28/02/2026
বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও বিখ্যাত কিছু মন্দিরের জমি সরকারিভাবে দখল করা ও সারাদেশের শত শত মন্দিরের জমিতে মসজিদ ও মাদ্রাসা বানানোর ইতিহাস কি আমাদের জানা দরকার? এই ইতিহাস আমি বলতে গেলে কি ‘সম্প্রীতি’ নষ্ট হয়ে যাবে? পৃথিবীতে একটি পরিত্যাক্ত মসজিদ বাবরী ভাঙার কথা গোটা পৃথিবীবাসী জানে, শুধু জানেই না, এ জন্য ভারতকে ‘উগ্র হিন্দুত্ব’ এমন প্রচারণা আজো শুনতে হয়। কিন্তু হাইয়া সোফিয়া গির্জাকে জামে মসজিদ বানানোর ঘটনায় হালে পানি পায় না। এই বাংলাদেশে একদম নামধাম ধরে ধরে মন্দিরগুলোর কথা বলতে পারি যেগুলোর জমিতে এখন নামকরা কিছু মসজিদ তৈরি হয়েছে। ইতিহাস জানলে সম্প্রীতি নষ্ট হয় না। আত্মজিজ্ঞাসা তৈরি হয়। সেটাই মঙ্গল। তাই এখন বাংলাদেশের মন্দিরের জমি দখল করার ইতিহাস কিছু বলার চেষ্টা করি।
শুরুটা করি রমনা কালী মন্দির নিয়ে। এই মন্দিরের উপর অভিশাপ নেমে আসে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে। এখানে পাকিস্তানী সেনারা সেবায়েত, সাধুসহ সাধারণ ভক্তদের নির্বিচারে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। এই গণহত্যার স্মৃতিচিহ্ন কোথাও সংরক্ষণ নেই। উল্টো দেশ স্বাধীনের পর অত্যন্ত নির্মমভাবে রমনা কালী মন্দিরকে উচ্ছেদ করা হয়। এই মন্দিরের ২.২২ একর জমি গণপূর্ত বিভাগ তাদের অধিনে নিয়ে নেয়। এটি স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম রাষ্ট্রীয়ভাবে হিন্দু দেবত্ত সম্পত্তি দখল করে নেয়া। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় ছিল রমনা মন্দিরের জমিকে অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে দেখানো। অথচ দেবত্ত সম্পত্তিকে অর্পিত বা শত্রু সম্পত্তি দেখানো যাবে না আইনে বলা আছে। দীর্ঘ তিন দশক ধরে একটি টিনের ঘরে মন্দিরটি সীমাবদ্ধ ছিল এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের চাপের মুখে সরকার আংশিক জমিটি ব্যবহার করার অনুমতি দেয়। কিন্তু রমনা মন্দিরের পুরো জমি সোহওয়ার্দী উদ্যানে একিভূত করা হয়েছে যা একটি সরকারী দখল চিত্র। রমনা মন্দিরের জমি দখল হয়ে আছে ঢাকা ক্লাবের ভেতরও। ঢাকা ক্লাব, শাহবাগ থানা, শিশুপার্ক, শিখা চিরন্তন, স্বাধীনতা জাদুঘরসহ সোহওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল একটি অংশ ছিল রমনা কালী মন্দিরের সম্পত্তি।
বাংলাদেশের ‘জাতীয় মন্দির’ নামের একটি গালভরা স্বীকৃতি আছে। সেই জাতীয় মন্দিরটির নাম ঢাকেশ্বরী মন্দির। এর ইতিহাসও একই রকম করুণ। এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা ধরা হয় এক হাজার বছরের পুরোনো। বল্লাল সেনের মা এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন বলে কথিত। এই মন্দিরের নামেই ঢাকা শহরের নামকরণ। ঐতিহাসিকভাবে এই মন্দিরের জমির পরিমাণ ছিল ২০ বিঘা। ১৫ বিঘা সম্পত্তি সরকারি বেসরকারিভাবে দখল হয়ে আছে। ঢাকেশ্বরী মন্দিরের জমি দখল করে গড়ে উঠেছে বুয়েট। বুয়েটের শিক্ষক আবাসন ও অন্যান্য অবকাঠামো মন্দিরের জমিতে তৈরি হয়েছে। মন্দিরের মূল প্রবেশপথের বাম পাশের একটি বড় অংশ বুয়েট দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করে আসছে। বুয়েটের হাজি সাহেবরা কি কোনদিন তা স্বীকার করেন? তাদের ছাত্রদের বলেন, মন্দিরের জমিতে তোমরা পড়তে পারছো...।
ঢাকেশ্বরী মন্দিরের জমিও দখল করেছে গণপূর্ত বিভাগ। মন্দিরের জমির উপর তারা তৈরি করেছে স্টাফ কোয়াটার। এই দখল শুরু হয়েছিল পাকিস্তান আমল থেকে। বাংলাদেশ পর্যন্ত অব্যাহত আছে। এছাড়া ব্যক্তিগতভাবে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের জমি দখল করে মন্দিরের পাশে সুউচ্চ ভবন ও মার্কেট নির্মাণ হয়েছে। সিটি কর্পোরেশন মন্দিরের জমি দখল করে নিয়ে রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণ করেছে ক্ষতিপূরণ ছাড়াই। এতিমখানা সংলগ্ন মন্দিরের অনেকখানি জমি সিটি কর্পোরেশন দখল করে নিয়েছে। ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হন্তক্ষেপে ঢাকেশ্বরী মন্দির ১.৫ বিঘা জমি দখলমুক্ত করতে পেরেছিল।
সারাদেশের চিত্র একই রকম ভয়াবহ। অন্তত বাবরী মসজিদ নিয়ে এদেশের মুসলমান কান্নাকাটি করা যে লজ্জা সেই চিত্রটি এবার বলি।
সিলেটের শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের রথখোলা: মন্দিরের জমি দখল করেই সিলেট স্টেডিয়াম তৈরি করা হয়েছে। স্টেডিয়াম সংলগ্ন মার্কেট।
আদিনাথ মন্দির (মহেশখালী, কক্সবাজার): এটি একটি হিন্দু তীর্থ। সাগর পাড়ি দিয়ে এই দ্বীপে যেতে হয়। পাহাড়ের উপর এখানে রয়েছে একটি দিঘি। পর্যটকদের আকর্ষণ এটি। আমি যখন এখানে ভ্রমণে যাই তখনো এর ইতিহাস জানি না। মৈনাকি পর্বতের চূড়ায় অবস্থিত এই মন্দিরের বিশাল জমি বর্তমানে প্রভাবশালীদের দখলে।
পটিয়া কাঞ্চননগর সর্বজনীন কেন্দ্রীয় মন্দির (চট্টগ্রাম) : এই মন্দিরের জমির উপর রাস্তা, একটি স্কুল ও বেসরকারীভাবে দখল করে বাসতবাড়ি মার্কেট নির্মাণ করা হয়েছে।
নাভারণ কালী মন্দির (যশোর): এই মন্দিরের বিশাল একটি অংশ দখল করে সরকারি অফিস ও নাভারণ কলেজ নির্মাণ করা হয়েছে। সবই করা হয়েছে এনিমি পোপার্টি দেখিয়ে।
পঞ্চরত্ন গোবিন্দ মন্দির (পুঠিয়া, রাজশাহী): খোদ রাজশাহী ভূমি অফিস মন্দিরের জমি দখল করে বসে আছে! এছাড়া ব্যক্তিমালিকানায় দখল হয়েছে মন্দিরের বড় একটি অংশ।
মন্দিরের জমি দখল করে মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণের ইতিহাসটাও জানা দরকার।
বিনোদ বিবি কালী মন্দির (টিকাটুলি, ঢাকা): আপনি এখন টিকাটুলি গেলে এই মন্দিরটি খুঁজে হয়রান হতে হবে। মন্দিরটি কোন রকমে ছোট্ট একটু জায়গায় টিকে আছে। মন্দিরের বিশাল জমি দখল হয়ে মার্কেট বাড়িঘর তৈরি হয়েছে। ‘টিকাটুলি জামে মসজিদ’ এই বিনোদ বিবি কালী মন্দিরের জমির উপর নির্মাণ করা হয়েছে।
রমনা শাহী মসজিদ: সোহওয়ার্দী উদ্যোনের ভেতরের এই মসজিদটি রমনা কালী মন্দিরের জমি দখল করে বানানো হয়েছে।
ভোলা পটুয়াখালী বরিশাল এসব এলাকায় প্রাচীন জমিদারী এস্টেট ছিল। এই জমিদারীর আওতায় ছিল দেবত্ত সম্পত্তি। এইসব দেবত্ত সম্পত্তিতে অসংখ্য মসজিদ ও মাদ্রাসা বানানো হয়েছে। বেশিরভাব ক্ষেত্রে জাল দলিল করে এনিমি পোপার্টি দেখিয়ে দখল করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের পটিয়া ও বোয়ালখালী এলাকায় মন্দিরের পুকুরপাড় ও নাটমন্দির দখল করে কওমি মাদ্রাসা ও ফোরকানিয়া মাদ্রাসা তৈরি করা হয়েছে।
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা ও গৌরীপুরের জামিদারদের অনেক কাছারি বাড়ি ও সংলগ্ন মন্দির ছিল। এইসব জমি দখল করে একাধিক মসজিদ ও মাদ্রাসা তৈরি করা হয়েছে।
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় আছে দেবোত্ত সম্পত্তি হস্তান্তরযোগ্য নয় এবং এটি চিরকাল বিগ্রহের নামে থাকবে। তবু বাংলাদেশ সরকার মন্দিরের সম্পত্তি দখল করেছে অথচ স্বীকার করা হয়নি। সরকারের বিরুদ্ধে আইনী লড়াই লড়তে হচ্ছে অনেক জায়গায়।
দেখুন, মন্দিরের এত জমি দিয়ে কি হবে এই প্রশ্ন অনেকের মনেই এখন আসছে আমি জানি। এসব জমিতে যদি স্কুল কলেজ ও বিভিন্ন সেবা সংস্থা তৈরি হয় সে তো ভালো কথা। ঠিক, কিন্তু তার কি স্বীকৃতি আছে? বুয়েট পড়ে এসেছে এমন কয়জন স্বীকার করে বা জানে তারা মন্দিরের জমিতেই লেখাপড়া করে এসেছেন? আর বলুন তো, বাংলাদেশের কোথাও মসজিদের সম্পত্তি দখল করে একটা কলেজ নির্মাণের ঘটনা আছে কিনা? ওয়াকফ জমি দখল করে নিয়েছে এমন ইতিহাস আছে? এই যে মাঝে মাঝে মন্দির মসজিদ পাশাপাশি ছবি দেখান, এমন সম্প্রীতির দেশ নাকি আর কোথাও নেই, সেই মসজিদটি আগে তৈরি হয়েছিল নাকি মন্দিরটি সেই খবর নিয়েছেন? দেখাতে পারবেন মসিজদের দেয়ালের পাশে মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে আর নামাজ পূজা পাশাপাশি চলছে? সর্বক্ষেত্রেই মন্দিরের সীমানা ঘেঁষে তৈরি হয়েছে মসজিদ। আর এটাই সম্প্রীতি!
এদেশের প্রাচীন সব স্কুল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা হিন্দু জমিদাররা। এমনকি প্রথম মেয়েদের স্কুলগুলোও তাদের তৈরি করা। তার পরও দেবোত্ত সম্পত্তিতে হাত দিতে হবে কেন? কারণ মূল উদ্দেশ্য মন্দির সংস্কৃতিকে মুছে দেয়া। আমাদের ইতিহাসও এদেশের হিন্দুদের শত্রু দেখিয়েছে। তারা বলেছে হিন্দু জমিদাররা হচ্ছে শোষক। তাদের হাত থেকে বাঁচতেই ১৯০৫ সালে মুসলমানরা বঙ্গভঙ্গ চেয়েছিল। তখন ব্যর্থ হলেও ১৯৪৭ সালে মুসলমানদের জয় হয়েছিল। অথচ মুসলমানরা লেখাপড়াই শিখতে পেরেছিল হিন্দু জমিদাররা ফ্রি স্কুল খুলেছিল বলে। মুসলমানরা ধনী হলে মাদ্রাসা মসজিদ বানায়। আর ব্রাহ্মণ হিন্দুরা ছিলেন শিক্ষানুরাগী। ইতিহাস থেকে বলছি ভাই, আমাকে গালি দিয়ে লাভ নেই। হিন্দু বামপন্থীদের ইতিহাস পড়লে বিভ্রান্তই হবেন। বাংলাদেশের বিখ্যাত কিছু স্কুল ও কলেজের নাম বলি ও তাদের প্রতিষ্ঠাতার নাম বললেই বুঝবেন আমি সত্যি বলছি কিনা।
আনন্দ মোহন কলেজ (ময়মনসিংহ) :প্রতিষ্ঠাতা জমিদার ব্যারিস্টার আনন্দ মোহন বসু।
ব্রজলাল কলেজ (বিএল কলেজ) খুলনা: প্রতিষ্ঠাতা জমিদার বাবু ব্রজলাল চক্রবর্তী।
কারমাইকেল কলেজ (রংপুর): এটি ইংরেজ প্রশাসকের নামে হলেও এর জমি ও অর্থ দান করেছিলেন মহারাজা মণীন্দ্র চন্দ্র নন্দী।
এডওয়ার্ড কলেজ (পাবনা): প্রতিষ্ঠাতা জমিদান শ্রী গোপাল চন্দ্র লাহড়ী ও স্থানীয় অন্যান্য হিন্দু জমিদাররা।
সরকারী দেবন্দ্র কলেজ (মানিকগঞ্জ): প্রতিষ্ঠাতা মানিকগঞ্জের তেরশ্রীর জমিদার তপন কুমার চৌধুরী তার বাবা দেবন্দ্র চৌধুরী নামে কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন।
কুমিল্লা সরকারী ভিক্টরিয়া কলেজ: ত্রিপুরার মহারাজা শ্রীপঞ্চম শ্রী শ্রী মহারাজা রাধাকিশোর মাণিক্য এটি নির্মাণ করেন।
ময়মনসিংহ জিলা স্কুল: প্রতিষ্ঠায় স্থানীয় হিন্দু জমিদারদের অর্থ ও জমি দান ছিল। মুক্তাগাছার মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী জমি দান করেছিলেন। অন্যান্য হিন্দু জমিদাররা অর্থ দান করেছিলেন।
যশোর জিলা স্কুল: যশোরের জমিদার রূপরাম রায় চৌধুরী জমি ও অর্থ দান করেছিলেন।
পাইনিয়র স্কুল খুলনা: এটিও ব্রজলাল চক্রবর্তী জমি ও অর্থ দান করেছিলেন।
আরমানিটোলা সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়: স্থানীয় হিন্দু জমিদারদের সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল: রাজা হরনাথ রায় জমি ও অর্থ দান করেন।
ব্রজমোহন কলেজ (বরিশাল) : প্রতিষ্ঠাতা অশ্বিনীকুমার দত্ত।
কে এল জুবিলি স্কুল (ঢাকা): প্রতিষ্ঠাতা জমিদার কৃষ্ণলাল চৌধুরী।
কুমুদিনি সরকারী কলেজ: প্রতিষ্ঠাতা রণদাপ্রসাদ সাহা।
বরিশাল জিলা স্কুল: প্রতিষ্ঠাতা অশ্বনীকুমার দত্তের পরিবার।
তালিকা আরো দেয়া যেতো। তাতে লেখাটা আরো বড় হয়ে যেতো। তাই বিরত থাকলাম। এই লেখায় এটাই বলতে চেয়েছি, এই দেশের মুসলমানদের বুঝা ও মানা উচিত এদেশের মাটিতে একটি হিন্দু ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার আছে। মুসলিম লীগ ও বামপন্থীদের একপেশে ইতিহাস অত্যাচারিত হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে মজলুম প্রলিতরিয়েতদের ‘পাকিস্তান’ একটি মিথ। বরং এখানে একটি মুসলিম আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠা হয়েছে ১৯৪৭ সাল থেকে। সেই ইতিহাসই বরং আমাদের পরবর্তী জেনারেশনদের আত্মসমালোচনায় একটি
©সুষুপ্ত পাঠক