07/10/2022
আল্লাহু আকবর বলার কুরআন ভিত্তিক দলিল:
প্রথমত: সূরা বনী ইসরাইলের ১১১ আয়াতের শেষে আল্লাহ ঈমানদারদেরকে একটি আদেশ করেছেন। আর তা হলো "ওয়া কাব্বিরহু তাক্বিরান"
وَكَبِّرْهُ تَكْبِيرًا
অর্থ- আর তাঁর (আল্লাহর) বড়ত্ব (greatness) ঘোষণা করো যথোপযুক্ত ভাবে।(অর্থাৎ যতটা বড় করে করা যায়।) /and magnify Allah (with all) magnificence.
এ ছাড়াও ২/১৮৫, ২২/৩৭, ৭৪/৩ আয়াতে আল্লাহর বড়ত্ব (greatness) ঘোষণা করার আদেশ দেওয়া হয়েছে।
এই আয়াত গুলিতে আল্লাহ যে আদেশ দিয়েছেন তা পালন করা প্রতিটি ঈমান্দারের জন্য অবশ্য কর্তব্য।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই আদেশ আমরা কিভাবে পালন করব? বা আল্লাহর এই আদেশের জবাব কি হবে?
(১৭:১১১) আয়াতে আল্লাহ তাঁর বড়ত্ব (greatness) ঘোষণা করার যে আদেশ দিয়েছেন, তার জবাবে তো আপনাকে এমন কিছুই বলতে তবে যা দ্বারা আল্লাহর বড়ত্ব প্রকাশ পায়। আর তা
তো "আল্লাহ বড় (Allah is great) বা আল্লাহ মহান" এমনই হওয়া উচিত।
" রাব্বুন আল্লাহ" বা "হাসবিআল্লাহ" বা এ জাতীয় কোনো বাক্য দ্বারা কোনো ভাবেই ঐ আদেশের জবাব হয় না। কারণ এগুলো দ্বারা আল্লাহর বড়ত্ব প্রকাশ পায় না।
আসুন দেখি আরবি ব্যাকরণ কি বলে।
আরবি তিন বর্ণের root বা শব্দ মূল (কাফ-বা-রা/ ك ب ر) দ্বারা গঠিত শব্দ সমূহের মূল অর্থ-(বড়,কঠোর,কঠিন, বৃহত্তর,শ্রেষ্ঠ, মহা ও মহান) বা কাউকে (শক্তি, ক্ষমতা, সম্মান, মর্যাদা ) ইত্যাদির দিক থেকে বড় বলা, ভাবা বা ঘোষণা করা অর্থে ব্যাবহৃত হয়েছে।
এখন দেখা যাক এই তিন বর্ণের root বা শব্দ মূল (কাফ-বা-রা/ ك ب ر) ) থেকে গঠিত কুরআনে ব্যাবহৃত শব্দ গুলি কি কি?
💐 যেমন- ফেলে মা'জি(অতীত কালীন ক্রিয়া) হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে "কাবুরা, কাবিরা, কাব্বারা ইত্যাদি।
💐 ফেলে মু'জারে (বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কালীন ক্রিয়া) হিসেবে ব্যাবহৃত হয়েছে "কাব্বির, ইয়াকবারু, ইয়াকবুরু ইত্যাদি।
💐 ফেলে আমার (আদেশ সূচক ক্রিয়া) হিসেবে ব্যাবহৃত হয়েছে "কাব্বির"।
💐 Verbal noun (ক্রিয়া বিশেষ্য) হিসেবে ব্যাবহৃত হয়েছে "তাকবীর"।
💐 Noun হিসেবে ব্যাবহৃত হয়েছে " কাবিরান, মুতাকাববিরিন, মুতাকাববিরিনা"ইত্যাদি।
💐 Nominal noun (নাম বাচক বিশেষ্য) হিসেবে ব্যাবহৃত হয়েছে "আকবারু, আকবারা"।
💐 Nominal adjective (নাম বাচক বিশেষণ) হিসেবে ব্যাবহৃত হয়েছে "কাবিরু, কাবিরুন, কাবিরান, কাবিরিন, আল কুবরা" ইত্যাদি।
💐 Adjective (বিশেষণ) হিসেবে ব্যাবহৃত হয়েছে "আকবারু,আল আকবারা, আল আকবারি"।
(কাফ-বা-রা/ ك ب ر) root থেকে গঠিত শব্দ সমূহের মধ্যে উপরে উল্লেখিত শব্দ সমূহই কুরআনে সর্বাধিক ব্যাবহৃত হয়েছে। আর দুই একটি বাতিক্রম ছাড়া উপরে উল্লেখিত সকল শব্দের অর্থ একই রকম।
উপরে উল্লেখিত শব্দ গুলির মধ্যে বড়ত্ব (greatness) প্রকাশের জন্য adjective হিসেবে মহান রব, আল্লাহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে "কাবির ও আকবার" শব্দ দুটি ব্যবহার করেছেন।
এবার (১৭:১১১)। আয়াতে ব্যবহৃত শব্দ "কাব্বির" ও "তাকবীরান" শব্দ দুইটিকে বিশ্লেষণ করা যাক।
"কাব্বির" ও "তাকবীর/তাকবীরান" শব্দ দুইটি একই root(কাফ-বা-রা/ ك ب ر) থেকে গঠিত, যারা অর্থের দিক থেকে সমার্থক কিন্তু ব্যবহারের দিক থেকে (parts of speech) আলাদা।
এখানে "কাব্বির" এমন একটি verb যা তার সমার্থক অর্থ বোধক object/কর্মপদ (তাকবীরান) গ্রহণ করায় সেকেন্ড পারসন অর্থাৎ যাদের কাছ থেকে আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা করার কাজটি চাওয়া হচ্ছে, তাদের কাজ কি হবে অর্থাৎ তারা জবাবে কি বলবে তা ঐ আদেশের মধ্যেই বলে দেওয়া হয়েছে।
এখানে "তাকবীরান" শব্দটি verbal noun যা "কাব্বির" verb টি দ্বারা যে আদেশ দেওয়া হয়েছে, তার জবাব কি হবে বলে দেয়। আর তাহলো," যত বড় করে আল্লাহর বড়ত্বের ঘোষণা করা যায়, তত বড় করে আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা করা।"
তাহলে(১৭:১১১) আয়াত অনুযায়ী আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা করতে হলে প্রথমে Subject হিসেবে "আল্লাহ" অতঃপর be verb হিসেবে "am/is/are" অতঃপর আল্লাহর সর্বোচ্চ বড়ত্ব প্রকাশক একটি adjective আনতে হবে। আর কুরআনে বড়ত্ব প্রকাশক বহুল ব্যবহৃত adjective হলো "কাবির" ও "আকবার"। তবে আরবিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে be verb (am/is/are) উল্লেখ করার প্রয়োজন হয় না।
নিচের আয়াত গুলি লক্ষ্য করুন
وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ
(৩১:৩০)। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ, তিনি তো সমুচ্চ মহান।
إِنَّ اللّهَ كَانَ عَلِيًّا كَبِيرًا
(৪:৩৪)। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ সমুচ্চ মহান।
আরও দেখুন ৪/৩৪, ২২/৬২, ১৩/৯, ৪২/২২, ৩৫/৩২, ৩৪/২৩ আয়াত সমূহ।
উপরোক্ত আয়াত দুইটিতে আল্লাহ নিজের বড়ত্ব প্রকাশ করতে "কাবির" শব্দটি ব্যবহার করেছেন। কিন্তু "কাবির" শব্দটি একক ভাবে তার সর্বোচ্চ বড়ত্ব প্রকাশ করতে না পারায় তিনি "কাবির" শব্দের পূর্বে "আলিউন/আলিআন" শব্দ দ্বারা কাবির শব্দকে শক্তিশালী করেছেন।
"কাবির" শব্দটি সর্বোচ্চ বড়ত্ব/শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করে না।
নিচের আয়াত দুইটি লক্ষ্য করুন।
يَسْأَلُونَكَ عَنِ الشَّهْرِ الْحَرَامِ قِتَالٍ فِيهِ قُلْ قِتَالٌ فِيهِ كَبِيرٌ وَصَدٌّ عَن سَبِيلِ اللّهِ وَكُفْرٌ بِهِ وَالْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَإِخْرَاجُ أَهْلِهِ مِنْهُ أَكْبَرُ عِندَ اللّهِ وَالْفِتْنَةُ أَكْبَرُ مِنَ الْقَتْلِ وَلاَ يَزَالُونَ يُقَاتِلُونَكُمْ حَتَّىَ يَرُدُّوكُمْ عَن دِينِكُمْ إِنِ اسْتَطَاعُواْ وَمَن يَرْتَدِدْ مِنكُمْ عَن دِينِهِ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرٌ فَأُوْلَـئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ وَأُوْلَـئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
(২:২১৭)। সম্মানিত মাস সম্পর্কে তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে যে, তাতে যুদ্ধ করা কেমন? বলে দাও এতে যুদ্ধ করা বড় পাপ। আর আল্লাহর পথে প্রতিবন্দ্বকতা সৃষ্টি করা এবং কুফরী করা, মসজিদে-হারামের পথে বাধা দেয়া এবং সেখানকার অধিবাসীদেরকে বহিস্কার করা, আল্লাহর নিকট তার চেয়েও বড় পাপ। আর ধর্মের ব্যাপারে ফেতনা সৃষ্টি করা নরহত্যা অপেক্ষাও মহা পাপ। বস্তুতঃ তারা তো সর্বদাই তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাকবে, যাতে করে তোমাদিগকে দ্বীন থেকে ফিরিয়ে দিতে পারে যদি সম্ভব হয়। তোমাদের মধ্যে যারা নিজের দ্বীন থেকে ফিরে দাঁড়াবে এবং কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের যাবতীয় আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে। আর তারাই হলো দোযখবাসী। তাতে তারা চিরকাল বাস করবে।
আয়াতে "কাবির" শব্দটি বড় ও "আকবার" শব্দটি তার চেয়েও বড় বুঝাতে ব্যাবহৃত হয়েছে।
يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ قُلْ فِيهِمَا إِثْمٌ كَبِيرٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَإِثْمُهُمَآ أَكْبَرُ مِن نَّفْعِهِمَا وَيَسْأَلُونَكَ مَاذَا يُنفِقُونَ قُلِ الْعَفْوَ كَذَلِكَ يُبيِّنُ اللّهُ لَكُمُ الآيَاتِ لَعَلَّكُمْ تَتَفَكَّرُونَ
(২:২১৯)। তারা তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দাও, এতদুভয়ের মধ্যে রয়েছে মহাপাপ। আর মানুষের জন্যে উপকারিতাও রয়েছে, তবে এগুলোর পাপ উপকারিতা অপেক্ষা অনেক বড়। আর তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে, কি তারা ব্যয় করবে? বলে দাও, নিজেদের প্রয়োজনীয় ব্যয়ের পর যা বাঁচে তাই খরচ করবে। এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জন্যে নির্দেশ সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা চিন্তা করতে পার।
এখানেও "আকবার" শব্দটি অধিক বড় বুঝতে ব্যাবহৃত হয়েছে।
আরবিতে "কাবির" শব্দটি positive ডিগ্রি আর "আকবার" শব্দটি superlative ডিগ্রী। যা "তাকবীর/তাকবীরান" Verbal Noun টির adjective form এবংএকই root(কাফ-বা-রা/ ك ب ر) থেকে উৎপন্ন।
নিচের আয়াত টি লক্ষ্য করুন।
وَلَذِكْرُ اللَّهِ أَكْبَرُ
(২৯:৪৫)। আর আল্লাহর জিকির ই শ্রেষ্ঠ।
এ ছাড়াও ৯/৭২ ও ৪০/১০ আয়াতে
আল্লাহর "সুন্তুষ্টি" ও "ক্ষোভ" সবচয়ে বড়(superlative degree) বুঝতে "আল্লাহি আকবার" ব্যবহার করা হয়েছে। তাহলে কুরআন অনুযায়ী সর্বোচ্চ বড়ত্ব প্রকাশক adjective হলো "আকবার"।
অতএব (১৭:১১১)। আয়াতে প্রদত্ত আল্লাহর আদেশের জবাব হবে, "আল্লাহু আকবার"।
কাজেই যে যারা "আল্লাহু আকবার" সরাসরি কুরআনে নাই বলে আল্লাহর বড়ত্বের এই ঘোষণা (তাকবীর) কে অকুরাণীক দাবি করে ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন, তাদেরকে বলবো আপনারা তওবা করত: নিজেদেরকে সংশোধন করে নিন।
হে আমাদের রব! আমাদের পাপ ও সীমা লংঘন ক্ষমা করুন। আর আমাদেরকে আপনার কিতাবের সঠিক জ্ঞান দান করুন। আর আমাদের প্রত্যাবর্তন তো আপনারই নিকটে।