15/06/2023
১!!
'ছোটোবেলায় যে ছেলেকে আমাদের বাড়ির উঠানে ন্যাংটা খেলতে দেখছি, সে ছেলে আজ আমার পিছনে লাইন মারছে। ভাবতে পারছিস ব্যাপারটা? মানে আমার স্পষ্ট মনে আছে তখন আমার ছয় বছর বয়স, শ্রাবণের বয়স কত হবে, সাড়ে তিন কি চার বছর, ঐ ছেলে বৃষ্টির মধ্যে আমার বাড়ির উঠানে ল্যাংটু হয়ে দৌড়াইছে, খেলছে। একটু উল্টা পাল্টা কিছু করলেই আমি থাপড়াইতাম। দাদি সেদিন কথায় কথায় বললেন, ও ছোটো থাকতে নাকি একদিন আমি ওর টুনটুনি পাখিতে চিমটি কেটে লাল করে দিছিলাম, সে সময় নাকি বহুত কান্না করছিল, সে ছেলে বড় হয়ে আমাকে প্রোপোজ করছে। কত বড় বদমাইশ ভাব! ওরে আমি থাপড়িয়ে দাঁত ফেলে দিব।
তূবার এমন হাস্যকর কথায়, কথা প্রাণপনে নিজের হাসি আটকানোর চেষ্টা করেও পারল না। শব্দ করে হেসে দিলো। তূবা, কথার দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
'হাসিস না তো বাল। আমার রাগে গা তিরতির করছে।'
কথা ঠোঁট টিপে বলল,
'আরে শান্ত হ। এত রাগ করছিস কেন? ও প্রোপোজ করছে, তুই তো না করে দিছিস, বাস ঝামেলা শেষ।'
'কথা, তুই বুঝতে পারছিস না কেন? তিন বছরের ছোটো ছেলে যখন আমাকে প্রপোজ করতে পারছে তারমানে নিশ্চিত এ ছেলে সহজে আমার পিছু ছাড়বে না।'
পিছন থেকে শ্রাবণ বলল,
'তুমি, একদম ঠিক বলছো তূবা। আমি এত সহজে তোমার পিছু ছাড়ব না। আর হ্যাঁ আমি মোটেও তোমার চেয়ে তিন বছরের ছোটো না। মাত্র দুই বছর সাত মাসের ছোটো।'
তূবা দাঁত কিরমির করতে করতে বলল,
'তোর সাহস তো কম না আমাকে নাম ধরে ডাকছিস? তুমি বলছিস? এতদিন তো আপা ডাকতি।'
'পিছনের কথা বাদ দাও। এখন থেকে তুমি করে বলবো। নো আপা টাপা, অনলি তূবা।'
প্রচণ্ড রাগে তূবা বসা থেকে দাঁড়িয়ে নিজের ব্যাগ দিয়ে যেই না শ্রাবণকে মারতে যাবে ওমনি শ্রাবণ দূরে গিয়ে বলল,
'উমাইন্না মুরগির মতো ঠোকর দিতে আসো কেন?'
কথা, শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে বলল,
'উমাইন্না মুরগি আবার কেমন মুরগি?'
শ্রাবণ বলল,
'মহিলা হয়ে তুই উমাইন্না মুরগি চিনিস না। তোরে তো শূলে চড়ানো দরকার। আরে যে মুরগিতে ডিমে আঠারো-বিশ দিন বসে তা দেয়, তারপর বাচ্চাসহ বের হয়। সেসব মুরগির ধারেও যাওয়া যায় না। গেলেই ঠোকর মারতে আসে। দৌড়ানি দেয়। কথাআপু তোর বান্ধবীও তেমন কাছেই ঘেসতে দেয় না। গেলেই ঠোকর মারতে আসে।'
তূবা রাগে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
'ঐ হারামজাদা, তুই এদিকে আয়। তোরে আমি মুরগির মতো ঠোকরামু না সাপের মতো ছোবল মারমু। একবারে শেষ করমু তোরে।'
শ্রাবণ জিবে কামড় দিয়ে বলল,
'আল্লাহ! নিজের হবু স্বামীকে মারার কথা বলে না। বিয়ের আগে বিধবা হবা নাকি?'
তূবা যখন অতিরিক্ত রেগে যায় ও ঠিকভাবে কথা বলতে পারে না। তোতলাতে থাকে। তূবা রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
'আ...আজই তো... তোর বা...বাবার কা... কা...কাছে নালিশ দিব।'
শ্রাবণ, তূবাকে আর একটু রাগাতে বলল,
'এক লাইন ঠিকমতো বলতে পারছো না, তুমি আবার বাবার কাছে নালিশ দিবে! নালিশ দিয়ে কি বালিশ পাবা? অবশ্য বালিশ পেলে ভালো, সে বালিশে দু'জনে একসাথে ঘুমাবো।'
তূবা চোখ বড় বড় করে ফেলল। শ্রাবণ আবার বলল,
'যদি নালিশ দাও তাহলে ভাববো, তুমি ভয় পাচ্ছো। ভাবছো আমাকে ভালোবেসে ফেলবে। সে কারণে আগেই বিষয়টা বাবার কাছে নালিশ দিয়ে শেষ করতে চাইছো। সাহস থাকলে বাবার কাছে নালিশ না করে আমার সাথে ডিল করো। দেখি আমাকে ভালো না বেসে কি করে থাকো!'
তূবার এত রাগ চাপল পায়ের কাছে পড়ে থাকা পাথরের টুকরোটা উঠিয়ে সরাসরি শ্রাবণের মাথায় মারল। সাথে সাথে শ্রাবণের কপাল ফেটে রক্ত বের হয়ে গেল। তূবা সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে শ্রাবণের নাক বরাবর ঘুষি মেরে রাগে হনহন করতে করতে চলে গেল। শ্রাবণ মাথা আর নাকের যন্ত্রণায় ওখানেই বসে পড়ল। কথা দৌড়ে গিয়ে শ্রাবণের কপাল চেপে ধরল। রুমাল বের করে শ্রাবণের কপালে চেপে ধরে বলল,
'চল ফার্মেসিতে।'
যেতে যেতে কথা বলল,
'তোকে যে কী বলবো ভেবে পাচ্ছি না? হ্যাঁ রে দুনিয়াতে কি মেয়ের অভাব ছিল যে তুই তূবাকে পছন্দ করতে গেলি? যে কিনা তোর চেয়ে তিন বছরের বড়।'
শ্রাবণ রুমাল মাথায় চেপে ধরে বলল,
'ও মোটেও তিন বছরের বড় না। ও আমার চেয়ে মাত্র দুই বছর সাত মাসের বড়।'
কথা, শ্রাবণের ব্যথা স্থানে চাপ মেরে বলল,
'জীবনে মানুষ হবি না।'
'আপু লাগছে তো।'
'লাগুক। দুনিয়ায় এত মেয়ে থাকতে তোর আমার বেস্ট ফেন্ডের দিকে নজর গেল। তা-ও কেমন বেস্ট ফ্রেন্ড যে কি না আমাদের চাচাতো বোন।'
'ও কি আমাদের আপন চাচাতো বোন নাকি? আপন হলেওবা কী সমস্যা ছিল? কাজিদের মাঝে বিয়ে হয় না নাকি?'
কথা ঠাস করে শ্রাবণের পিঠে একটা কিল বসিয়ে বলল,
'বাড়ি চল তারপর বোঝাচ্ছি।'
ফার্মেসি থেকে ব্যান্ডেজ করে কথা, শ্রাবণকে নিয়ে রিকশায় বসল। শ্রাবণ বলল,
'আপু আমার ভালোবাসা সফল হবে।'
'কীভাবে বুঝলি?'
'দেখ না লাল রক্ত ঝড়ছে। প্রেমের শুরুতে রক্ত ঝরা শুভ লক্ষণ।'
কথার এত হাসি পেল। শব্দ করে হেসে বলল,
'কুত্তা, লাল মানে শুভ না। লাল মানে বিপদ সংকেত। মানে সামনে যেও না, সামনে মহা বিপদ।'
'আরে তুই এসব বুঝবি না।'
কথা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
'ভাই, তুই আগুণ নিয়ে খেলছিস। তূবা আর তোর প্রেম কখনওই হওয়ার না।'
'কেন?'
'প্রথম এবং বিগ সমস্যা ও তোর চেয়ে বড়। দ্বিতীয়ত ও আমাদের কাজিন। তৃতীয়ত আমাদের পারিবারিক বিষয়টাও জানিস। তূবা আর আমি প্রাণের বান্ধবী হলেও আমাদের দু'জন বাবাদের মাঝে বিশাল ঝগড়া। বহু বছর যাবত জায়গা জমি নিয়ে ঝামেলা চলছে দুই পরিবারে। তুই কি সেটা আরও বাড়াতে চাস?'
'আমি কেন ঝামেলা বাড়াতে চাইবো। উল্টো আমাদের বিয়ের কারণে দুই পরিবারের মিলন হবে।'
কথা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
'তোর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় হচ্ছে।'
'ভবিষ্যৎ নিয়ে ভবিষ্যতে ভাববি। তুই শুধু আমাকে সাপোর্ট করবি।'
'লাত্থি দিয়ে রিকশা থেকে ফেলে দিব কুত্তা। আমি জীবনে তোর সম্পর্কের পক্ষে থাকব না। সবসময় তূবাকে সাপোর্ট করব।'
'তা তো করবিই। তুই তো রাজাকার। নিজের আপন ভাইকে কেন সাহায্য করবি? তোর বিয়ের আগে তোকে আর তোর বরকে আমি কম সাহায্য করছি? এহসানফরামোশ।'
'সেটা কী?'
'নিমোকহারাম। বাংলায় বললে খারাপ শোনায় সে জন্য হিন্দিতে বললাম।'
'এই তুই রিকশা থেকে নাম।'
'নিজের মায়ের পেটের একমাত্র আপন ভাইকে এভাবে রিকশা থেকে নামিয়ে দিতে পারবি? তা-ও যখন তোর আপন ভাইকে তোরই বান্ধুবী মেরে রক্তক্ত করেছে।'
কথা কপাল চাপড়ে বলল,
'তুই আমার একমাত্র ভাই না। বড় ভাইয়াকে বাদ দিলি কেন? সে কি আরেক মায়ের পেটের?'
'আরে বর্ষণ ভাইয়া এত ভালো যে মাঝে মাঝে ওরে নিজের ভাই বলে মানতে মন চায় না। এত ভালো কেন হতে হলো ওকে।'
কথা হাতে কতগুলা টিস্যু নিয়ে শ্রাবণের মুখে ঠুসে বলল,
'বাচাল চুপ থাক কিছুক্ষণ।'
শ্রাবণ মুখ থেকে টিস্যু বের করে বলল,
'এভাবে কেউ নিজের ভাইয়ের মুখ বন্ধ করে?'
'চুপ থাক। এখন বল বাড়ি যাবি নাকি আমার বাসায়?'
'কী রান্না করছিস?'
'সকালে ভাত, আলুভর্তা আর ডাল রান্না করে ভার্সিটিতে গেছিলাম।'
'দুপুরে ওটাই খাবি?'
'হুম।'
'ভাইয়া কী খাবে?'
'ও তো আজ দুপুরে বাসায় খাবে না। রাতে খাবে। তখন মাছ বা অন্যকিছু রান্না করব।'
'না না ঐ ভর্তা ডাল খেতে তোর বাসায় যাব না।'
'তাহলে আমাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে তুই বাসায় যা। তোর কথার কারণে মাথা ধরে গেছে।'
'তা তো ধরবেই। ভালো কথা কবে কার ভালো লেগেছে?'
২!!
গরুর মাংস আর পোলাও এর ঘ্রাণে ঘর মো মো করছে। নিহাদ ঘরে ঢুকেই কথাকে জিজ্ঞেস করল,
'গরুর মাংস, পোলাও করেছো?'
'হুম।'
'কেউ আসবে নাকি?'
'কেউ না আসলে কি আমি ভালো কিছু রান্না করি না?'
'আরে তা না। বলোনি তো তাই।'
'বিশেষ কেউ না। তুমি ফ্রেশ হও। আমি নাস্তা দিচ্ছি।'
'না না নাস্তা খাব না। আজ একেবারে ডিনার করব।'
'কেবল সাতটা বাজে।'
'তো। আমি এখনই খাবো। তোমার হাতের গরুর মাংসস ছেড়ে নাস্তা সম্ভব না।'
'আচ্ছা যাও ফ্রেশ হয়ে আসো। আমি টেবিলে খাবার দিচ্ছি।'
নিহাদ ফ্রেশ এসে দেখল টেবিল সুন্দর করে সাজানো। বাটি ভর্তি গরুর মাংস, পোলাও। পোলাওতে আবার কাঁচা মটরশুটি আর কিসমিস দেওয়া সাথে তেলাপিয়া মাছ ভূনা, আর শশা, গাজর, টমেটো, ধনেপাতা, কাঁচামরিচ, পেয়াজ সব কুচি কুচি করে কেটে সরিষার তেল দিয়ে সালাদ করা। নিহাদ, কথাকে জড়িয়ে ধরে গালে একটা চুমু খেয়ে বলল,
'আহা এমন লক্ষী বউ থাকলে আর কি লাগে? যেমন রূপবতী, তেমন রাধূনী, জীবন সুন্দর।'
কথা হাসল। নিহাদ টেবিলে বসে প্লেট নিলো। কথা প্লেটে পোলাও আর মাছ তুলে দিলো। সবসময়ের মতো নিহাদ প্রথম লোকমা কথার মুখে দিলো। কথা মুখে খাবার নিয়ে বলল,
'ধন্যবাদ করুণাময়। এমন ভালো একটা বর দেওয়ার জন্য। সারাজীবন শুকরিয়া আদায় করেও আমি তোমার দেওয়া এ রহমতের ঋণ শোধ করতে পারব না। শুকরিয়া পরম করুণাময়।'
নিহাদ পেট পুরে খেয়ে বলল,
'এখন একটু শোবো।'
'জি না। এই বাটিটা আমাদের বাসায় দিয়ে আসেন।'
'এখন?'
'জি।'
'আর কেবল খেলাম। এখন আমি শুয়ে থাকব।'
'জি না।'
'শ্রাবণ শালাকে এসে বলো নিয়ে যাক।'
'ওকেই আসতে বলতাম। কিন্তু বাসায় কেউ নেই। মা-বাবা বড় ফুপিকে দেখতে গেছেন। বর্ষণ ভাইয়া অফিসে। শ্রাবণ ঘরে একা। ঘর খালি রেখে আসতে পারবে না। বেচারা দুপুরে খেতে চাইল কিন্তু যেই শুনল, আলুভর্তা ওমনি রাগ করল। বিকালে ফোন করে বলল, আপু পোলাও, মাংস খাওয়াতে পারবি। বেচারা সহজে আমার কাছে কিছু আবদার করে না। তাছাড়া মা বাসায় নেই, দুই ভাই দেখা যাবে বাইরে থেকে হাবিজাবি কিনে খাচ্ছে।'
নিহাদ বলল,
'এখন বুঝলাম ম্যাডাম কেন আজ মাংস, পোলাও করছেন।'
'বুঝেছো যখন দিয়ে আসো।'
'দিয়ে আসলে আমার কি লাভ?'
কথা চোখ ইশারা করল। নিহাদ হেসে বলল,
'নিজের ভার্সিটির স্যারকে এভাবে দুষ্টু ইশারা করতে লজ্জা করছে না?'
কথা, নিহাদকে জড়িয়ে ধরে বলল,
'আপনি আমার ভার্সিটির স্যারটা পরে হয়েছেন কিন্তু আমার বর আগে। সাড়ে তিন বছরের পুরাতন বর আপনি। নিজের বরকে ইশারা করতেই পারি।'
নিহাদ হেসে বলল,
'এখন তো যেতেই হবে। বউ বলেছে বলে কথা।'
চলবে...
শুরুটা স্মুথ হলেও সামনে বিশাল বড় বড় টুইস্ট আছে। কেমন লাগল শুরুটা? ও হ্যাঁ ই-বুক থেকে আমার নতুন উপন্যাস "একদিন বিকালে সকাল হয়েছিল" কিনেছেন তো?
অরণ্যে_রোদন
লেখা: শারমিন আক্তার সাথী
পর্ব:০১