবিধ টপিকে আলোচনা হয়েছে। তবে সবগুলোতেই সুন্নাহর দিকটা ধরে রাখা হয়েছে। মূলত এগুলোও নবীজির দৈনন্দিন কিছু বহুল চর্চিত সুন্নাহ, যেগুলো আমাদের থেকে অবহেলায় ছুটে যায়। যেমন হাঁচির জবাব, শিশুকে সালাম, প্রবেশের অনুমতি, প্রিয়জনের খোঁজখবর নেয়া ইত্যাদি।
» উপর্যুক্ত আলোচনায় বিষয়বস্তু শিরোনামে গ্রন্থের সারাংশ তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। গ্রন্থের আরো কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিকের প্রতি নিম্নে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি :
📌চমৎকার ভূমিকা :
লেখকের প্রতিটি বইয়ে আমি প্রথমেই তাঁর ভূমিকাটি পড়ার লোভ সামলাতে পারিনা। কারণ এখানে থাকে লেখালেখির সময় লেখকের কিছু বাস্তবিক টুকরোটুকরো অভিজ্ঞতা ও অল্পসল্প গল্পকথা। বইটি রচনার প্রেক্ষাপট, রচনার সময় কোন কোন উৎস গ্রন্থের আশ্রয় নেয়া হয়েছে ইত্যাদি বিষয়। এ গ্রন্থের শুরুতেও লেখক 'বিসমিল্লাহ' শিরোনামে সুন্দর একটি ভূমিকা লিখেছেন। যা এক কথায় অনবদ্য লেগেছে।
📌আকর্ষণীয় শিরোনাম :
লেখালেখিতে শায়খ আতীক উল্লাহর একটি ভিন্নরুচির দেখা মেলে। তা বইয়ের নাম নির্ধারণে হোক বা শিরোনাম নির্ধারণে। এটাকে লেখক স্বয়ং নিজের ছেলেমানুষি দুর্বলতা বলেছেন এই গ্রন্থের ভূমিকায়। এ গ্রন্থেরও কিছুকিছু শিরোনাম আমার খুবই ভালোলেগেছে। যেমন, তিনকুল পাঠের ফজীলত বলতে গিয়ে লেখক শিরোনাম দিয়েছেন এন্টিভাইরাস, তাহাজ্জুদ সালাতের গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে শিরোনাম দিয়েছেন 'মুসতাগফির বিল আসহার', জুমাআবারের ফজীলতের কথা বলতে গিয়ে শিরোনাম দিয়েছেন 'জুমআবারীয় অফার', ঘরে নামায আদায়ের বিশেষ স্থান রাখার কথা আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন 'ঘরোয়া মাসজিদ', ঠাণ্ডা পানির প্রতি নবীজির আগ্রহের কথা তুলে ধরতে গিয়ে শিরোনাম দিয়েছেন 'শীতল শরাবান তাহুরা', ডানদিক থেকে কাজ শুরু করার গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে শিরোনাম দিয়েছেন 'বরকতময় ডান' ইত্যাদি।
📌ভাষার প্রাঞ্জলতা :
শায়খ আতীক উল্লাহর যেকোন লেখা পাঠকের হৃদয়ে দাগ কাটার আরেকটি মৌলিক কারণ হলো, ভাষার প্রাঞ্জলতা। সাবলীল বর্ণনা ও ঝরঝরে গদ্যে তিনি যেকোন লেখায় একটি মিষ্টি আবহ ছড়িয়ে দিতে পারেন। তাঁর লেখাগুলো পড়লে মনে হয় এ যেন লেখক ও পাঠকের একটি গল্পের আসর। এ বইতেও লেখক যথার্থ শব্দচয়ন ও মুগ্ধকর ঢংয়ে এবং ছোট ছোট বাক্যে বর্ণনাগুলোকে ফুলের মালার মতো করে গেঁথেছেন। এজন্য তাঁকে বাংলা গদ্যের একজন সুনিপুণ বুননশিল্পী বলা যায়।
📌দুয়ার সম্ভার :
দুয়াকে হাদীসে বলা হয়েছে 'হিসনুল মুসলিম' তথা একজন মুমিনের সুরক্ষাকবচ। ইবাদতের প্রাণই দুয়া। লেখক এ গ্রন্থের পাতায় পাতায় অসংখ্য দুয়ার কথা এনেছেন, যেগুলো বিশুদ্ধে সনদে নবীজি থেকে বর্ণিত হয়েছে। আমি মনে করি, ঘরোয়া পাঠচক্রে নিয়মিত এ গ্রন্থটির তা'লীম করা হলে পরিবার পরিজনে বিশেষ করে শিশুদের মনে দুয়ার প্রতি বাড়তি আগ্রহ তৈরী হবে। ইনশাআল্লাহ।
📌হাদীসের মূলভাব থেকে বহুমুখী শিক্ষা উপকরণ :
লেখক উল্লেখযোগ্য প্রতিটি হাদীসকে গভীর থেকে গভীরে গিয়ে বুঝার ও বুঝানোর চেষ্টা করেছেন। যেমন ৫৬৯ নং পৃষ্ঠায় রাস্তার হক সংক্রান্ত হাদীসটি থেকে লেখক আমাদের বর্তমান সমাজব্যবস্থায় বহুল প্রচলিত মানুষকে কষ্ট দেওয়া এবং অপরের হক নষ্ট করার ১৬/১৭ দিক নিয়ে লিখেছেন। এরকম অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা গ্রন্থের বহুস্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।
📌হাদীস বর্ণনায় সচেতনতা :
শর'ঈ যে কোন আমল অনুমোদন লাভের পিছনে অবশ্যই কুরআন ও সুন্নাহর কোন বিশুদ্ধ নস থাকতে হবে। এ বইয়ের আলোচনাগুলো যেহেতু নবীজির কথামালা ও আমল ঘিরেই গড়ে উঠেছে, তাই লেখক যথাসম্ভব সহীহ হাদীসের আশ্রয় নিয়েই নিজের বক্তব্য সাজিয়েছেন। হাদীসের সূত্র উল্লেখ করা হয়েছে কিন্তু মান উল্লেখ করা হয়নি এ আপত্তি উত্থাপনের সুযোগ নেই। কারণ সংকলিত প্রতিটি হাদীসই সনদের দিক থেকে বিশুদ্ধতার মানে উত্তীর্ণ। এ ব্যাপারে লেখকের বক্তব্য হল,“হাদীসগুলোতে সনদের মান সম্পর্কে আলাদা করে কিছু বলিনি। সংকলনে বর্ণিত প্রতিটি হাদীসই সহীহ। তাই আলাদা করে মান বলতে যাইনি। আমল ও ফযিলতের ক্ষেত্রে যয়ীফ হাদীসও গ্রহণযোগ্য। তাই কোথাও যয়ীফ হাদীস সংযোজিত হলে শুধু সেটার মান বলেছি। আমরা হাদীসের ‘ইবারত’ সংগ্রহ করেছি "আল বাহিসুল হাদীসি' ওয়েবসাইট থেকে। সেখানে আল্লামা আলবানী রহ.-এর তাখরীজ দেওয়া ছিল। মাঝেমধ্যে যয়ীফ হাদীস আলোচনায় সংযোজন করলে সেটার মান বলে দিয়েছি”।
লেখকের কঠোর পরিশ্রম, সাধনা, নিষ্ঠার বদৌলতেই আমরা পেয়েছি এরকম একটি মাস্টারপিস রচনা। এই গ্রন্থের প্রতিটি শব্দ ও বাক্য যেন নবীজির প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা থেকেই উৎসারিত।
» পরিশেষে, এ গ্রন্থটির লেখকের কলমে মহান আল্লাহ বারাকাহ দিন। প্রকাশকসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে কবুল করুন। পাঠকসমাজকে সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন। আমীন।
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম। রাদিয়াল্লাহু আনহুম ওয়া রাদু আনহু।
#মাকতাবাতুল_আযহার_রিভিউ_প্রতিযোগীতা_২০২২
রিভিউ লেখক : রাশেদ মুহাম্মাদ জিয়া
১৯-০৮-২০২২