27/12/2025
অসমাপ্ত চিঠি (The Unfinished Letter)
নীল আর বৃষ্টির প্রেমটা ছিল অনেকটা শরতের আকাশের মতো—কখনো ঝকঝকে রোদেলা, তো কখনো হঠাৎ মেঘলা। নীল ছিল মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে, আর বৃষ্টি ছিল এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর একমাত্র মেয়ে। অভাব আর প্রাচুর্যের এই দেয়ালটা তাদের ভালোবাসার মাঝে বাধা হতে পারেনি কখনো।
একদিন নীল বৃষ্টিকে বলেছিল, "যদি কোনোদিন আমাদের আলাদা হতে হয়, তবে আমি এই শহর ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাব। এমন কোথাও যেখানে তোমার স্মৃতি আমাকে আর কষ্ট দেবে না।"
বৃষ্টি হেসে উত্তর দিয়েছিল, "পাগল নাকি! আমি তোমাকে ছাড়া থাকব কী করে? আমার তো নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হবে।"
কিন্তু সময় সব হিসেব পাল্টে দেয়। বৃষ্টির বাবা তাদের সম্পর্কের কথা জানতে পেরে নীলকে শহর ছাড়ার হুমকি দেন। বৃষ্টির ওপর নেমে আসে কঠোর শাসন। বৃষ্টির বিয়ের কথা ঠিক হয় এক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার সাথে। বৃষ্টির বাবা নীলকে ডেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, যদি সে বৃষ্টির ভালো চায়, তবে যেন সে চিরতরের জন্য সরে যায়।
বিয়ের আগের রাতে নীল বৃষ্টিকে একটা শেষ চিঠি লিখেছিল। চিঠিতে নীল লিখেছিল—
"বৃষ্টি, আমি চলে যাচ্ছি। হয়তো অনেক দূরে, হয়তো তোমার এই পরিচিত গণ্ডির বাইরে। তোমার বাবার শর্ত মেনে নিয়েই আমি সরছি, কারণ আমি জানি আমার জেদ তোমার জীবন ধ্বংস করে দিতে পারে। সুখে থেকো বৃষ্টি, আমাদের দেখা হবে অন্য কোনো এক শহরে, যেখানে কোনো জাত-পাত বা অর্থের দেয়াল থাকবে না..."
চিঠিটা বৃষ্টির হাতে আর পৌঁছায়নি। বৃষ্টির বাবা সেই চিঠিটা পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। বৃষ্টি ভেবেছিল নীল ভীরুর মতো তাকে একা ফেলে পালিয়েছে। অভিমানে আর কষ্টে বৃষ্টি বিয়ের পিঁড়িতে বসে পড়ে।
দশ বছর পর...
বৃষ্টি আজ এক সন্তানের মা। হঠাৎ একদিন পুরোনো আলমারি পরিষ্কার করতে গিয়ে একটা ডায়েরির ভাজ থেকে নীল রঙের একটা খাম খুঁজে পায়। খামটা নীল তাকে উপহার দিয়েছিল অনেক আগে। তার ভেতরে ছিল সেই অসম্পূর্ণ চিঠির একটি ফটোকপি, যা নীলের এক বন্ধু অনেক কষ্টে বৃষ্টিকে দিতে চেয়েছিল কিন্তু সুযোগ পায়নি।
বৃষ্টি জানতে পারল, নীল সেই রাতে শহর ছেড়ে যাওয়ার সময় এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। সে আসলে পালিয়ে যায়নি, সে পৃথিবী থেকেই হারিয়ে গিয়েছিল। বৃষ্টি জানালার দিকে তাকিয়ে দেখল আকাশ ভাঙা বৃষ্টি নামছে। আজ বৃষ্টির নিশ্বাস নিতে সত্যিই খুব কষ্ট হচ্ছে, ঠিক যেমনটা সে নীলকে বলেছিল।