11/07/2026
১ম ছবিটি হজরত খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা (রঃ)। তিনি ছিলেন অবিভক্ত বাংলা ও আসামের শিক্ষা বিভাগের সহকারী ডিরেক্টর, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা সংস্কারক, দেশ বরেণ্য সমাজ সেবক, মানবতাবাদী মহাপুরুষ, প্রখ্যাত সাহিত্যিক এবং সর্বজন শ্রদ্ধেয় ছুফী-সাধক। খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা (রঃ) ছিলেন বাঙালি মুসলমানের অহংকার এবং তাঁর কালের আলোকিত মানুষ।
২য় ছবিটি খান বাহাদুর আহছানউল্লা (র.) ৮ পুত্র সন্তানদের। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এক কন্যা যিনি শৈশবে মারা যান ও আট পুত্র সন্তানের জনক ছিলেন। তাহাঁর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বংশধরদের মধ্যে একমাত্র পুত্রের জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসেবে তিনি নিজেই সবচেয়ে পরিচিত পীরজাদা মো: ব্যারিস্টার শামসুজ্জোহা। ব্যারিস্টার শামসুজ্জোহা বিবাহ করেন ফজিলতুন্নেসা কে। 
৩য় ছবিটি হলো ব্যারিস্টার শামসুজ্জোহা।
৪র্থ ছবিটি যাহাকে দেখছেন তিনিই হলেন ফজিলতুন্নেসা।
ফাজিলতুন্নেসাকে নিয়ে আমাদের অনেকের অজানা তথ্য গুলো তুলে ধরা হলো:
ফজিলতুন্নেসা পুরো নাম ফজিলতুন্নেসা জোহা। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম ছাত্রী এবং ঢাকা ইডেন কলেজের অধ্যক্ষ। এ হিসেবে তিনিই দেশের প্রথম মুসলিম নারী অধ্যক্ষ। এছাড়াও তিনি নিখিল বাংলার প্রথম মুসলিম মহিলা গ্র্যাজুয়েট এবং প্রথম বাঙালি মুসলিম ছাত্রী, যিনি উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি নিয়ে বিদেশে যান। তাঁর আগে কোনো মুসলিম মেয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন কিংবা উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি নিয়ে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ পাননি। ১৯২৭ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। বাংলার রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থার নানা বাধা উপেক্ষা করে, অসামান্য সাহস ও উচ্চশিক্ষা অর্জনের অদম্য আকাঙ্ক্ষায় তিনি বহুবিধ প্রতিকূলতা সহ্য করেন এবং উত্তরসূরি মুসলিম মেয়েদের জন্য উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করে দেন।
ফজিলতুন্নেসার জন্ম ১৮৯৯ সালে টাঙ্গাইল জেলার টাঙ্গাইল সদর থানার নামদার কুমুল্লী গ্রামে। তাঁর বাবা ওয়াজেদ আলী খাঁ এবং মা হালিমা খাতুন। ওয়াজেদ আলী খাঁ একটি মাইনর স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেওয়ার আগে তিনি করোটিয়ার জমিদারবাড়িতে সামান্য একটি চাকরি করতেন। মাত্র ছয় বছর বয়সে বাবা তাঁকে করোটিয়ার প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি করে দেন। ফজিলতুন্নেসার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে গ্রামেই। স্থানীয় স্কুল থেকেই তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা। বাৎসরিক পরীক্ষায় মেয়ের অসাধারণ ফল দেখে পারিবারিক অসচ্ছলতা ও সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ওয়াজেদ আলী খাঁ মেয়েকে শিক্ষার পথে এগিয়ে নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন। মাইনর পাস করার পর সামাজিক ও পারিবারিক বাধা অতিক্রম করে ১৯১৭ সালে তিনি ফজিলতুন্নেসাকে ঢাকায় নিয়ে আসেন এবং সে সময়ের একমাত্র সরকারি বালিকা বিদ্যালয় ইডেন স্কুলে ভর্তি করান। কঠোর অধ্যবসায় ও নিরলস পরিশ্রমের ফল তিনি খুব দ্রুতই পান। ১৯২১ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় ঢাকা বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে মাসিক ১৫ টাকা হারে বৃত্তি লাভ করেন। তখন থেকেই তাঁর নাম মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ১৯২৩ সালে তিনি ইডেন কলেজ থেকে আই.এ. পাস করে শিক্ষাবৃত্তি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতার বেথুন কলেজে বিএ পড়তে যান। সে সময় এই কলেজে তিনিই ছিলেন একমাত্র মুসলিম ছাত্রী। ১৯২৫ সালে তিনি ডিসটিংশনসহ বিএ পাস করেন। তাঁর আগে কোনো মুসলিম মেয়ে এই বিরল সম্মানের অধিকারী হতে পারেননি। বিএ পাস করার পর তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন। ১৯২৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগ থেকে এমএ পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেন। ১৯২৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে স্টেট স্কলারশিপ নিয়ে পিএইচডি ডিগ্রির উদ্দেশ্যে ইংল্যান্ডে যান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাবৃত্তি দিয়ে একজন মেয়েকে বিলেতে পাঠাতে অস্বীকৃতি জানালে তিনি নিজ প্রচেষ্টায় স্টেট স্কলারশিপের ব্যবস্থা করেন। এ ক্ষেত্রে সওগাত-এর সম্পাদক নাসির উদ্দিন এবং খান বাহাদুর আবদুল লতিফ তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা করেন। তাঁদের সহায়তায় তাঁর বিলেতে উচ্চশিক্ষার পথ সুগম হয়। লন্ডন থেকে ফিরে ১৯৩০ সালে তিনি কলকাতায় প্রথমে স্কুল ইন্সপেক্টর হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। একই বছরের আগস্ট মাসে কলকাতার অ্যালবার্ট হলে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলিম সমাজসেবক সংঘের বার্ষিক অধিবেশনে সভাপতি হিসেবে তাঁর দেওয়া বক্তব্য নারী জাগরণের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে আছে। ১৯৩৫ সালে তিনি বেথুন কলেজে গণিতের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। দেশ বিভাগের পর বেথুন কলেজে কর্মরত অবস্থায় তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন এবং ১৯৪৮ সালে ইডেন কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বেগম ফজিলতুন্নেসা ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত ঢাকা ইডেন কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নারীমুক্তি ও নারীশিক্ষা বিষয়ে তিনি সওগাতসহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রবন্ধ ও গল্প লিখেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে মুসলিম নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা, নারী জীবনে আধুনিক শিক্ষার আস্বাদ এবং মুসলিম নারীর মুক্তি।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি খান বাহাদুর আহসানউল্লাহ্র পুত্র, প্রথম বাঙালি সলিসিটর শামসুজ্জোহার সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। বিলেতে অবস্থানকালে তাঁদের পরিচয় হয়। পরবর্তীতে প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খার মধ্যস্থতায় তাঁদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। আমাদের ব্যর্থতা, আমরা এই গুণী নারীকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দিতে পারিনি। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই তাঁর অবদান সম্পর্কে জানেন না। জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি নিঃসঙ্গ নির্জনেই কাটিয়েছেন। তাঁর স্মৃতিকে অম্লান রাখতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৮৭ সালে তাঁর নামে একটি হল নির্মাণ করা হয়। এই বিদুষী নারী ১৯৭৭ সালের ২১ অক্টোবর ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।