25/06/2023
কুরবানির পরিচয়ঃ ধন-সম্পদের মোহ ও মনের পাশবিকতা দূরীকরণের মহান শিক্ষা নিয়ে প্রতি বছর আসে পবিত্র কুরবানি...ইসলাম ধর্মে কুরবানির দিনকে ঈদুল আজহাও বলা হয়...🌺
কুরবানি শব্দটি ‘কুরবুন’ মূল ধাতু থেকে এসেছে...অর্থ হলো নৈকট্য লাভ করা, সান্নিধ্য অর্জন করা, প্রিয় বস্তুকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করা...
শরিয়তের পরিভাষায়-নির্দিষ্ট জন্তুকে একমাত্র আল্লাহ পাকের নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত নিয়মে মহান আল্লাহ পাকের নামে জবেহ করাই হলো কুরবানি...☝️
কুরবানির গুরুত্ব ও ফজিলতঃ কুরবানি হলো ইসলামের একটি শি’য়ার বা মহান নিদর্শন... কুরআন মাজিদে আল্লাহতায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন-
فَصَلِّ لِرَبِّکَ وَ انۡحَرۡ ؕ﴿۲﴾فصل لربک و انحر ﴿۲﴾
অতএব তোমার রবের উদ্দেশ্যেই সালাত পড় এবং নহর (কুরবানি) কর...
-- [সূরা কাউসার, আয়াত-২] 🕋
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছে না আসে’...[ইবনে মাজাহ-৩১২৩ ] যারা কুরবানি পরিত্যাগ করে তাদের প্রতি এ হাদিস একটি সতর্কবাণী...☝️☝️
لَنۡ یَّنَالَ اللّٰهَ لُحُوۡمُهَا وَ لَا دِمَآؤُهَا وَ لٰکِنۡ یَّنَالُهُ التَّقۡوٰی مِنۡکُمۡ ؕ کَذٰلِکَ سَخَّرَهَا لَکُمۡ لِتُکَبِّرُوا اللّٰهَ عَلٰی مَا هَدٰىکُمۡ ؕ وَ بَشِّرِ الۡمُحۡسِنِیۡنَ ﴿۳۷﴾لن ینال الله لحومها و لا دماؤها و لکن یناله التقوی منکم کذلک سخرها لکم لتکبروا الله علی ما هدىکم و بشر المحسنین ﴿۳۷﴾
আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশ্ত ও রক্ত; বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া... এভাবেই তিনি সে সবকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা আল্লাহর তাকবীর পাঠ করতে পার, এজন্য যে, তিনি তোমাদেরকে হিদায়াত দান করেছেন; সুতরাং তুমি সৎকর্মশীলদেরকে সুসংবাদ দাও...
-- [সূরা হাজ্জ, আয়াত-৩৭] 🕋
কুরবানিতে গরিব মানুষের অনেক উপকার হয়... যারা বছরে একবারও গোশত খেতে পারে না, তারাও গোশত খাবার সুযোগ পায়...কুরবানির চামড়ার টাকা গরিবের মাঝে বণ্টন করার মাধ্যমে তাদের অভাব ও দুঃখ মোচন হয়। অপরদিকে কুরবানির চামড়া অর্থনীতিতে একটি বিরাট ভূমিকা পালন করে থাকে...🌿
কুরবানির ইতিহাস ও প্রচলনঃ পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম কুরবানি হলো মানবগোষ্ঠীর আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্রের মাঝে সংঘটিত হওয়া কুরবানি... এখান থেকেই কুরবানির প্রথম প্রচলন শুরু হয়। তবে পবিত্র ইসলামে আমরা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-এর স্মরণে কুরবানি করে থাকি...🍁🍁
এ প্রসঙ্গে ইবনে মাজাহ শরিফে এসেছে,
بَاب ثَوَابِ الْأُضْحِيَّةِ
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ خَلَفٍ الْعَسْقَلاَنِيُّ، حَدَّثَنَا آدَمُ بْنُ أَبِي إِيَاسٍ، حَدَّثَنَا سَلاَّمُ بْنُ مِسْكِينٍ، حَدَّثَنَا عَائِذُ اللَّهِ، عَنْ أَبِي دَاوُدَ، عَنْ زَيْدِ بْنِ أَرْقَمَ، قَالَ قَالَ أَصْحَابُ رَسُولِ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا هَذِهِ الأَضَاحِيُّ قَالَ " سُنَّةُ أَبِيكُمْ إِبْرَاهِيمَ " . قَالُوا فَمَا لَنَا فِيهَا يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ " بِكُلِّ شَعَرَةٍ حَسَنَةٌ " . قَالُوا فَالصُّوفُ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ " بِكُلِّ شَعَرَةٍ مِنَ الصُّوفِ حَسَنَةٌ " .
কোরবানীর সওয়াব
২/৩১২৭। যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) থেকে বর্ণিত... তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ...!! এই কোরবানী কী...?? তিনি বলেন, তোমাদের পিতা ইবরাহীম (আ) এর সুন্নাত (ঐতিহ্য)... তারা পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল...!! এতে আমাদের জন্য কী (সওয়াব) রয়েছে? তিনি বলেন, প্রতিটি পশমের পরিবর্তে পুন্য হবে (এদের পশম তো অনেক বেশি)? তিনি বলেন, লোমশ পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়েও একটি করে নেকী রয়েছে...🕋☝️
[ ইবনে মাজাহ-৩১২৭]
وَ نَادَیۡنٰهُ اَنۡ یّٰۤاِبۡرٰهِیۡمُ ﴿۱۰۴﴾ۙ
قَدۡ صَدَّقۡتَ الرُّءۡیَا ۚ اِنَّا کَذٰلِکَ نَجۡزِی الۡمُحۡسِنِیۡنَ ﴿۱۰۵﴾
اِنَّ هٰذَا لَهُوَ الۡبَلٰٓـؤُا الۡمُبِیۡنُ ﴿۱۰۶﴾
فَدَیۡنٰهُ بِذِبۡحٍ عَظِیۡمٍ ﴿۱۰۷﴾
কুরবানির গুরুত্বারোপ করে আল্লাহতায়ালা বলেন, হে ইবরাহিম! স্বপ্নে দেওয়া আদেশ তুমি সত্যে পরিণত করেই ছাড়লে.... এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি... অবশ্যই এটা ছিল একটি সুস্পষ্ট পরীক্ষা...আমি এক মহান কুরবানির বিনিময়ে তাকে মুক্ত করলাম...🌿🌿
[ সূরা সাফফাত, আয়াত নং ১০৪-১০৭ ]
শরিয়তে কুরবানির বিধান : ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আহমাদ (রহ.)-এর মতে কুরবানি ওয়াজিব। তাদের দলিল হলো-আল্লাহতায়ালা নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর ও পশু জবেহ কর।’ (সূরা কাউসার, আয়াত-২)।
সুতরাং আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নির্দেশ পালন সাধারণত ফরজ বা ওয়াজিব হয়ে থাকে। অপরদিকে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছে না আসে’...🍁
অত্র হাদিসের ভাষ্যেও কুরবানি ওয়াজিব প্রমাণিত হয়। তবে ইমাম মালেক ও ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর মতে কুরবানি করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ....
কুরবানির নেসাব ও তার মেয়াদঃ কুরবানির নেসাব হলো হাজাতে আসলিয়া তথা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও উপার্জনের উপকরণ ইত্যাদি ব্যতিরেকে যদি সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য কিংবা তার মূল্য বা সমমূল্যের সম্পদের মালিক হওয়া...
প্রকাশ থাকে যে, জাকাতের নেসাব যা, কুরবানির নেসাবও তা। তবে কুরবানির নেসাবের ক্ষেত্রে একটু অতিরিক্ত বিষয় রয়েছে। তা হলো- অত্যাবশ্যকীয় আসবাবপত্র ব্যতীত অন্যান্য অতিরিক্ত আসবাবপত্র, সৌখিন মালপত্র, খোরাকি বাদে অতিরিক্ত জায়গা-জমি, খালিঘর বা ভাড়া ঘর (যার ভাড়ার ওপর জীবিকা নির্ভরশীল নয়) এসব কিছুর মূল্য কুরবানির নেসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে...
[ ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া-৫/২৯২] 🕋
জাকাত ও কুরবানির নেসাবের সময়সীমা নিয়েও পার্থক্য রয়েছে। আর তা হলো-জাকাতের নেসাব পূর্ণ এক বছর ঘুরে আসা শর্ত; কিন্তু কুরবানির নেসাব পূর্ণ এক বছর ঘুরে আসা শর্ত নয়। কেবল জিলহজ মাসের ১০, ১১, ১২ এই তিন দিনের যে কোনো একদিন নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলেই কুরবানি ওয়াজিব হবে... [ফতোয়ায়ে শামি]
কুরবানির পশু ও তার বয়স : এমন পশু দ্বারা কুরবানি দিতে হবে যা শরিয়ত নির্ধারণ করে দিয়েছে; আর তা হলো ছয় ধরনের পশু....সেগুলো হলো- উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা...🐪🐑🐂🐃🐐🐏
শরিয়তের দৃষ্টিতে কুরবানির পশুর বয়সের দিকটা খেয়াল রাখা জরুরি...উট পাঁচ বছরের হতে হবে। গরু বা মহিষ দুই বছরের হতে হবে...ছাগল, ভেড়া, দুম্বা পূর্ণ এক বছরের হতে হবে...তবে যদি ছয় মাস বয়সের ভেড়া বা দুম্বা মোটাতাজায় এক বছরের মতো মনে হয়, তখন তা দিয়েও কুরবানি করা জায়েজ আছে... কিন্তু ছাগল যতই মোটাতাজা হোক, এক বছরের একদিন কম হলেও তা দিয়ে কুরবানি জায়েজ হবে না...🐪🐑🐂🐃🐐🐏
পশুর শরীয়াত নির্ধারিত বয়স হওয়া...আর তা হচ্ছে, উঁটের বয়স পাঁচ বছর সম্পূর্ণ হওয়া, গরুর বয়স দুই বছর সম্পূর্ণ হওয়া, ছাগলের বয়স এক বছর সম্পূর্ণ হওয়া, মেষ বা দুম্বার বয়স ছয় মাস পূর্ণ হওয়া... এর কম বয়সের হলে তা কুরবানীতে যথেষ্ট হবে না...এর দলীল নবী (সা.) এর হাদীসঃ
لَا تَذْبَحُوا إِلَّا مُسِنَّةً إِلَّا أَنْ يَعْسُرَ عَلَيْكُمْ فَتَذْبَحُوا جَذَعَةً مِنْ الضَّأْنِ
তোমরা দাঁতা পশু ব্যতীত অন্য কোন পশু (কুরবানীতে) যবহ করবে না...তবে যদি তোমাদের জন্য কষ্টকর হয়ে পড়ে তাহলে দুম্বা বা মেষের জায্’আ (যার বয়স ছয় মাস) জবহ্ করবে...🐑🐐🐪
--[ সহিহ মুসলিম-১৯৬৩] 🕋🌿