17/07/2026
ফিফা রেংকিং এর গাণিতিক রহস্য: গণিত কীভাবে ফুটবল নিয়ন্ত্রণ করে?
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮১ নম্বরে, আর ফ্রান্সের ১ নম্বরে। একজন ফুটবলপ্রেমী হিসাবে আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন এই রেংকিং কিভাবে নিরধারণ করা হয়? এটা কি শুধু হার-জিতের হিসাব, নাকি এই নম্বর ঠিক করার পেছনে রয়েছে উচ্চতর কোনো গাণিতিক সমীকরণ? আজকের আলোচনায় আমরা একজন গণিতবিদের চোখে দেখবো ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের সেই গাণিতিক সূত্র, যা ২০১৮ সালে সংশোধন করা হয়েছে এবং ফুটবলের মানদন্ডে একটি দেশের অবস্থান নির্ধারণ করে আসছে।
সূত্রের পরিচয় : P = P_{before} + I (W - W_e)
ফিফা বর্তমানে ব্যবহার করে Elo Rating System। আজকের আলোচনায় আমরা এই সিস্টেমের ব্যাখ্যা একটি বাস্তব উদাহরণের মধ্য দিয়ে আপনাদের সামনে পরিস্কার করে দেব ইনশাল্লাহ। এই সূত্রের চারটি প্রধান অংশ আছে।
১. P_{before}: ম্যাচ শুরুর আগের পয়েন্ট।
২. I (Importance): ম্যাচের গুরুত্ব। প্রীতি ম্যাচের চেয়ে বিশ্বকাপের নক-আউট ম্যাচের গুরুত্ব এবং পয়েন্ট—দুই-ই অনেক বেশি।
৩. W (Result): আপনি জিতলে ১, ড্র করলে ০.৫ আর হারলে ০ পয়েন্ট পাবেন।
৪: আসল টুইস্ট—W_e বা প্রত্যাশিত ফলাফল
সূত্রের সবচেয়ে জটিল এবং মজার অংশ হলো W_e। এটি মূলত একটি প্রবাবিলিটি বা সম্ভাবনা। সূত্রটি হলো: W_e = 1\[10^{(-dr/600)} + 1]। সহজ কথায়, যদি ফ্রান্স (শক্তিশালী) বাংলাদেশের (দুর্বল) সাথে খেলে, তবে গণিত বলবে ফ্রান্সের জেতার সম্ভাবনা ৯৮%। যদি ফ্রান্স জিতে যায়, তবে তারা খুব সামান্য পয়েন্ট পাবে। কিন্তু যদি বাংলাদেশ ড্র করে বা জিতে যায়, তবে তারা বিশাল পয়েন্ট পাবে। কারণ তারা গাণিতিক সম্ভাবনাকে ভুল প্রমাণ করেছে!
একজন সয়েল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে আমরা যেমন মাটির ওপর চাপের ভারসাম্য বা 'Equilibrium' হিসাব করি, ফিফা র্যাঙ্কিংও অনেকটা তেমন। এটি একটি 'Zero-sum game'। অর্থাৎ, এক দল যা হারাবে, অন্য দল ঠিক তাই পাবে। এখানে সিস্টেম সবসময় পয়েন্টের ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে।
একজন সয়েল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে আমরা যখন মাটির ভারবহন ক্ষমতা বা 'Bearing Capacity' মাপি, তখন আমরা নির্দিষ্ট কিছু প্যারামিটার ব্যবহার করি। ঠিক তেমনি, ফিফাও একটি দলের শক্তি মাপার জন্য একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক মডেল ব্যবহার করে, যার নাম 'Elo Rating System'। চলুন উদাহরণ হিসাবে দেখি, যদি আজ ফ্রান্স আর বাংলাদেশের খেলা হয়, তবে পয়েন্টের ভাগযোগ কেমন হবে।
মূল সূত্র ও প্যারামিটার
P = P_{before} + I (W - W_e)
এখন চলুন মানগুলো বসাই:
১. P_{before}: ফ্রান্সের বর্তমান পয়েন্ট 1948.97 এবং বাংলাদেশের পয়েন্ট 902.93 ।
২. I (ম্যাচের গুরুত্ব): ধরুন এটি একটি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচ। এই ধরনের ম্যাচের জন্য ফিফা নির্ধারিত মান I = ২৫।
৩. W (ফলাফল):
• জয় = ১
• ড্র = ০.৫
• হার = ০
৪.: প্রত্যাশিত ফলাফল (W_e) বের করার আসল ম্যাজিক
এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খেলা শুরু হওয়ার আগেই গণিত বলে দেবে কার জেতার সম্ভাবনা কতটুকু।
সূত্র: W_e =1/[10^{-dr/600} + 1] (এখানে dr হলো দুই দলের পয়েন্টের পার্থক্য: ১৯৪৮.৯৭ – ৯০২.৯৩ = ১০৪৬.০৪)
হিসাব করলে দেখা যাবে:
• ফ্রান্সের জন্য W_e হবে প্রায় ০.৯৮ (অর্থাৎ তাদের জেতার সম্ভাবনা ৯৮%)
• বাংলাদেশের জন্য W_e হবে প্রায় ০.০২ (জেতার সম্ভাবনা মাত্র ২%)
তিনটি ভিন্ন পরিস্থিতির গাণিতিক ফলাফল
পরিস্থিতি ১: যদি ফ্রান্স জিতে যায় (যা প্রত্যাশিত)
• ফ্রান্সের নতুন পয়েন্ট: ১৯৪৮.৯৭ + ২৫ (১ - ০.৯৮) = ১৯৪৮.৯৭ + ০.৫০ = ১৯৪৯.৪৭
• বাংলাদেশের নতুন পয়েন্ট: ৯০২.৯৩ + ২৫ (০.০ - ০.০২) = ৯০২.৯৩ -০.৫ = ৯০২.৪৩
• ফলাফল: মাত্র ০.৫০ পয়েন্ট যোগ বিয়োগ হবে। কারণ শক্তিশালী দল হয়ে দুর্বলকে হারিয়েছে।
পরিস্থিতি ২: যদি ম্যাচটি ড্র হয় (অপ্রত্যাশিত)
• ফ্রান্সের পয়েন্ট: ১৯৪৮.৯৭ + ২৫ (০.৫ - ০.৯৮) = ১৯৪৮.৯৭ – ১২.০ = ১৯৩৬.৯৭
• বাংলাদেশের নতুন পয়েন্ট: ৯০২.৯৩ + ২৫ (০.৫ - ০.০২) = ৯০২.৯৩ +১২ = ৯১৪.৯৩
দেখুন, ড্র করার কারণে শক্তিশালী ফ্রান্স ১২.০ পয়েন্ট হারালো, আর দুর্বল বাংলাদেশ সেই পয়েন্ট বোনাস পেলো।
পরিস্থিতি ৩: যদি বাংলাদেশ মিরাকল ঘটিয়ে জিতে যায়!
• ফ্রান্সের পয়েন্ট: ১৯৪৮.৯৭ + ২৫ (০.০ - ০.৯৮) = ১৯৪৮.৯৭ – ২৪.৫ = ১৯২৪.৪৭
• বাংলাদেশের নতুন পয়েন্ট: ৯০২.৯৩ + ২৫ (১.০ - ০.০২) = ৯০২.৯৩ +২৪.৫ = ৯২৭.৪৩
• ফলাফল: এক ম্যাচেই বাংলাদেশের বিশাল লাফ!
তাহলে বুঝতেই পারছেন, ফিফা র্যাঙ্কিং শুধু জেতা-হারার বিষয় নয়, এটি একটি গাণিতিক ভারসাম্য বা 'Equilibrium'। আপনি কার সাথে খেলছেন এবং সেই ম্যাচের গুরুত্ব কতটুকু, সেটাই নির্ধারণ করে আপনার পয়েন্ট বাড়বে না কমবে। গণিতের এই চমৎকার প্রয়োগটি আপনার কাছে কেমন লাগলো? কমেন্টে জানান আর ফলো দিয়ে আমাদের পাশেই থাকুন।