30/09/2026
ছেলেটার বয়স মাত্র ২৪। কিছুদিন ধরে বিকেল হয়ে আসলে শরীর খুব দুর্বল লাগে। আগে প্রতিদিন বিকেলে মাঠে খেলতে যেত, এখন আর শরীর টানে না।
ভেবেছিল হয়তো পরিশ্রম বেশি হচ্ছে। কিন্তু দিন যায়, দুর্বলতা কমে না।
শেষে সে ডাক্তারের কাছে গেল, শুধু এই দুর্বলতা নিয়েই।
ডাক্তার প্রেশার মাপলেন। বেশি।
তারপর কয়েকটা টেস্ট লিখে দিলেন: রক্তের CBC, সিরাম ক্রিয়েটিনিন আর প্রস্রাবের পরীক্ষা।
বললেন, "রিপোর্ট নিয়ে আবার এসো।"
ছেলেটা ভাবল, সামান্য দুর্বলতায় এতগুলো টেস্ট? খরচও তো কম না। বের হয়ে সে ফার্মেসিতে গিয়ে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল, "এসব টেস্ট কি সত্যিই লাগবে?"
দোকানদার বললেন, "ধুর, ভিটামিন আর স্যালাইন খান, ঠিক হয়ে যাবে।" বাসায় এসে বললে পরিবারের লোকজন বললেন, "এসব লোভী ডাক্তাররা কমিশনের জন্য টেস্ট লেখে, এদের চাহিদার শেষ নাই। ওসব করিয়ে টাকার অপচয়ের দরকার নেই।"
যাক, ছেলেটা টেস্ট করাল না। ভিটামিন কিনল। শরীর ব্যথা হলে আগের মতোই ব্যথার ওষুধ খেতে থাকল।
কয়েক সপ্তাহ পর দুর্বলতা আরও বাড়ল।
সকালে ঘুম থেকে উঠলে চোখ ফুলে থাকে, খেতে ইচ্ছে ই করে না, রুচি একেবারেই নেই।
ভয় পেয়ে সে আবার ডাক্তারের কাছে গেল।
ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন, "টেস্টগুলো করাওনি?" ছেলেটা মাথা নিচু করে সব বলল।
ডাক্তার আর কি করবেন! বললেন, "এখনই করাও।"
রিপোর্ট এলো।
রক্তে ক্রিয়েটিনিন স্বাভাবিক থেকে বেড়ে আছে, হিমোগ্লোবিন কম, প্রস্রাবে প্রোটিন এসেছে।
ডাক্তার রিপোর্ট দেখে খুবই গম্ভীর হয়ে গেলেন, মনে হচ্ছিলো যেন ছেলেটার উপর প্রচন্ড রাগ করেছেন।
বললেন "তোমার কিডনির কাজ অনেক কমে গেছে।"
ছেলেটা স্তব্ধ হয়ে গেলো।
"কি বলেন স্যার! কিন্তু আমি তো শুধু দুর্বল ছিলাম!"
ডাক্তার বোঝালেন, কেন তিনি ওই টেস্টগুলো কেন লিখেছিলেন:
- প্রেশার বেশি ছিল। অল্প বয়সে উচ্চ রক্তচাপ সাধারণ নয়। তাই এর কারণ খোঁজা হয়, আর কিডনি রোগ তার একটি প্রধান কারণ।
- CBC: দুর্বলতার সবচেয়ে সাধারণ কারণ রক্তশূন্যতা। কিডনি নষ্ট হলেও রক্তশূন্যতা হয়।
- ক্রিয়েটিনিন: এটা দেখায় কিডনি রক্ত ঠিকমতো ছেঁকে পরিষ্কার করতে পারছে কিনা।
- প্রস্রাবের পরীক্ষা: এতে প্রস্রাবের সাথে প্রোটিন বা রক্ত বেরোচ্ছে কিনা ধরা পড়ে। এই ক্ষতি চোখে দেখা যায় না, ব্যথাও হয় না।
"টেস্ট লেখা মানে অন্ধকারে ঢিল ছোড়া নয়," ডাক্তার বললেন। "আমি প্রেশার আর তোমার কথা শুনে কয়েকটা রোগ চিন্তা করে মাথায় একটা লিস্ট বানিয়েছিলাম। টেস্ট দিয়ে সেই তালিকা লিস্ট মেলাতে চেয়েছিলাম তখন।"
আশ্চর্যজনকভাবে ডাক্তার ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলেন,
"সকালে চোখ ফুলে থাকে?"
ছেলেটা অবাক হয়ে গেলো।
"হ্যাঁ, অনেকদিন ধরেই।"
সে ভেবেছিল ঘুমের দোষ।
"প্রস্রাবে ফেনা হয়?" হ্যাঁ, সেটাও হয়। ভেবেছিল ওটা স্বাভাবিক।
"অনেকদিন আগে কখনো প্রস্রাবের রং অস্বাভাবিক হয়েছিল?" ছেলেটা মনে করল, তিন বছর আগে গলাব্যথা আর জ্বরের এক দুইদিন পর প্রস্রাব হয়ে গিয়েছিল চায়ের মতো গাঢ়। দুইদিন পর আপনিই ঠিক হয়ে গেছে, তাই আর গুরুত্ব দেয়নি।
"ব্যথার ওষুধ খাও?" সে মাথা নাড়ল। শরীর ব্যথা হলেই ফার্মেসি থেকে flexi, flamex এসব ওষুধ কিনে খেত, প্রায়ই।
"প্রেশার কখনো মেপেছ?" না, কখনো না। মাথাব্যথা হতো মাঝে মাঝে, সেটাও ব্যথার ওষুধ দিয়ে চাপা দিয়েছে।
ডাক্তার বললেন, "এই সবগুলোই ছিল সংকেত। তুমি বুঝতে পারোনি।"
আসলে ভেতরে কী ঘটছিল?
আমাদের কিডনির ভেতরে লক্ষ লক্ষ ছোট ছাঁকনি আছে, নাম গ্লোমেরুলাস। তিন বছর আগের ইনফেকশনের সময় সম্ভবত তার শরীরে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি প্রোটিন (IgA) ভুল করে ছাঁকনিতে জমে প্রদাহ তৈরি করেছিল। ছাঁকনি ক্ষতিগ্রস্ত হলে রক্ত আর প্রোটিন প্রস্রাবে বেরিয়ে যায়। রক্ত গেলে প্রস্রাবের রং বদলায়, প্রোটিন গেলে ফেনা হয়। আর কিডনি লবণ-পানি ঠিকমতো বের করতে না পারলে সকালে চোখ ফোলে।
প্রদাহ বারবার হলে ছাঁকনিতে দাগ পড়ে, সেগুলো আর কাজ করে না। তখন বাকি ছাঁকনির ওপর চাপ বাড়ে, সেগুলোও ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়। কিডনি নষ্ট হলে রক্তচাপ বাড়ে, আবার বাড়তি চাপ কিডনিকে আরও নষ্ট করে। ব্যথার ওষুধ কিডনিতে রক্তপ্রবাহ কমিয়ে ক্ষতি আরও বাড়ায়।
এভাবে বছরের পর বছর চলে, কোনো ব্যথা হয় না। যখন রক্তে ক্রিয়েটিনিন এর মত বর্জ্য জমে আর রক্তশূন্যতা আসে, তখনই শরীরের শক্তি ফুরিয়ে যায়। তাই মাঠে যাওয়ার জোরটাও আর থাকে না।
ডাক্তার বললেন, "কারণ নিশ্চিত করতে আরও পরীক্ষা লাগবে। তবে সম্ভাবনা একটা গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস, যেমন IgA নেফ্রোপ্যাথি।
নষ্ট হয়ে যাওয়া অংশ ফিরে আসবে না, কিন্তু যেটুকু বাকি আছে সেটুকু বাঁচানো যাবে। যত আগে ধরা পড়ে, তত বেশি বাঁচানো যায়। ওই কয়েকটা সপ্তাহ যদি নষ্ট না হতো, হয়তো আরও ভালো থাকত।"
তরুণদের কিডনি বিকলের কারণ শুধু এটাই নয়। জন্মগত ত্রুটি, ছোটবেলার বারবার প্রস্রাবের ইনফেকশনের দাগ, বংশগত রোগ, লুপাস, টাইপ ১ ডায়াবেটিসও কারণ হতে পারে।
আর ডায়রিয়া বা বমি কিংবা অত্যাধিক গরমে পানিশূন্যতার সময় ব্যথার ওষুধ খেলে দুর্বল কিডনি হঠাৎ আরও খারাপ হয়ে যেতে পারে।
এই লক্ষণগুলো দেখলে দেরি না করে ডাক্তার দেখান:
1. সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখমুখ বা পা ফোলা
2. প্রস্রাবে ফেনা, যা সহজে মেলায় না
3. প্রস্রাব লাল, কোলার মতো বা চায়ের রঙের হওয়া, বিশেষ করে গলাব্যথা বা জ্বরের পরপর
4. রক্তচাপ বেশি ধরা পড়া বা ঘন ঘন মাথাব্যথা
5. প্রস্রাব কমে যাওয়া, রাতে বারবার প্রস্রাব
6. কারণ ছাড়া দুর্বলতা, রুচি কমা, বমি বমি ভাব, চুলকানি
আর একটা কথা।
ডাক্তারের লেখা টেস্ট নিয়ে মনে সন্দেহ আসা অস্বাভাবিক না। কিন্তু সেই সন্দেহের উত্তর ফার্মেসির দোকানদার বা এলাকার হামবড়া কেউ দিতে পারবেন না।
যিনি টেস্ট লিখেছেন তাঁকেই জিজ্ঞেস করুন, "কেন লিখলেন, এটা দিয়ে কী বোঝা যাবে?" একজন ভালো ডাক্তার বুঝিয়ে বলবেন। তবুও সন্দেহ থাকলে অন্য ডাক্তারের মতামত নিন, কিন্তু টেস্ট ফেলে রাখবেন না।
পরিবারে কিডনি রোগ থাকলে, ডায়াবেটিস থাকলে বা ছোটবেলায় বারবার প্রস্রাবের ইনফেকশন হয়ে থাকলে বছরে একবার প্রস্রাবের পরীক্ষা, রক্তে ক্রিয়েটিনিন আর রক্তচাপ দেখিয়ে নিন। আর ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন ব্যথার ওষুধ খাবেন না।
কিডনির রোগ নীরবে আসে। তাই দুর্বলতা এসে জানান দেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন না।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেফাজতে রাখুন।
সচেতন হোন, সুস্থ থাকুন।
~শাহরিয়ার, এমবিবিএস ফাইনাল ইয়ার।