16/03/2023
যৌনবিপ্লব আর নারীবাদের আদর্শ নারীকে পরিবার আর বিয়ে থেকে ‘মুক্ত’ করেছে। তাকে শিখিয়েছে, তোমার পরিবারের দরকার নেই, তোমার জীবনের সাফল্য হলো পুরুষের মতো যা ইচ্ছে তা করতে পারায়। তোমার সাফল্য নিহিত তোমার ক্যারিয়ারে, তোমার ডিগ্রিতে, তোমার আত্মপরিচয়ে। তুমি স্বাধীন, শক্তিশালী নারী, যা ইচ্ছে তাই করতে পারো। যে কারো সাথে শুতে পারো।
স্বপ্নালু চোখের তরুণীরা যৌনবিপ্লবের প্রেসক্রিপশান মেনে চলেছে অক্ষরে অক্ষরে। শতভাগ কাজে লাগিয়েছে নতুন পাওয়া ‘স্বাধীনতা’কে। যৌবনে চুটিয়ে প্রেম করেছে। নিজের সৌন্দর্য আর আর শরীর প্রদর্শন করেছে। লোলুপ চোখের পুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া মনোযোগ উপভোগ করেছে তারিয়ে তারিয়ে। সেই সাথে তারা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে নিজেদের পড়াশুনা, চাকরি, ক্যারিয়ারকে।
কিছুদিন ব্যাপারটা ভালোই চলছে। কিন্তু একপর্যায়ে তারা আবিষ্কার করছে এই স্বাধীনতা, এই অবাধ যৌনতা সাময়িক আনন্দ দিলেও, বুকের ভেতরের শূন্যতা দূর করতে পারছে না। বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাদের কদর কমে আসছে। চোখগুলো আর আগের মতো তাদের দিকে ফিরছে না। পুরুষগুলো আর আকৃষ্ট হচ্ছে না আগের মতো। তাদের সন্ধানী চোখগুলো খুঁজে ফিরছে কমবয়সী শিকারকে।
একজন পুরুষ পরিবার শুরু করতে পারে মোটামুটি যেকোনো বয়সে। ৬০ বছর বয়সের পুরুষও নতুন বিয়ে করা বাবা হতে পারে। কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আলাদা। শারীরিকভাবে নারীর উর্বরতা, অর্থাৎ মা হবার সক্ষমতা সবচেয়ে বেশি থাকে কৈশোরের শেষ দিক থেকে শুরু করে মোটামুটি ত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত।
তারপর খুব দ্রুত এই সক্ষমতা কমতে থাকে। আগে কখনো মা হয়নি, এমন কারো পক্ষে ৩৫ বছরের পর নতুন করে মা হওয়া কঠিন। ৪৫ বছরের পর মোটামুটি অসম্ভব। সহজ ভাষায়, ৩৫ এর আগে পরিবার শুরু না করলে, এর পর পরিবার শুরু করে সফল হওয়া, মা হওয়া একজন নারীর জন্য কঠিন।
কিন্তু যৌনবিপ্লব আর নারীবাদের মন্ত্রে মুগ্ধ হওয়া নারীরা এ সময়টা কাটিয়ে দিচ্ছে স্বাধীনতার সুখে মজে, ক্যারিয়ার নিয়ে। সুখের তীব্রতা একটু ভোঁতা হয়ে আসার পর হঠাৎ আবিষ্কার করছে, তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এমন একটা সময় পার হয়ে গেছে, যা আর ফিরে পাওয়া সম্ভব না।
যৌবনে অনেক পুরুষের মনে ঝড় তোলা, অনেকের নির্ঘুম রাতের কারণ হওয়া, অনেক বান্ধবীর ঈর্ষার পাত্র হওয়া নারী চল্লিশের কোঠায় এসে নিজেকে একা, শূন্য আবিষ্কার করছে। মদের বারগুলোতে, মনোবিদের চেম্বারের ওয়েটিং রুমে, পর্নসাইটে মধ্যবয়স্ক একাকী নারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বাচ্চাকে বুকে জড়িয়ে, স্বামীর ভালোবাসার স্পর্শ শরীরে মেখে নিশ্চিন্তে ঘুমানোর সৌভাগ্য ওদের হয় না, ওদের ঘুমাতে হয় পোষা কুকুর আর বিড়ালকে জড়িয়ে।
নারীর ভূমিকা শুধু সন্তান জন্ম দেওয়া না। কিন্তু সন্তান নারীত্বের অবিচ্ছেদ্য একটা অংশ। নারীর শরীর, মন, মস্তিষ্ক সবকিছু গড়ে ওঠে তার মাতৃত্বের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে। এগুলো অনস্বীকার্য বাস্তবতা। কিন্তু আধুনিক পৃথিবী নারীত্বকে কেবল নারীর যৌবন, যৌনতা এবং শরীরে সীমাবদ্ধ করেছে।
মিডিয়া, গল্পে, সিনেমায় কিশোরী, তরুণী, বেশি হলে মধ্য ত্রিশের কোঠায় থাকা একাকী, স্বাধীন নারীর গল্প তোমাকে বলবে, কিন্তু মধ্যবয়স্ক নারীর জন্য সেই একাকীত্ব আর স্বাধীনতার অর্থ কী–সেটা বলবে না। পরিবারে নারীকে শুধু তার শরীর আর যৌবন দিয়ে মাপা হয় না। আধুনিকতার চোখে একটা বিগতযৌবনা নারী কেবল অতোটুকুই–বিগতযৌবনা, পুরনো মাল। ডেইটওভার।
কিন্তু পরিবারে সেই নারী হলো সম্মানিতা স্ত্রী, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মা, সংসার নামের জাহাজের দায়িত্বশীল কর্ত্রী। আরো বয়স হলে তিনি দাদীমা-নানীমা, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আধার। পরিবারে যৌবন ফুরালে নারীর প্রয়োজন ফুরায় না।
বরং বয়সের সাথে সাথে তার সম্মান ও মর্যাদা বাড়ে। পরিবার ও বিয়ে নারীকে সম্মান করে তার শৈশব, তারুণ্য, মধ্যবয়স এবং বার্ধক্যে। আধুনিকতা কেবল নারীর যৌবনের দাম দেয়। আধুনিক সমাজ নারীর কাছে রঙিন, চকচকে একটা স্বপ্ন বিক্রি করেছে। কিন্তু বরাবরের মতোই সেই স্বপ্নের বাস্তবতা দুঃস্বপ্নের মতো হয়েই রয়ে গেছে। এ বিষয়গুলো শুধু নারীকে না, প্রভাবিত করে পুরো সমাজ ও সভ্যতাকেই।
বই: আকাশের ওপারে আকাশ
প্রবন্ধ: অগ্ন্যুৎসব
বি: দ্র: এখানে পুরুষ যা খুশি তাই করতে পারবে এমনটা বলা হয়নি। আমরা এমন বলছি না। এখানে বিশ্বব্যবস্থা যা শেখায় তা বলা হচ্ছে।
ডিজাইন : মুহাম্মাদ আশরাফুল
#আকাশের_ওপারে_আকাশ
#সংগৃহীত