23/08/2026
ঢাকা ইস্ট-ওয়েস্ট এক্সপ্রেসওয়ে নিয়ে দুই সংস্থার টানাটানি
তাওহীদুল ইসলাম
১২ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
ঢাকার চারপাশে বিকল্প সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং রাজধানীতে আন্তঃজেলা যানবাহনের চাপ কমাতে প্রায় ৩৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা ইস্ট-ওয়েস্ট এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক থেকে শুরু হয়ে ঢাকা-মাওয়া ও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ মহাসড়ক অতিক্রম করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যুক্ত হবে নতুন এই এক্সপ্রেসওয়ে। আঁটিবাজারসংলগ্ন বলিয়ারপুর থেকে শুরু হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের লাঙ্গলবন্দে শেষ হবে।
তবে এক প্রকল্প নিয়ে সরকারের দুটি সংস্থার টানাটানি চলছে। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ এবং সড়ক ও জনপথ একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে। উভয় সংস্থাই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে চায়। সমতলে এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করতে চায় সওজ। আর সেতু কর্তৃপক্ষ বলছে, জমি অধিগ্রহণসহ নানা কারণে খরচের মাত্রা বাড়বে। তাই সমতল নয়, উড়ালপথে নির্মাণ করতে হবে এক্সপ্রেসওয়েটি। এ কারণে সেতু কর্তৃপক্ষের করা সমীক্ষা প্রতিবেদনটি এখনও অনুমোদনের অপেক্ষায়। এর আগে আরেকবার একই প্রকল্পের সমীক্ষা করেছিল সংস্থাটি। সর্বশেষ অবস্থা, মন্ত্রীর সভাপতিত্বে উভয় সংস্থার কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এতে সফল না হলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা নেওয়ার কথা রয়েছে। তবে এ ইস্যুতে কথা বলতে রাজি হননি সংস্থা দুটির কর্মকর্তারা।
সেতু বিভাগ ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) তত্ত্বাবধানে প্রকল্পটি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে। ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি (সিসিইএ) প্রকল্পটি পিপিপির মাধ্যমে বাস্তবায়নের নীতিগত অনুমোদন দেয়। এরপর প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হালনাগাদ করা হয়েছে। সর্বশেষ হালনাগাদ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা নিয়ে ২০২৬ সালের ৭ জুলাই পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় উপস্থাপন করা হয়।
সরকারি সূত্র বলছে, ইতোমধ্যে ১৭টি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও নির্মাণ ঠিকাদার প্রকল্পটিতে বিনিয়োগ এবং অংশগ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে প্রকল্পের চূড়ান্ত অ্যালাইনমেন্ট, ভূমি অধিগ্রহণ, সরকারি আর্থিক সহায়তার ধরন এবং পিপিপি কাঠামো চূড়ান্ত হওয়ার পর বিনিয়োগকারী নির্বাচনের প্রক্রিয়া এগোবে। প্রকল্পটির প্রাথমিক নির্মাণ ও ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা। এর সঙ্গে ভৌত ও মূল্যজনিত জরুরি ব্যয় বা কনটিনজেন্সি যোগ করলে মোট প্রকল্প ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ৪৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে কেবল ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন ও সংশ্লিষ্ট ব্যয়েই লাগবে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা।
বলিয়ারপুর থেকে লাঙ্গলবন্দ : প্রস্তাবিত ঢাকা ইস্ট-ওয়েস্ট এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের অ্যালাইনমেন্ট ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বলিয়ারপুর বা হেমায়েতপুর এলাকা থেকে শুরু হয়ে
সাভার, কেরানীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা অতিক্রম করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের লাঙ্গলবন্দ পর্যন্ত যাবে। প্রকল্পের দৈর্ঘ্য ৩৮ দশমিক ৯৮০ কিলোমিটার। তবে পাঁচটি ইন্টারচেঞ্জ এবং সংযোগ সড়কসহ প্রকল্পের জরিপ ও পরিকল্পনাভুক্ত মোট করিডরের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬১ কিলোমিটার। প্রস্তাবিত প্রকল্পে পাঁচটি প্রধান ইন্টারচেঞ্জ থাকবে। এগুলো হলো- ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের এন৫, আঁটিবাজার-কলাতিয়া সড়ক, ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের এন৮, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ মহাসড়কের এন১১১ এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের এন১। এসব ইন্টারচেঞ্জের মাধ্যমে মূল এক্সপ্রেসওয়ে থেকে বিভিন্ন মহাসড়কে যানবাহন ওঠানামার জন্য মোট ১৬টি র্যাম্প নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো, বিভিন্ন অঞ্চলের আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার যানবাহনকে ঢাকার কেন্দ্রীয় এলাকায় প্রবেশ না করিয়ে রাজধানীর চারপাশ দিয়ে চলাচলের সুযোগ তৈরি করা।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, এটি পদ্মা সেতু করিডর এবং এশিয়ান হাইওয়ে-১-এর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি করবে। ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও পদ্মা সেতু করিডর থেকে আসা যানবাহন, পাশাপাশি চট্টগ্রাম, সিলেটসহ পূর্বাঞ্চল থেকে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলমুখী যানবাহনের একটি অংশ ঢাকার মূল শহরে প্রবেশ না করেই গন্তব্যে যেতে পারবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ২০টি জেলার সঙ্গে দেশের পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগে বিকল্প পথ তৈরি হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এতে রাজধানীর অভ্যন্তরে বিশেষ করে আন্তঃজেলা মালবাহী যানবাহনের চাপ কমতে পারে। হালনাগাদ সম্ভাব্যতা সমীক্ষায়ও বলা হয়েছে, প্রকল্পটি ঢাকার মধ্য ও বাইরের রিং রোড ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কাজ করবে। রাজধানীর যানজট কমাতে মেট্রোরেল, বাস র্যাপিড ট্রানজিট ও অন্যান্য গণপরিবহন ব্যবস্থার পাশাপাশি রিং রোড এবং এক্সপ্রেসওয়ে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার যে পরিকল্পনা রয়েছে, তার সঙ্গে এই প্রকল্পকে যুক্ত করা হয়েছে।
কেন পুরোটা এলিভেটেড : সেতু বিভাগের হালনাগাদ সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রকল্পটির পুরো অংশ এলিভেটেড বা উড়ালপথে নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রকল্প এলাকার নিম্নভূমি, জলাভূমি, নদী-খাল, দুর্বল মাটি এবং ভূমির সীমাবদ্ধতাকে এ সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকল্প এলাকায় বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীর পাশাপাশি একটি পুরনো ধলেশ্বরী শাখা এবং ১১টি খালের ওপর সেতু নির্মাণ করতে হবে। জরিপে প্রকল্প এলাকায় ২৪৪টি পুকুর চিহ্নিত হয়েছে, যার মধ্যে ১৩৯টি সারা বছর পানিযুক্ত। ভূতাত্ত্বিক তদন্তে মাটির গঠন দুর্বল হওয়ায় গভীর ভিত্তির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে। সমীক্ষায় আংশিক এলিভেটেড ও আংশিক মাটির ওপর সড়ক নির্মাণের বিকল্পও বিবেচনা করা হয়েছে। তবে এতে বড় অংশে ভূমি অধিগ্রহণ, স্থানীয় সড়ক ও বসতি বিচ্ছিন্ন হওয়া, পানি নিষ্কাশন এবং জলাবদ্ধতার সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। সেতু বিভাগের যুক্তি হলো, একাংশ এলিভেটেড এবং বাকি অংশ অ্যাট-গ্রেড নির্মাণ করা হলে অতিরিক্ত কৃষিজমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে। এতে ভূমি অধিগ্রহণের ব্যয় ও সময় বাড়ার পাশাপাশি পানিপ্রবাহ ও পরিবেশের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে পুরোপুরি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করলে নকশাগত গতি বজায় রেখে যানবাহনের নিরবচ্ছিন্ন চলাচল নিশ্চিত করা সহজ হবে। হালনাগাদ সমীক্ষায় এক্সপ্রেসওয়েটির নকশাগত গতি ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। মূল সড়কে যানবাহনের পরিচালন গতি পরিস্থিতিভেদে ৮০ থেকে ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। প্রাথমিক পরিকল্পনায় চার লেনের এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কথা বলা হয়েছে।
নির্মাণ ব্যয় ২২ হাজার কোটি, জমি অধিগ্রহণে ১৪ হাজার কোটি : হালনাগাদ সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রকল্পের সিভিল ওয়ার্কস বা মূল অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩৭ দশমিক ১৮৭ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট নির্মাণে প্রায় ১২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা, নদী ও অন্যান্য বড় সেতুতে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, পাঁচটি ইন্টারচেঞ্জে প্রায় ৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং টোল প্লাজা ও অন্যান্য সুবিধায় প্রায় ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব করা হয়েছে। অন্যদিকে ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন এবং পুনঃস্থাপন ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা।
পিপিপিতে কতটা লাভজনক : প্রকল্পটি পিপিপি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন আর্থিক কাঠামো পর্যালোচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ন্যূনতম ট্রাফিক গ্যারান্টি, ন্যূনতম রাজস্ব গ্যারান্টি, অ্যাভেইলেবিলিটি পেমেন্ট, সম্পূর্ণ বাজারভিত্তিক পিপিপি, হাইব্রিড মডেল এবং ভায়াবিলিটি গ্যাপ ফান্ডিং (ভিজিএফ) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
পিপিপি প্রকল্প হিসেবে নির্মাণ হলে মূল অবকাঠামো নির্মাণে বেসরকারি বিনিয়োগকারীর অর্থ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে টোল আদায়ের মাধ্যমে বিনিয়োগের একটি অংশ ফেরত দেওয়ার কাঠামো বিবেচনা করা হচ্ছে।
২০৩০ সালের মধ্যে নির্মাণ শেষের লক্ষ্য : হালনাগাদ সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রকল্পের প্রস্তুতিপর্ব ২০২৫-২৬, নির্মাণকাল ২০২৭ থেকে ২০৩০ এবং পরবর্তী ৩০ বছর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রস্তাব করা হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসনে তিন বছর এবং নির্মাণে চার বছর সময় ধরা হয়েছে। দুটি কার্যক্রম আংশিকভাবে একসঙ্গে চালানো সম্ভব কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়ার প্রাথমিক সূচি অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান থেকে পছন্দের বিনিয়োগকারী নির্বাচন, আলোচনা, আইনি যাচাই, সিসিইএর চূড়ান্ত অনুমোদন এবং লেটার অব অ্যাওয়ার্ড পর্যন্ত প্রায় ২৭৪ দিন সময় লাগতে পারে। এখন প্রকল্পটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অ্যালাইনমেন্ট চূড়ান্ত করা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী, নকশা, ভূমি অধিগ্রহণ, অর্থায়ন ও পরিবেশগত ঝুঁকির মতো বড় চ্যালেঞ্জ থাকলেও প্রকল্পটি অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময়। এখন চূড়ান্ত অনুমোদন, পিপিপি কাঠামো এবং বিনিয়োগকারী নির্বাচন কত দ্রুত সম্পন্ন করা যায়, তার ওপর নির্ভর করবে ঢাকার চারপাশে নতুন এই পূর্ব-পশ্চিম এক্সপ্রেসওয়ে বাস্তবায়নের ভবিষ্যৎ।