10/06/2026
#হাজি_ইমদাদুল্লাহ_মুহাজিরে_মাক্কী রহ 'র সংক্ষিপ্ত জীবনী:---
হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (রহ.) ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের একজন শীর্ষস্থানীয় আধ্যাত্মিক সুফি সাধক, প্রখ্যাত ইসলামি পণ্ডিত এবং ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের এক মহান বীরপুরুষ।
তিনি বিখ্যাত চিশতিয়া সাবিরিয়া তরিকার প্রধান ব্যক্তিত্ব ছিলেন এবং তাকে দেওবন্দি ধারার আলেমদের "পীর ও মুরশিদ" (আধ্যাত্মিক শিক্ষক) হিসেবে গণ্য করা হয়।
হাজি সাহেবের সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরা হলো:
জন্ম ও বংশ পরিচয়জন্ম তারিখ: ৩১ ডিসেম্বর ১৮১৭ খ্রিষ্টাব্দ (১২৩১ হিজরি)।
জন্মস্থান: ব্রিটিশ ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলার নানুতা গ্রামে।
বংশ: তিনি ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ফারুক (রা.)-এর বংশধর ছিলেন, তাই তার বংশকে ফারুকী বলা হয়।
প্রদত্ত নাম: তার পিতা মুহাম্মদ আমিন প্রথমে তার নাম রেখেছিলেন 'ইমদাদ হুসাইন', কিন্তু পরবর্তীতে বিখ্যাত আলেম শাহ মুহাম্মদ ইসহাক (রহ.) তার নাম পরিবর্তন করে ইমদাদুল্লাহ রাখেন।
শৈশব ও শিক্ষা জীবন মাতৃহীনতা: মাত্র ৭ বছর বয়সে তিনি তার মাকে হারান, যার ফলে তার প্রাথমিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়।
প্রাথমিক শিক্ষা: তিনি অত্যন্ত প্রখর মেধার অধিকারী ছিলেন এবং নিজেই পবিত্র কুরআন হিফজ করেন। পরবর্তীতে তিনি ফারসি ও আরবি ভাষার প্রতি গভীর মনোযোগ দেন।
উচ্চ শিক্ষা: ১৬ বছর বয়সে তিনি বিখ্যাত আলেম মাওলানা মামলুক আলী নানুতুবী (রহ.)-এর সাথে দিল্লি গমন করেন। সেখানে তিনি তৎকালীন শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসদের কাছ থেকে তাফসির, হাদিস ও ফিকহ শাস্ত্রের উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেন।
আধ্যাত্মিক সাধনা ও খিলাফতবায়আত গ্রহণ:
হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (রহ.)-এর আত্মিক পরিবর্তনের পেছনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রত্যক্ষ রূহানী ইঙ্গিত কাজ করেছিল:রাসুল (সা.)-এর স্বপ্ন ও আদেশ: যৌবনে তিনি স্বপ্নে দেখেন যে, তিনি স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র মজলিসে উপস্থিত আছেন। সেখানে রাসুল (সা.) তাকে একজন প্রবীণ বুযুর্গের হাতে বায়'আত (দীক্ষা) গ্রহণের নির্দেশ দেন।বায়'আত গ্রহণ: এই স্বপ্নের পর ১৮ বছর বয়সে তিনি বিখ্যাত সুফি সাধক নাসিরুদ্দিন নকশবন্দী (রহ.)-এর কাছে নকশবন্দিয়া তরীকায় প্রথম বায়'আত হন।
প্রধান মুরশিদ: পরবর্তীতে তিনি বিখ্যাত আধ্যাত্মিক সাধক মিয়াজি নূর মুহাম্মদ ঝানঝানভী (রহ.)-এর সান্নিধ্যে যান। দীর্ঘদিন কঠোর আধ্যাত্মিক সাধনা ও মুজাহাদার পর তিনি তাঁর কাছ থেকে চিশতিয়া তরিকার "খিলাফত" (খেতাব) লাভ করেন।
১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম (সিপাহী বিদ্রোহ)হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (রহ.) কেবল খানকাহর পীর ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন স্বাধীনতাকামী বীরপুরুষ।
আমিরুল মুমিনীন উপাধি: ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশ বিরোধী সিপাহী বিপ্লবের সময় ভারতীয় আলেম সমাজ তাকে তাদের প্রধান নেতা বা "আমিরুল মুমিনীন" হিসেবে ঘোষণা করে।
থানা ভবন ও শামলীর যুদ্ধ: তার সুনিপুণ নেতৃত্বে আলেম ও সাধারণ মুসলিম সেনারা উত্তর প্রদেশের থানা ভবন ও শামলী নামক স্থানে ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং সাময়িক বিজয় লাভ করেন।
হুলিয়া জারি: পরবর্তীতে ব্রিটিশরা পুরো ভারতের নিয়ন্ত্রণ নিলে এই বিপ্লব ব্যর্থ হয়। ব্রিটিশ সরকার হাজী সাহেবকে ধরার জন্য হুলিয়া বা গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে এবং পুরস্কার ঘোষণা করে।
মক্কায় হিজরত (মুহাজিরে মক্কী)ব্রিটিশদের কঠোর নজরদারি ও গ্রেফতারি এড়াতে
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিশেষ রূহানী ইঙ্গিত ও আদেশে
তিনি ১৮৫৯ সালে (১২৭৬ হিজরি) ভারতবর্ষ ত্যাগ করে ইসলামের পবিত্র নগরী মক্কায় হিজরত করেন। মক্কায় স্থায়ীভাবে বসবাস করার কারণে তার নামের শেষে "মুহাজিরে মক্কী" (মক্কায় হিজরতকারী) উপাধি যুক্ত হয়। মক্কার 'হারাত আল-বাব' এলাকায় তিনি বাকি জীবন অতিবাহিত করেন।
বিখ্যাত শিষ্য ও দেওবন্দ আন্দোলনের অনুপ্রেরণাতার আধ্যাত্মিক আলোয় উপমহাদেশের অসংখ্য আলেম আলোকিত হয়েছিলেন।
ভারতীয় উপমহাদেশের ইসলামি শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র "দারুল উলুম দেওবন্দ" মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতাগণ সকলেই তার প্রত্যক্ষ শিষ্য ও মুরিদ ছিলেন। তার প্রধান প্রধান খলিফা ও শিষ্যদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন:
মাওলানা কাসেম নানুতুবী (রহ.) (দারুল উলুম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা)
মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গোহী (রহ.)
মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) (বিখ্যাত তাফসিরবিদ ও লেখক)পীর মেহের আলী শাহ (রহ.) (পাঞ্জাবের বিখ্যাত সুফি সাধক)
শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান (রহ.)
সাহিত্যকর্ম ও গ্রন্থাবলীতিনি তাসাউফ, আধ্যাত্মিকতা ও ইসলামি শরীয়তের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ফারসি ও উর্দু ভাষায় প্রায় ১০টিরও বেশি মূল্যবান বই রচনা করেন।
তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
যিয়াউল কুলূব (Zia-ul-Qulub)ফয়সালা হাফ মাসআলা (Faisala Haft Masala)
কুল্লিয়াত-ই-ইমদাদিয়া (Kulliyat-e-Imdadia)
জিহাদে আকবর (Jihad-e-Akbar)
মাকতুবাতে ইমদাদিয়া (Maktobat-e-Imdadia)
এই মহান আধ্যাত্মিক সাধক ও বীরপুরুষ ১৮ অক্টোবর ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে (১৩ জুমাদাল উখরা, ১৩১৫ হিজরি) সোমবার মক্কা মুকাররমায় ৮৪ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তাকে মক্কার বিখ্যাত কবরস্থান জান্নাতুল মুয়াল্লায় প্রখ্যাত আলেম রহমতুল্লাহ কাইরানভী (রহ.)-এর কবরের পাশে সমাহিত করা হয়।
হে আল্লাহ! আপনার এই মকবুল বান্দা হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (রহ.)-এর কবরকে জান্নাতের বাগান বানিয়ে দিন।
ইয়া আল্লাহ! দ্বীনের খেদমত, তাসাউফের সংস্কার এবং ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর যে ত্যাগ ও অবদান ছিল, তা কবুল করুন।
হে রহমানুর রাহিম! তিনি উম্মাহর পথপ্রদর্শনের জন্য যে মহান আলেমদের (যেমন: মাওলানা কাসেম নানুতুবী, রশিদ আহমদ গাঙ্গোহী, শ্বায়খুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান দেওবন্দী, আশরাফ আলী থানভী রহ.) গড়ে তুলেছেন, তার সদকায়ে জারিয়ার সওয়াব কেয়ামত পর্যন্ত তাঁর আমলনামায় পৌঁছে দিন।
উলামায়ে দেওবন্দের মহান মনিষীদের জিবন কর্ম প্রতিদিন পেতে Sahid Ahmed এই পেইজটি ফলো করে রাখবেন।
(শেয়ার করে সবার কাছে পৌঁছে দিবেন)
✍️মোহাম্মদ সহিদ আহমেদ।