18/03/2026
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ধনী মানুষের জীবন কথা-
এক কিংবদন্তি উদ্যোক্তা
যার কোন এমপি মন্ত্রি পদের দরকার হয়নি
বাংলাদেশের শিল্পোন্নয়ন, নির্মাণখাত ও প্রবাসে কর্মসংস্থানের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম শিল্পপতি জহুরুল ইসলাম।
সততা, সাহস, দূরদৃষ্টি ও মানবকল্যাণের আদর্শে গড়ে ওঠা তার কর্মজীবন তাকে দেশের অন্যতম সফল উদ্যোক্তা এবং সমাজসেবকে পরিণত করেছে।
জহুরুল ইসলামের জন্ম ১৯২৮ সালের ১ আগস্ট, বুধবার তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার (বর্তমান জেলা)বাজিতপুরের ঐতিহ্যবাহী ও বর্ধিষ্ণু গ্রাম ভাগলপুরে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে।
তাঁর পিতার নাম আলহাজ আফতাব উদ্দিন আহম্মদ এবং মাতার নাম রহিমা আক্তার খাতুন।
তার পিতা আফতাব উদ্দিন আহম্মদ ছিলেন ময়মনসিংহ অঞ্চলের একজন পরিচিত সমাজনেতা। তিনি ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং এলাকায় বহু জনহিতকর কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
জহুরুল ইসলামের পরিবার ছিল ঐতিহ্যবাহী এক বংশধারা।
ইতিহার আছে, মোঘল আমলের মধ্যভাগে তাঁর পূর্বপুরুষদের মধ্যে তিন ভাই—বাজেত খাঁ, ভাগল খাঁ ও দেলোয়ার খাঁ—মোঘল দরবারের প্রশাসনিক বা নীতিনির্ধারণী পদে দায়িত্ববান ও ক্ষমতাধর হিসেবে এই অঞ্চলে আগমন করেন।
তাঁদের নামানুসারেই এলাকার কয়েকটি স্থানের নামকরণ হয়—
বাজেত খাঁ নাম থেকে বাজিতপুর
ভাগল খাঁ নাম থেকে ভাগলপুর
দেলোয়ার খাঁ নাম থেকে বর্তমান দিলালপুর
এই বংশধারার ত্রয়োদশ প্রজন্মের উত্তরসূরি ছিলেন জহুরুল ইসলাম।
শৈশবে পরিবারের সবাই তাকে আদর করে “সোনা” বলে ডাকতেন। পরে তরুণ বয়সে তিনি পরিচিতদের কাছে “জহুর ভাই” নামে পরিচিত হন।
ব্যবসায়িক জীবনে তাঁর প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাকে সম্মান করে “চেয়ারম্যান সাহেব” বলে সম্বোধন করতেন।
তিনি প্রথমে স্থানীয় প্রাইমারি স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাস করেন। এরপর কিছুদিন সরারচর শিবনাথ হাই স্কুলে এবং পরে বাজিতপুর হাই স্কুলে পড়াশোনা করেন। এ সময় তাঁর চাচা, মহকুমা প্রকৌশলী মুর্শিদ উদ্দিনের সঙ্গে তিনি কলকাতায় চলে যান।
কলকাতায় ইংরেজি মাধ্যমে রিপন হাই স্কুল থেকে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর বর্ধমান জেলার একটি কলেজে আই.এ. শ্রেণিতে ভর্তি হন।
পরে পারিবারিক ও সামাজিক নানা প্রতিকূলতার কারণে তিনি মুন্সিগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজে কিছুদিন পড়াশোনা করেন। কিন্তু পরিবারের দায়িত্ব ও বাস্তব পরিস্থিতির চাপে তার আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন আর এগোয়নি।
তবে শিক্ষার গুরুত্ব তিনি আজীবন হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন এবং পরবর্তীকালে শিক্ষা বিস্তারে উদারভাবে অবদান রাখেন।
১৯৪৮ সালে তিনি মাত্র ৮০ টাকা মাসিক বেতনে সি অ্যান্ড বি (Construction and Building) বিভাগে ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে চাকরি শুরু করেন। সেখানে কাজ করার মাধ্যমে নির্মাণ ও প্রকৌশল সংক্রান্ত বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
১৯৫১ সালে চাকরি ছেড়ে তিনি ঠিকাদারি ব্যবসা শুরু করেন। প্রথমদিকে তিনি একটি সরকারি অফিসে ১২০০ টাকার স্টেশনারি সরবরাহের কাজ পান। এরপর কিশোরগঞ্জ পোস্ট অফিস নির্মাণ এবং পরে ঢাকার গুলিস্তান থেকে টিকাটুলি সড়ক নির্মাণের ঠিকাদারি লাভ করেন।
অল্প সময়ের মধ্যেই তার দক্ষতা ও পরিশ্রমের ফলে তিনি একজন প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
আর্থিক অবস্থার উন্নতির পর তিনি তার পিতার ১৩ সদস্যের পরিবারকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি একটি বৃহৎ একান্নবর্তী পরিবার ধরে রেখেছিলেন, যা ১৯৯০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।
১৯৫৬ সালে তিনি সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার থানার এক সম্মানিত পরিবারে জন্ম নেওয়া অধ্যাপক মোশাহেদ আলী চৌধুরীর কন্যা সুরাইয়া বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। সুরাইয়া বেগম ছিলেন তার জীবনের বড় অনুপ্রেরণা।
দাম্পত্য জীবনে তিনি এক ছেলে ও চার কন্যার জনক ছিলেন—
মঞ্জুরুল ইসলাম (বাবলু)
সাইদা ইসলাম (বেবী)
মাফিদা ইসলাম (শিমি)
নাইমা ইসলাম (ইমা)
কানিতা ইসলাম
তিনি ছিলেন ১১ ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয়।
১৯৬৫ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন Eastern Housing Limited, যা বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত।
১৯৭৫ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন Bengal Development Corporation (বিডিসি)। এই প্রতিষ্ঠানই প্রথম বাংলাদেশি কোম্পানি হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিযোগিতামূলক নির্মাণকাজ শুরু করে।
তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে—
জাতীয় সংসদ ভবনের আঙ্গিনা
বাংলাদেশ ব্যাংক ভবন
বাংলাদেশ হাইকোর্ট ভবন
সুপ্রিম কোর্ট কমপ্লেক্স
এমপি হোস্টেল
দেশের বিভিন্ন প্রধান মহাসড়ক
মধ্যপ্রাচ্যেও তার প্রতিষ্ঠান উল্লেখযোগ্য কাজ সম্পন্ন করে। যেমন—
আবুধাবিতে নতুন প্রযুক্তিতে প্রায় ৫০০০ বাড়ি নির্মাণ
ইরাক ও ইয়েমেনে উপশহর নির্মাণ
এর মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন একজন পথিকৃৎ।
সমাজসেবা ও মানবিক উদ্যোগ
জহুরুল ইসলাম ছিলেন অসাধারণ মানবপ্রেমী।
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় তিনি কিশোরগঞ্জ এলাকায় প্রায় ২০০টি লঙ্গরখানা চালু করেন এবং প্রায় পাঁচ মাস ধরে অসংখ্য দরিদ্র মানুষের খাদ্যের ব্যবস্থা করেন।
১৯৮৯ সালে তিনি নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন Zahurul Islam Medical College, যা গ্রামীণ পরিবেশে প্রতিষ্ঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ মেডিক্যাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে আজও সুনামের সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি দেশের স্বাধীনতার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সে সময় তিনি লন্ডনে অবস্থান করে ছদ্মনামে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।
বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি Abu Sayeed Chowdhury তার গ্রন্থ “প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি”-তে জহুরুল ইসলামের আর্থিক সহায়তার কথা উল্লেখ করেছেন।
এছাড়া ভাষা আন্দোলন ও ঐতিহাসিক আগরতলা মামলার সময়ও তিনি ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন খরচ বহন করে আন্দোলনকারীদের সহায়তা করেছিলেন।
তিনি ছিলেন ক্রীড়ানুরাগী মানুষ। তিনি Mohammedan Sporting Club-এর সদস্য ছিলেন এবং নাভানা ক্রিকেট টুর্নামেন্টের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন।
দেশবরেণ্য এই শিল্পপতি ১৯৯৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য সিঙ্গাপুরে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৯৯৫ সালের ১৮ অক্টোবর রাত ২টা ৩০ মিনিটে তিনি ইহধাম ত্যাগ করেন।
জহুরুল ইসলাম ছিলেন বাংলাদেশের শিল্পায়ন, নির্মাণশিল্প, প্রবাসে কর্মসংস্থান এবং মানবকল্যাণমূলক উদ্যোগের এক অনন্য পথিকৃৎ। তার দূরদৃষ্টি, দেশপ্রেম ও মানবিকতা তাকে জীবদ্দশায়ই এক জীবন্ত কিংবদন্তিতে পরিণত করেছিল।
তার কর্ম, আদর্শ ও দেশপ্রেম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।