07/05/2026
পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই প্রতিবেদনটি সাবেক বাংলাদেশি ছিটমহলবাসীদের জীবন, নাগরিকত্ব এবং দলীয় রাজনীতিতে তাদের জড়িয়ে পড়ার কাহিনি তুলে ধরেছে।
২০১৫ সালের স্থলসীমা চুক্তির মাধ্যমে ভারতীয় ভূখণ্ডের ভেতরে থাকা ৫১টি বাংলাদেশি এবং বাংলাদেশের ভেতরে থাকা ১১১টি ভারতীয় ছিটমহল পরস্পরের সঙ্গে বিনিময় হয়। এর ফলে পোয়াতুরকুঠি ও মধ্য মশালডাঙ্গার মতো এলাকাগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং সেখানকার বাসিন্দারা প্রথমবারের মতো পূর্ণ নাগরিক অধিকার পান। এর আগে তারা বিদ্যুৎ, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল এমনকি ভোটাধিকার থেকেও বঞ্চিত ছিলেন। ভারতীয় সুবিধা পেতে অনেককে ভুয়া পরিচয়ে ভোটার কার্ড বানাতে হতো। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন থেকেই তারা প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পান, যদিও এর আগে বিশেষ ব্যবস্থায় একবার বাংলাদেশের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা তাদের ছিল।
প্রতিবেদনে মনসুর আলি, ওসমান গনি, জিহাদ হোসেইন ওবামা, রহমান আলি ও জয়নাল আবেদিনদের ব্যক্তিগত গল্পের মাধ্যমে উঠে আসে কীভাবে তারা ব্রিটিশ ভারত, পূর্ব পাকিস্তান ও বাংলাদেশ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ভারতের নাগরিক হয়েছেন এবং কী কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নাগরিক স্বীকৃতি ও স্বাস্থ্যসেবা আদায় করেছেন। জিহাদ ওবামার জন্মের সময় তার বাবা-মা দিনহাটা হাসপাতালে জোর করে ছিটমহলের আসল ঠিকানা ব্যবহার করেন। এর ফলে প্রথমবারের মতো একটি শিশুর জন্ম ভারতে সঠিক পরিচয়ে নথিভুক্ত হয়। এর আগ পর্যন্ত সবাইকে আত্মীয়ের ভুয়া পরিচয় দেখিয়ে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হতেন।
ছিটমহল বিনিময়ের পর গ্রামগুলোতে বিদ্যুৎ, পাকা রাস্তা, স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি হল গড়ে উঠেছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিশ্রুত সুবিধার অনেক কিছুই এখনো মেলেনি। জমির দলিল হস্তান্তর সম্পূর্ণ হয়নি, সব পরিকল্পিত স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রও চালু হয়নি। একসময় ছিটমহল বিনিময়ের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনকারীরা এখন তৃণমূল কংগ্রেস, বিজেপি ও বাম শিবিরে ভাগ হয়ে পড়েছেন। কেউ ব্যক্তিস্বার্থে, কেউবা চাপে পড়ে দলে যোগ দিয়েছেন। এতে পুরোনো বন্ধুত্ব টিকে থাকলেও রাজনৈতিক বিভাজন ক্রমশ গভীর হচ্ছে এবং অনেকের মনে হতাশা জন্ম নিয়েছে যে, একজোট থাকলে দাবি আদায় অনেক সহজ হতো।
ছিটমহল বিনিময় আন্দোলনের অন্যতম নেতা দীপ্তিমান সেনগুপ্ত পরে বিজেপিতে যোগ দেওয়ায় ভেতরে ভেতরে নতুন টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। তিনি অবশ্য মনে করেন, এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই মানুষ বুঝতে পারছে দলীয় রাজনীতি কীভাবে ঐক্যকে ভেঙে দিতে পারে। তবু জয়নাল আবেদিনের মতো অনেকে বলছেন, রাজনৈতিক মতবিরোধ সত্ত্বেও ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব এখনো অটুট। দলীয় বিভাজনের মাঝেও সামাজিক সম্পর্ক টিকে থাকাটাই হয়তো এই মানুষগুলোর সবচেয়ে বড় শক্তি।