14/07/2026
ব্রোকারেজ বা দালালি ব্যবসা ইসলামে মূলত হালাল ও জায়েজ, যদি তা সততা, আমানতদারিতা এবং প্রতারণামুক্তভাবে করা হয়।
চলুন, রেফারেন্স হিসেবে কোরআনের কিছু আয়াত বিশ্লেষণ করি।
"আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।"
(সূরা আল-বাকারা ২:২৭৫)
ব্রোকারি ব্যবসারই একটি অংশ। যদি তা বৈধ ব্যবসার মধ্যস্থতা হয়, তাহলে এটি এই সাধারণ হালালের অন্তর্ভুক্ত।
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা চুক্তিসমূহ পূর্ণ কর।"
(সূরা আল-মায়িদা ৫:১)
ব্রোকারের দায়িত্ব হলো উভয় পক্ষের সাথে করা চুক্তি সঠিকভাবে পালন করা।
"তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না"
(সূরা আন-নিসা ৪:২৯)
অর্থাৎ কমিশন যদি প্রতারণা, মিথ্যা তথ্য বা জোরপূর্বক আদায় করা হয়, তাহলে তা হারাম হবে।
চলুন, এবার রেফারেন্স হিসেবে কিছু সহীহ হাদিস বিশ্লেষণ করি।
"সত্যবাদী ও আমানতদার ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সিদ্দীক ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে।"
(তিরমিযী, হাদিস: ১২০৯)
ব্রোকারও একজন ব্যবসায়িক মধ্যস্থতাকারী। তাই সততার সঙ্গে কাজ করলে এই ফজিলতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আশা করা যায়।
"যে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।"
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০২)
অতএব, ব্রোকার যদি তথ্য গোপন করে, ভুয়া দাম বলে, নকল কাগজ দেখায় বা প্রতারণা করে কমিশন নেয়, তাহলে সেই আয় হারাম হবে।
ব্রোকারি কখন হালাল হবে?
ইসলামের দৃষ্টিতে একজন রিয়েল এস্টেট প্রফেশনাল বা ব্রোকার হিসেবে আপনার সেলস কমিশন সম্পূর্ণ হালাল হবে, যদি আপনি:
- সত্য তথ্য দেন।
- প্রপার্টির সমস্যা গোপন না করেন।
- ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের অধিকার রক্ষা করেন।
- আগে থেকেই কমিশনের বিষয়টি পরিষ্কারভাবে অবহিত করেন।
- কারো সঙ্গে প্রতারণা না করেন।
ব্রোকারি হারাম হবে!
যদি ব্রোকার:
❌ মিথ্যা তথ্য দেয়
❌ দামের বিষয়ে প্রতারণা করে
❌ দুই পক্ষের কাছ থেকে গোপনে কমিশন নেয়
❌ কাগজপত্রে জালিয়াতি করে
❌ অবৈধ সম্পদ (মদ, জুয়া, সুদভিত্তিক চুক্তি ইত্যাদি) বিক্রির মধ্যস্থতা করে
❌ ঘুষ গ্রহণ করে
তাহলে সেই কমিশন হারাম হবে।
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন:
"কেউ যদি বলে, 'এই কাপড়টি বিক্রি করে দাও। এত দামে বিক্রি করতে পারলে অতিরিক্ত যা থাকবে, তা তোমার', এতে কোনো অসুবিধা নেই।"
রেফারেন্স:
সহীহ আল-বুখারী, Kitab al-Ijarah, "Bab Ajr al-Samsarah"
কায়েস ইবন আবি গারাযাহ (রা.) বলেন:
"আমরা মদিনায় 'সামাসিরাহ' (দালাল/ব্রোকার) নামে পরিচিত ছিলাম। একদিন রাসূল ﷺ আমাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি আমাদের এমন একটি নামে ডাকলেন, যা এর চেয়েও উত্তম। তিনি বললেন, 'হে ব্যবসায়ীগণ!'"
এরপর তিনি বললেন:
"ব্যবসায় অনেক সময় অনর্থক কথা ও শপথ মিশে যায়। তাই তোমরা সদকা দ্বারা তা পরিশুদ্ধ করো।"
রেফারেন্স:
সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৩৩২৬
সুনান তিরমিযী, হাদিস ১২০৮
সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস ২১৪৫
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, রাসূল ﷺ দালালি পেশা নিষিদ্ধ করেননি, বরং দালালদের "ব্যবসায়ী" হিসেবে সম্বোধন করেছেন এবং ব্যবসায় সততা বজায় রাখতে উপদেশ দিয়েছেন। যদি দালালি হারাম হতো, তাহলে তিনি তা নিষিদ্ধ করতেন।
হানাফি, মালেকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি, চার মাজহাবের ফকীহগণই সামসারাহ (Brokerage)-কে বৈধ বলেছেন, যদি:
- কমিশন পূর্বনির্ধারিত বা প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী হয়,
- প্রতারণা না থাকে,
- লেনদেন বৈধ হয়।
উপসংহার:
হাদিস ও সাহাবিদের আমল থেকে স্পষ্ট হয় যে:
✅ দালালি বা ব্রোকারি পেশা জায়েজ।
✅ কমিশন নেওয়াও জায়েজ।
❌ তবে মিথ্যা, তথ্য গোপন, প্রতারণা, জালিয়াতি বা অবৈধ লেনদেনের মধ্যস্থতা করলে সেই আয় হারাম হবে।