প্রবাসের কথা - Expat's Voice

প্রবাসের কথা - Expat's Voice প্রবাসীদের গল্প, অনুভূতি এবং জীবনযুদ্ধ।

24/06/2025

গল্প: “সকালের আলো আর প্রবাসীর স্বপ্ন”

মালয়েশিয়ার এক শান্ত শহর — ইপোহ। চারপাশে সবুজে ঘেরা, পাহাড়ের কোল ঘেঁষে এক অপূর্ব সকাল। ভোরের সূর্য রেশমি আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে গাছপালায়, যেন নতুন আশার বার্তা নিয়ে এসেছে।

এই শহরের এক প্রান্তে থাকে রুহুল — এক বাংলাদেশি শ্রমিক। বয়স প্রায় ৩৫। বাড়ি কুমিল্লায়। মালয়েশিয়ায় এসেছে পরিবারকে একটু ভালোভাবে দেখার স্বপ্ন নিয়ে। প্রতিদিন সকাল ৬টায় সে উঠে পড়ে, প্রথমেই জানালার পর্দা সরিয়ে আকাশ দেখে। বাংলাদেশের গ্রামের সকালের কথা মনে পড়ে — কাক ডাকা ভোর, মায়ের হাঁকডাক, বাবার সাইকেল চালিয়ে বাজার যাওয়া। চোখে জল আসে, তবুও মুখে হাসি রাখে সে।

কাজে যাবার আগে রুহুল নিজের হাতে রান্না করা ডাল-ভাত খায়। তারপর ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে রওনা হয় নির্মাণস্থলে। ওখানে আরও অনেক বাংলাদেশি ভাই আছে — কেউ সিলেট, কেউ যশোর, কেউবা চট্টগ্রামের। সবাই মিলে যেন এক অদৃশ্য বন্ধনে বাঁধা।

একদিন সকালে কাজের ফাঁকে, রুহুল গামছায় মুখ মুছছিল। তখন পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মালয় সহকর্মী আযমান জিজ্ঞেস করল,
“রুহুল, তুমি এত সকালে হাসিমুখে আসো কীভাবে?”
রুহুল একটু হেসে বলল,
“ভাই, আমি জানি — আমার ঘামে আমার ছেলের স্কুলের খরচ, আমার মা’র ওষুধ আর আমার স্ত্রীর হাসি লুকানো আছে।”

আযমান চুপ করে গেল। এরপর থেকে সে রুহুলকে ভিন্ন চোখে দেখতে লাগল।

একদিন মালিক রুহুলকে বলল, “তোমার মতো শ্রমিক আমার পুরো প্রজেক্টে নেই। তুমি শুধু কাজ না, সততা আর পরিশ্রমের এক উদাহরণ।”
সে মাসেই রুহুল বোনাস পেল। সঙ্গে কাজের ভিসা রিনিউয়েরও ব্যবস্থা হলো।

সেই রাতে রুহুল ভিডিও কলে ছেলেকে বলল, “তোর স্কুলের নতুন ড্রেস কিনে নিস, আব্বু এখন আগের চেয়ে একটু বেশি উপার্জন করে।”
ছেলের চোখে খুশির ঝিলিক, স্ত্রীর মুখে দোয়া আর মায়ের কণ্ঠে ভরসা — সব কিছুই যেন এক মালয়েশিয়ান সকালের আলোয় গাঁথা হয়ে থাকল।

এই গল্প শুধু রুহুলের না, হাজারো প্রবাসী শ্রমিকের — যারা নিজেদের স্বপ্ন ভেঙে অন্যের স্বপ্ন গড়ে তোলে। মালয়েশিয়ার প্রতিটি সকাল তাই তাদের পরিশ্রমে আলোকিত, আর বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবার তাদের ত্যাগে উজ্জ্বল।

17/06/2025

গল্প: একজন প্রবাসী ছাত্রের কথা

নাজিম ছিল বাংলাদেশি এক মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। জন্ম ময়মনসিংহের এক ছোট্ট গ্রামে। বাবার কৃষিকাজ, মায়ের সংসার সামলানো—এই সাধারণ জীবনের মাঝেও নাজিমের স্বপ্ন ছিল অসাধারণ। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় ছিল মেধাবী, নিজের মেধা আর সংগ্রামের জোরে ভর্তি হয় মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি মালায়ায়, ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ স্কলারশিপ পেয়ে।

যখন প্রথম কুয়ালালামপুরে আসে, তখন সে শহরের বিশালতা আর আলোকচ্ছটায় অভিভূত হয়ে পড়ে। কিন্তু খুব শিগগিরই বুঝতে পারে—প্রবাসের জীবন শুধু চকমকে নয়, বরং এক চুপচাপ যুদ্ধের নাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ, ভাষার ব্যবধান, মালয় এবং ইংরেজির দ্রুত গতির লেকচার—সবকিছু মিলিয়ে ক্লাসে টিকে থাকাই প্রথম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

হোস্টেল জীবনে একাকীত্ব ছিল সবচেয়ে কষ্টদায়ক। সন্ধ্যায় যখন সহপাঠীরা পরিবারে ফোন করত, নাজিমও মা-বাবার কণ্ঠ শোনার জন্য ফোন হাতে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করত, কারণ গ্রামে ইন্টারনেট সিগন্যাল দুর্বল থাকত। মায়ের কণ্ঠে মমতা, বাবার সান্ত্বনা আর ছোট বোনের হাসির শব্দ তাকে বাঁচিয়ে রাখত।

কিন্তু সুখ কেবল স্মৃতিতে থাকলে জীবন চলে না। শুরু হয় অর্থনৈতিক সংকট। স্কলারশিপে থাকা-খাওয়ার খরচ উঠলেও, টিউশন ফি, পড়াশোনার উপকরণ, ট্রান্সপোর্ট, চিকিৎসা—সবকিছু সামলাতে গিয়ে বিপাকে পড়ে যায়। এক বন্ধুর মাধ্যমে পরিচয় হয় ফুড ডেলিভারির কাজের সঙ্গে। সন্ধ্যার পর ক্লাস শেষে সে বাইক নিয়ে ছুটে বেড়াত রাস্তায় রাস্তায়, বৃষ্টিতে, গরমে, কখনো কুয়াশায়।

স্মরণীয় এক রাতের কথা, যখন টানা আট ঘণ্টা ডেলিভারির পর সে বাড়ি ফিরছিল। হঠাৎ এক এক্সিডেন্টে পড়ে যায়, হালকা ব্যথা পায়, বাইক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অথচ পরদিন তার ছিল মিডটার্ম পরীক্ষা। ব্যথা সয়ে, চোখ লাল করে সারা রাত পড়ে পরীক্ষা দেয়। ফলাফলে সে সর্বোচ্চ নম্বর পায়। সেই দিন নাজিম নিজেই নিজের উপর গর্ব করতে শিখে।

একসময় মায়ের শরীর খারাপ হয়, তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। ফোনে শুধু খবর পায়—"মায়ের কিডনি ঠিকভাবে কাজ করছে না"। কিছুই করার নেই, কেবল রাত জেগে দোয়া করা আর ক্লাসের ফাঁকে চোখের পানি লুকিয়ে থাকা। দেশে ফেরার মতো টাকা তখন ছিল না তার কাছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বিশেষ আবেদন করে কিছু অর্থ সহায়তা পায়। সেই টাকা দিয়ে দেশের হাসপাতালের বিলের অংশটা দেয়। এরপর থেকে তার প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও মানবিকভাবে সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে।

চূড়ান্ত বর্ষে এসে সে অংশ নেয় একটি আন্তর্জাতিক প্রকল্পে। মালয়েশিয়ান, ইন্দোনেশিয়ান ও ইরানি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিলে কাজ করে একটি স্মার্ট হোম প্রযুক্তির ওপর। প্রজেক্টটি বিজয়ী হয়, এবং তাকে দেওয়া হয় 'Best Innovator Award'। সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন তার নাম ঘোষণা হয়, তার চোখে শুধু ভেসে উঠছিল বাবার কষ্ট করা হাত, মায়ের মলিন মুখ, আর নিজের গ্রাম।

গ্র্যাজুয়েশনের দিন, নাজিমের হাতে একগুচ্ছ ফুল। বন্ধুরা চারপাশে, শিক্ষকেরা অভিনন্দন জানাচ্ছেন। ক্যামেরায় হাসিমুখে ছবি তুললেও সে জানত, এই হাসির পেছনে কত রাতের না ঘুমানো, কত অভিমান, কত কষ্ট লুকানো আছে।

পরে এক মালয় কোম্পানিতে চাকরি পায়। তবে তার মন পড়ে থাকে দেশের মাটিতে। সে ঠিক করে, দেশে ফিরে একটি রিনিউএবল এনার্জি কোম্পানি গড়বে। গ্রামে যাতে শিশুরা রাতেও পড়তে পারে, সে জন্য সৌর বিদ্যুৎ পৌঁছে দেবে প্রতিটি ঘরে।

প্রবাসে নাজিম কেবল একটি ডিগ্রি অর্জন করেনি, সে শিখেছে আত্মত্যাগ, অধ্যবসায় আর ভালোবাসার আসল অর্থ।

এভাবেই একজন প্রবাসী ছাত্র হয়ে ওঠে হাজারো স্বপ্নবাজ তরুণের অনুপ্রেরণা।

গল্প: "আলোকছায়ার শহর"রাতের কুয়ালালামপুর। আকাশে তারা দেখা যায় না, কিন্তু শহরটা নিজেই যেন আলোয় ঝলমল করা এক তারামণ্ডলী। পেট...
14/06/2025

গল্প: "আলোকছায়ার শহর"

রাতের কুয়ালালামপুর। আকাশে তারা দেখা যায় না, কিন্তু শহরটা নিজেই যেন আলোয় ঝলমল করা এক তারামণ্ডলী। পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে—দুটি ধাতব রূপালি নিঃশব্দ পাহারাদারের মতো। ঠিক সামনে, KLCC পার্কের মধ্যে জল আর আলোর ফোয়ারা শো শুরু হতে যাচ্ছে।

তখনও মোবাইলটা হাতে ধরে দাঁড়িয়ে আছে তাসিন।

সে বাংলাদেশ থেকে এসেছে কুয়ালালামপুরে মাত্র এক মাস আগে, একটি সফটওয়্যার কোম্পানির জুনিয়র ডেভেলপার হিসেবে। বিদেশে কাজ করার স্বপ্নটা তার বহু পুরনো—কিন্তু সে বুঝতে পারছিল না, এই শহরের এত আলো তার জীবনের ভেতরের অন্ধকারটাকে ঠিক কতটা দূর করতে পারছে।

আজ ছিল শুক্রবার। পুরো সপ্তাহের ক্লান্তি আর একাকীত্ব পেছনে ফেলে সে এসেছিল এখানে—একটা গল্প খোঁজার আশায়, একটা মানে খোঁজার আশায়।

ফোয়ারা থেকে হঠাৎ এক তীব্র আলো ছুটে উঠল আকাশের দিকে। জলরাশি রঙিন আলোয় ভেসে উঠল। একটা হালকা সুর বাজছিল—বেহালার মতো। তাসিন থেমে গেল। মনে হল, এই শহরটাও কথা বলতে জানে। জল দিয়ে, আলো দিয়ে, ছন্দ দিয়ে।

তার মনে পড়ে গেল নিজের গ্রাম। ছোট একটা খাল ছিল, যেখানে সন্ধ্যায় বসে সে নদীর শব্দ শুনত। কুয়ালালামপুরের এই জলের শব্দ সেই খালের মতো না হলেও, তাতে একটা নৈঃশব্দ্য ছিল।

এই শহরে কেউ ওকে চিনে না, কেউ ওর গল্প জানে না। অথচ এই জল আর আলো—তারা যেন ওর মন বুঝে ফেলেছে।

তাসিন চোখ বুজে দাঁড়িয়ে রইল। সুর বয়ে চলল, আলো ঘুরতে লাগল, ফোয়ারা উঠল ঝাঁকে ঝাঁকে।

তার মনে হলো—"আমি এখানে এসেছি শুধু টাকা আয় করতে নয়, আমি এসেছি নিজেকে খুঁজে পেতে।"

জীবনের অনেকগুলো অধ্যায়ই তো এমন—একাকীত্ব, নতুনতা, ভয় আর তবুও এগিয়ে চলা।

ফোয়ারা থেমে গেল। চারপাশ আবার হালকা শব্দে ভরে উঠল। মানুষজন হাঁটছে, হাসছে, ছবি তুলছে।

তাসিন পকেট থেকে ফোনটা বের করল। একটা ছবি তুলল টুইন টাওয়ার আর ফোয়ারার—আর পাঠিয়ে দিল তার প্রিয় বন্ধুকে দেশে।

সাথে লিখল:

"ভালো আছি। এখানেও জল গান গায়। আলো গল্প বলে। শুধু শোনার মতো মনটা খোলা রাখতে হয়।"

14/06/2025
09/06/2025

গল্প: “চিঠি দেশে যায় না, কিন্তু হৃদয় তো যায়!”

তিন বছর হয়ে গেছে রায়হান দেশের মাটি স্পর্শ করেনি। মালয়েশিয়ার সেলাঙ্গর প্রদেশের একটি ইলেকট্রনিক্স কোম্পানিতে কাজ করে সে। পরিবার, বন্ধু, দেশের মাটির গন্ধ—সবকিছু এখন তার স্মৃতির পাতায় বন্দি।

প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে ভিডিও কলে ছেলেটার হাসি দেখে সে বাঁচে। “বাবা, তুমি কবে আসবা?” প্রশ্নটা প্রতিদিন ছেলের ঠোঁট থেকে বের হয়, কিন্তু রায়হান কোনোদিন উত্তর দিতে পারে না।

প্রবাসে জীবন মানে শুধু কষ্ট না, একটা নীরব যুদ্ধ। রায়হানকে নিজের শরীর, আবেগ, সময়, ঘুম—সবকিছুর সাথে প্রতিদিন লড়তে হয়। কোম্পানির ম্যানেজার বলেছিল, “You Bangladeshis are hardworking,” কিন্তু কেউ বুঝে না, তারা কতটা মন হারিয়ে কাজ করে।

বন্ধুদের কেউ কেউ ফিরেছে দেশে, কেউ থেমে গেছে হঠাৎ। কিন্তু রায়হান এখনো লড়ছে। কারণ, তার বাবার কিডনি ট্রিটমেন্ট চলছে, মেয়ের স্কুলের বেতন বাকি, আর মা প্রতিদিন বলে,
“বাবা, তুই না গেলে কিছুই হয় না এ ঘরে।”

একদিন ছেলের আঁকা একটি চিঠি ডাকের ব্যাগে পায় রায়হান। ছবিতে রায়হানের হাতে বাংলাদেশের পতাকা, আর পাশে তার ছেলে দাঁড়িয়ে। নিচে লেখা:
"আমার বাবাই আমার হিরো। সে দেশের জন্য কাজ করে।"

রায়হানের চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। কী আশ্চর্য! সে তো শুধু পরিবারের জন্য লড়ছে ভেবেছিল, কিন্তু এই ছোট ছেলেটা তাকে ‘দেশের জন্য’ ভাবছে!

সেই রাতেই সে একটা ছোট নোটবুকে লিখে—

> “আমি রায়হান। আমি একজন শ্রমিক, কিন্তু আমি দেশের দূত। আমি শুধু টাকা পাঠাই না, আমি দেশের মান রক্ষা করি, অন্য জাতির সামনে মাথা উঁচু করে থাকি। আমি প্রবাসী, কিন্তু আমি দেশপ্রেমিকও।”

এরপর থেকে রায়হান শুধু বাঁচে না, সে জ্বলে। সে অফিসে অন্যদের সাহায্য করে, নতুন আসা ছেলেদের থাকার ব্যবস্থা করে দেয়, ভুলে যাওয়া প্রবাসীদের সঙ্গে দেশীয় উৎসব ভাগ করে নেয়।

সে এখন প্রবাসীদের মধ্যে একটা আলোর নাম। সবাই তাকে দেখে বোঝে, একজন মানুষ শুধু নিজের জন্যই নয়—সমগ্র জাতির প্রতিনিধিও হতে পারে বিদেশে।

পাঁচ বছর পর সে দেশে ফেরে। এয়ারপোর্টে ছেলেটা তার হাত ধরে বলে,
“তুমি না থাকলে আমরা এত কিছু পেতাম না। তুমি শুধু আমার বাবা না, তুমি বাংলাদেশের প্রবাসী সেনানী।”

রায়হান আকাশের দিকে তাকায়, চোখে জল কিন্তু মুখে হাসি।
দেশ তাকে ডাকেনি, তবু সে দেশকে ভুলেনি।

এই গল্প শুধু রায়হানের না। এটা হাজারো প্রবাসীর, যারা নীরবে দেশের জন্য যুদ্ধ করে। যারা দেশের পতাকা গোপনে বুকে রাখে, এবং প্রমাণ করে—
“দেশে থাকলেই দেশপ্রেমিক হওয়া যায় না, দূরে থেকেও দেশের জন্য বুক ভরা ভালোবাসা নিয়ে বাঁচা যায়।”

09/06/2025

গল্প: “একটি গরম রুটির মূল্য”

মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে তখন ডিসেম্বর মাস। ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে, অথচ হালিমের কপালে ঘাম। সে মাত্রই নাইট শিফট থেকে ফিরেছে—একটি নির্মাণ সাইটে কাজ করে। পরিশ্রান্ত শরীর আর ক্লান্ত চোখ নিয়ে ছোট্ট রুমটায় ঢুকল সে।

রুম বলতে তিনজন শ্রমিক মিলে ভাগ করে নেওয়া একটা ঘর। মেঝেতে বিছানো পাতলা ম্যাট, পাশে একটা ছোট টেবিল আর দেয়ালের কোনায় একটা ফ্রিজ—যেটা প্রায়ই খালি থাকে।

ফ্রিজটা খুলে দেখে শুধু এক বোতল পানি। খাবার বলতে কিছুই নেই। সকালে বের হওয়ার সময় শেষ বিস্কুটটা খেয়েছিল। পকেট হাতড়াতে গিয়েও কিছু পেল না। গতকাল রাতে মায়ের সাথে কথা বলার জন্য মোবাইলে রিচার্জ করেছিল শেষ ১০ রিঙ্গিত। মা বলেছিল,
“তুই ভালো থাকিস বাবা, কষ্ট হলেও টিকেই থাকিস।”

মায়ের সেই কণ্ঠ এখনো কানে বাজছে। অথচ সে জানে না, তার ছেলে আজ দুই বেলা না খেয়ে কাজ করেছে। হালিম চুপচাপ ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায়। বুকের ভেতরটা যেন ভার হয়ে আসে।

এমন সময় পাশের রুমের দরজা খুলে একজন ডাক দেয়—
“হালিম ভাই, খাবেন নাকি? গরম গরম রুটি বানাইলাম, সাথে ডাল।”

কাশেম ভাই—একজন পুরনো প্রবাসী, বয়সে হালিমের চেয়ে একটু বড়, তবে ব্যবহারে যেন বড় ভাইয়ের চেয়েও বেশি কিছু। হালিম দ্বিধা করে,
“না ভাই, কষ্ট কইরেন না... আমি ঠিক আছি।”

কাশেম ভাই হাসলেন,
“আহা! আপনি ঠিক আছেন মানে? আমরাও তো এই রকম সময় পার করছি। আসেন, একটু রুটি আর ডাল খাইলেই শক্তি পাবেন। আপনার চেহারায়ই ক্লান্তি লেখা।”

হালিম কোনো কথা না বলে চোখ মুছলো আর গিয়ে বসলো টেবিলের পাশে। প্লাস্টিকের প্লেটে গরম রুটি আর লাল ডালের ঘ্রাণে মনটা যেন শান্ত হয়ে এলো। খেতে খেতে হালিম বললো,
“ভাই, আপনি জানেন না… আমি আজ কিছুই খাইনি।”

কাশেম ভাই মাথা নাড়িয়ে বললেন,
“জানি হালিম ভাই। এই শহরের রঙিন আলোতে হাজারো কষ্ট ঢাকা পড়ে থাকে। প্রবাসে টাকার অভাবে না খেয়ে থাকাটা লজ্জার কিছু না। আসল লজ্জা হলো—কারো পাশে না দাঁড়ানো।”

এক লোকমা গরম রুটি মুখে দিয়ে হালিম মনে মনে ভাবল—
"এই মুহূর্তটাই হয়তো আমার জীবনের সবচেয়ে উপকারী শিক্ষা: প্রবাসে কেউ আপন না হয়েও কেমন করে সবচেয়ে আপন হয়ে ওঠে।”

Address

Petaling Jaya

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when প্রবাসের কথা - Expat's Voice posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share

Category